তারাপদ ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। এখানে রাস্তায় বাতি নেই। অন্ধকার। হয়ত লোড শেডিং হয়ে গিয়েছে। দোকান-পশারও বন্ধ। রাত হয়ে গিয়েছে। আলো বড় একটা দেখাই যাচ্ছে না। ট্যাক্সির হেড লাইটের আলোও তেমন জোরালো নয়। অবশ্য উল্টো দিক থেকে আসা গাড়ির আলো মাঝে-মাঝে তারাপদদের গায়ে-মুখে পড়ছিল।
তারাপদ বলল, “অনিল কি মিথ্যে কথা বলছে?”
কিকিরা বললেন, “বলতে পারে।”
চন্দন আপত্তি জানাল যেন। “ও মিথ্যে কথা বলবে কেন? কী লাভ? ও যে ভয় পেয়েছে, পালিয়ে এসে লুকিয়ে রয়েছে, এটা তো ঠিকই।”
“হ্যাঁ”, কিকিরা কী ভাবতে-ভাবতে ধীরেসুস্থে বললেন, “সার্কাস ছেড়ে অনিল পালিয়ে এসেছে–এটা সত্যি। ভয় পেয়েছে–তাও হতে পারে। কিন্তু ভয় পাওয়ার কারণ ও যা বলছে তা আমি মেনে নিতে পারছি না। সব খেলাতেই কম্পিটিশান থাকে। খেলাতেই বা শুধু কেন–সব জায়গাতেই। গাইয়েদের মধ্যে থাকে, থিয়েটারে থাকে, যাত্রায় থাকে”
“আপনাদের ম্যাজিকেও থাকে।”
“হ্যাঁ, থাকে। আছেও। …আমার কথা হল, অনিলের খেলা বেশি পপুলার হয়ে যাচ্ছে বলে কৃষ্ণমূর্তি তাকে শাসাচ্ছেন, জখম করার চেষ্টা করছেন, মেরে ফেলতেও পারেন–এইসব কথা কি ঠিক? শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্যে খুন-খারাপি পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব কি না বলতে পারছি না। অন্য ব্যাপার হলে হতে পারে। এখানে নিতান্ত একটা সার্কাসের খেলা। আমার মাথায় আসছে না চাঁদু!”
চন্দন একটু চুপ করে থেকে বলল, “কিকিরা, অনিলকে আমি চিনি না। সে কেমন ছেলে তাও জানি না। কিন্তু মায়াদিকে আমি চিনি। সিস্টার হিসেবে মায়াদি কত ভাল আমি জানি। তার চেয়েও বেশি জানি, মায়াদিকে। মায়াদি কখনো মিথ্যে কথা বলবেন না। আর অনিলই মায়াদির একমাত্র ভাই।
তারাপদ বলল, “অনিলের সঙ্গে আপনি আরও কথা বলুন।”
“বলব বলেই তো ডেকে পাঠিয়েছি।”
“কাল ও আসবে আপনার কাছে।”
কিকিরা কথাটা শুনলেন কি শুনলেন না বোঝা গেল না। চুরুটটা দাঁতে চেপেই থাকলেন। ট্যাক্সি অনেকটা এগিয়ে এল।
শেষ পর্যন্ত চুরুটটা আবার জ্বালাবার চেষ্টা করতে করতে কিকিরা বললেন, “সার্কাসের মধ্যে আমায় ঢুকতে হবে।”
তারাপদ হালকাভাবেই বলল, “খেলা দেখাবেন?”
“মন্দ নয়; দেখাতেও পারি।”
“কী খেলা?” তারাপদ মজা করেই বলল, “ম্যাজিক?”
“ঠাট্টা করছ! শোনো হে তারাবাবু, কিকিরা দ্য ম্যাজিশিয়ান এখনো ইচ্ছে করলে দু-চারটে থ্রোট চোকিং খেলা দেখাতে পারে।”
“থ্রোট চোকিং?”
“ইয়েস স্যার, গলা চোক হয়ে যাবে–মানে ভয়ে তোমার গলা একেবারে শুকিয়ে কাঠ।”।
“কী খেলা স্যার?”
“কাটা মুণ্ডু গড়াগড়ি। টেবিলের এ-পাশ থেকে ও-পাশ, ওপাশ থেকে এ-পাশ। মুণ্ডুর ওপর আলোর লাল ফোকাস। সেইসঙ্গে অট্টহাসি।”
তারাপদ জোরে হেসে ফেলল। চন্দনও না হেসে পারল না। তারাপদ বলল, “অট্টহাসিটা কে হাসবে? আপনি?”
“নো। রেকর্ড বাজবে। আজকাল তো আবার স্টিরিও সিস্টেম।”
আর-এক দফা হাসি হল।
শেষে চন্দন বলল, “কিকিরা, এখন তা হলে আপনি কী করতে চান?”
কিকিরা বললেন, “আমি সবার আগে আর-একবার অনিলের সঙ্গে কথা বলতে চাই। তোমরা থাকলে ভাল হয়। তারপর আমি সার্কাসের ভেতরের খোঁজ-খবর করবার চেষ্টা করব। তোমরা কাছাকাছি থাকবে।”
“সত্যি আপনি সার্কাসের অন্দরমহলে ঢুকবেন?”
“ঢুকতে হবে। না ঢুকলে আসল ব্যাপারটা জানব কেমন করে! তোমরা যতটা সহজ ভাবছ ততটা সহজ ঘটনা এটা নয় চাঁদু। আমার তাই আন্দাজ হচ্ছে।”
.
০৪.
সাতটা বাজল দেখতে-দেখতে।
তারাপদ এসেছে ছ’টারও আগে। চন্দন এল সাড়ে ছ’টা নাগাদ 1 অনিলের কিন্তু দেখা নেই।
কিকিরা বললেন, “কই গো, তোমাদের জাম্পার অলিভারের যে এখনো দেখা নেই। কী হল তার?”
তারাপদ খানিকটা বিরক্ত হয়ে উঠেছিল অপেক্ষা করতে করতে। বলল, “কী জানি, বাড়ি ভুল করল নাকি?”
কিকিরা বললেন, “তোমরা ভাল করে চিনিয়ে দাওনি রাস্তাটা?”
“দিয়েছি।”
কিকিরা অন্য কথা পাড়লেন। নিজে অল্প বয়েসে কত ভাল-ভাল সার্কাস দেখেছেন তার গল্প শোনাতে লাগলেন। তখনকার সার্কাসে পশুর খেলা ছিল দেখবার মতন। বাঘ-সিংহ ছাড়াও ঘোড়ার খেলা থাকত, থাকত হাতির খেলা। এক-একজন রিং মাস্টার যেভাবে সাজপোশাক পরে বেত হাতে এসে দাঁড়াত, মনে হত যেন রাজপুত্র এসে দাঁড়িয়েছে। আর ট্রাপিজ? আরে সে-ট্রাপিজ এখন দেখবে কোথায়? সাহেব-মেম ট্রাপিজের খেলা দেখাত পুরনো “কুইন সার্কাসে’।
.
কিকিরার গল্পের মধ্যে অনিল এল।
অনিলকে কেমন যেন দেখাচ্ছিল। খানিকটা জড়োসড়ো–মুখে দুশ্চিন্তার একটা ছাপ। গায়ের শার্টটা কুঁচকে রয়েছে অনিলের। বোধ হয় ভিড়ের মধ্যে ধস্তাধস্তি করতে হয়েছে বাসে।
কিকিরা বললেন, “এসো। এত দেরি?”
অনিল কিকিরাকে আগেই দেখেছিল। তারাপদদের দিকে তাকাল। দেখল ওদের। বলল, “দেরি হয়ে গেল।”
চন্দন বলল, “ঠিকানা গোলমাল হয়ে গিয়েছিল?”
অনিল মাথা নাড়ল। বলল, “না, রাস্তা গোলমাল হয়নি।” বলে একটু থেমে কিকিরার দিকে তাকাল। “সাড়ে পাঁচটা নাগাদই আমি বেরোতে যাচ্ছিলাম। বাড়ির গলির কাছে একটা লোককে দেখে বেরোতে সাহস হল না। “
“লোক? কোন লোক?” চন্দনই বলল অবাক হয়ে।
অনিল বলল, “লোকটাকে চিনি না। আগে কোনোদিন দেখিনি গলিতে। তবে মুখটা কোথাও দেখেছি বলে মনে হল। আজই গলিতে দেখলাম। আমাদের বাড়ির কাছে একটা ইলেকট্রিক মিস্ত্রির দোকান আছে। মোটর গাড়ির ইলেকট্রিকের কাজ করে। সেলফ ডায়নোমো। ব্যাটারিও তৈরি করে। সেই দোকানের সামনে কাঠের টুল নিয়ে ঠায় বসে ছিল লোকটা।”
