তারাপদ বা চন্দন কোনো আপত্তি করেনি। ইমপ্রেসারিও, কোম্পানি–এর কোনো কিছুই যখন তারা জানে না, তখন কিকিরার হাতে ব্যাপারটা ছেড়ে দিলেই ভাল।
সার্কাসে ঢোকার আগে কিকিরা হঠাৎ বললেন, “তোমরা এক কাজ করো। দুটো টিকিট কেটে ভেতরে চলে যাবে। একেবারে সামনের দিকে।”
“কেন, আপনার সঙ্গে যাব না?”।
“না। আমি হরিশবাবুর সঙ্গে দেখা করে–তাঁর সঙ্গে ভেতরে যাব। তিনি যখন তোমাদের–মানে মালিকদের কথা জিজ্ঞেস করবেন, বলব, ওরা নিজেরাই আসবে। ফ্রিতে আসতে চায় না। বলে, তাতে প্রেস্টিজ থাকে না কোম্পানির। খাতির করে নিয়ে গিয়ে ভাল জায়গায় বসাবে, চা-সিগারেট-পান খাওয়াবে–তারপর আমাদের বাগিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টা করবে। চক্ষুলজ্জা বলে কথা আছে। আমরা নিজেরাই যাব। সার্কাস ভাল লাগে আপনার সঙ্গে আলোচনা করব। তারপর অন্য কথা…।”
তারাপদ বলল, “বাঃ।
“ কিকিরা বললেন, “বাঃ নয়! গোড়ায়-গোড়ায় তোমাদের একটু তফাতে রাখতে চাই। বেফাঁস কথাবার্তা বলে ফেললে ধরা পড়ে যেতে পারি। তা ছাড়া আমি চাই তোমরা চোখ কান খোলা রেখে সব দেখোশোনো।”
তারাপদরা আর আপত্তি করেনি।
আড়াই ঘণ্টা সময় তারা সার্কাসে বসেবসে কাটিয়েছে।
সার্কাস ভাঙার পর কিকিরা এসে ধরলেন দুজনকে। সঙ্গে হরিশবাবু। তারাপদদের টেনে নিয়ে যেতে চাইলেন মালিকের কাছে।
কিকিরা হরিশবাবুকে বোঝালেন। তাড়াহুড়োর কোনো দরকার নেই। এরা কিছু না জানিয়েই নিজেরা এসেছে। ওরা একটু ভেবে নিক। দু-চার দিনের মধ্যে আমিই আবার ওদের নিয়ে আসব। তখন বিজনেসের কথা বলা যাবে।
.
সার্কাস থেকে বেরিয়ে তিনজনে খানিকটা হেঁটে আসার পর কিকিরা বললেন, “কেমন দেখলে সার্কাস?”
চন্দন বলল, “কেমন আর! এ-সব সার্কাস এইরকমই হয়। খুব ভাল নয়, আবার একেবারে রদ্দি নয়।”
“তারাবাবু, তুমি?
“নতুন খেলা কিছু দেখলাম না। তবে, ওই খেলাটা ভাল দেখাল। ড্যাগার থ্রো। আগেও আমি দেখেছি। কিন্তু শেষে যখন লোকটার চোখ বেঁধে দিল, আর মেয়েটাকে দাঁড় করিয়ে ও ড্যাগার ছুড়ছিল–তখন আমার বেশ ভয় করছিল, স্যার।”
চন্দন বলল, “ট্রাপিজ খেলাটাকে বড় ম্যাড়মেড়ে করে দেখাল। আরও ব্রাইট করা উচিত ছিল, কিকিরা। ট্রাপিজই তো সার্কাসের আসল খেলা। আর বাঘ-সিংহর খেলা যা দেখাল, টোটালি হোপলেস। ঝিমোনো দু-চারটে বুড়ো বাঘ-সিংহ নিয়ে চলে না। “
কিকিরা হাসলেন। বললেন, “পাকা মালিকের মতন কথা বলছ চাঁদ!..যাক গে, আর কিছু নজর করলে?”
“কী?”
“সে কি! তোমাদের তবে আনলাম কেন?”
তারাপদ কিকিরার দিকে তাকাল। বুঝতে পারল কথাটা। বলল, “আপনি কৃষ্ণমূর্তির কথা বলছেন?”
“বলছি তো আরও কিছু। কেমন দেখলে কৃষ্ণমূর্তির মোটর বাইকের খেলা?”
তারাপদ বলল, “ভাল। দারুণ রিস্কি খেলা। লোকটা ভাল দেখাল, স্যার। বিশেষ করে ওর ওপর থেকে নিচে নামার খেলাটা। সারকেলগুলো ডেঞ্জারাস?”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। “শুনলাম, কৃষ্ণমূর্তি প্রায় গত দশ বছর এই খেলাই দেখাচ্ছেন! খেলোয়াড় হিসেবে পাকা।” বলে একটু থেমে খানিকটা অন্যমনস্কের মতন জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন দেখলে লোকটাকে?”
চন্দন হাঁটতে-হাঁটতে মুখ তুলল। বলল, “লোকটাকে আর দেখলাম কোথায়! গায়ে ওই রেসিং সুট। পুরো শরীর ঢাকা। মাথায় হেলমেট, মিলিটারি মাকা, হাতে গ্লাভস, পায়ে ব্রিচেস মাকা বুট জুতো। সবই তো ঢাকা স্যার। …তবে উনি যখন খেলার শেষে হেলমেট খুলে দাঁড়িয়ে হাততালি কুড়োচ্ছিলেন–তখন কৃষ্ণমূর্তির মুখটা দেখলাম। দু-চার মিনিটের জন্যে। থুতনির কাছে দাড়ি। জাহাজের সেলারদের মতন দেখাচ্ছিল। চোখ গোল-গোল। নাক বসা।”
তারাপদ বলল, “চেহারার মধ্যে একটা রোবাস্ট ভব আছে।”
কিকিরা বললেন, “লোকে কী বলছিল? মানে, আরো একটা মোটর বাইকের খেলা যে বন্ধ রয়েছে, লোকে কীভাবে নিচ্ছিল!”
তারাপদ বলল, “দু-চারজন বলছিল বটে, তবে ও নিয়ে খুব যে কথাবার্তা হচ্ছিল–তা নয়।”
ততক্ষণে বড় রাস্তায় এসে একটা ফাঁকা ট্যাক্সি পাওয়া গেল। কিকিরা হাত বাড়িয়ে ডাকলেন ট্যাক্সিটাকে।
তারাপদরা ট্যাক্সিতে উঠল।
সামান্য সময় চুপচাপ থাকার পর কিকিরা বললেন, “আমি হরিশবাবুর সঙ্গে ছিলাম। মালিক ছাড়াও দু-তিনজন খেলোয়াড়কে দেখলাম। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কথাও বললাম হে। আমার মনে হল, অনিলের খেলাটা বন্ধ রয়েছে বলে ওরা যে মুশকিলে পড়েছে–তাও নয়। অবশ্য মালিক আর হরিবাবু দুজনেই বলছিলেন, অন্য খেলাটারও একটা মেজর অ্যাট্রাকশান ছিল। লোকে নিয়েছিল খেলাটা। তবে সার্কাসের ব্যবসায় দু-একটা খেলা বাদ গেলে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না। লোকে ও নিয়ে মাথা ঘামায় না।”
“তবে?”
“আমিও তাই ভাবছি।”
“অনিলের কথা আপনি জিজ্ঞেস করলেন নাকি?”
“মাথা খারাপ হয়েছে নাকি। আমি অনিল বলে কাউকে হালে চিনেছি বা দেখেছি–একথা কি বলা যায়! খেলাটার কথা জিজ্ঞেস করেছি, খেলোয়াড়ের কথা নয়। আমি বাবা ইমপ্রেসারিও। খেলার ভাল-মন্দ খোঁজ নিতে পারি, কেননা সেগুলো নিয়ে ব্যবসা করব। খেলোয়াড়ের কথা আমি তুলব কেন?”
চন্দন বলল, “অনিল পালিয়ে আসায় ওদের তবে ক্ষতি হচ্ছে না?”
“হয়ত একটু হচ্ছে, ওরা কিন্তু ভাঙল না। …বিজনেস সিক্রেট হতে পারে।”
“তা হলে?”
কিকিরা এবার পকেট হাতড়ে চুরুট বের করলেন। চুপচাপ থাকলেন কিছুক্ষণ। চুরুট ধরিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, “চাঁদু, অনিল যা বলছে, আর সত্যি কী ঘটেছে–মানে অনিল ছেলেটির কথা কতটা সত্যি আমি বুঝতে পারছি না।”
