কিকিরা অনিলকে বললেন, “তোমার বয়েস কত?”
অনিল চা খাচ্ছিল। মুখ তুলে বলল, “পঁচিশ হয়ে গেছে।”
“তুমি কতদিন খেলা দেখাচ্ছ?”
“দু বছর।”
“আগে কোনো সার্কাসে ছিলে?”
“না।”
“তা হলে? কে তোমায় খেলা শেখাল? তোমার ট্রেনার কে?”
অনিল কী মনে করে তার গলায় ঝোলানো চেনের লকেটটায় একবার হাত বুলিয়ে নিল। রুপোর চেন, লকেটটা সোনার। ক্ৰশ। বলল, “আমায় খেলা শেখাতেন সিসিল সরকার।”
“সিসিল।”
“ওই নাম। আমাদের লোক। সিসিল নামমকরা বাইক রাইডার। মোটর সাইকেল রেসিং-এ অনেক প্রাইজ পেয়েছেন। ভাল হকিও খেলতেন।”
“সিসিল কি সার্কাসে ছিলেন?”
“না। সিসিলদের টেলারিং শপ ছিল। নিউ মার্কেটের কাছে। লিন্ডসে স্ট্রিটে বড় দোকান। নামী দোকান। সিসিল দোকান দেখতেন।”
“সেই দোকান এখন..”
“হাত বদল হয়ে গেছে। সিসিল নেই। মাঝে শুনেছিলাম, ওঁর অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে; বেঁচে নেই। পরে শুনলাম, সিসিল দার্জিলিঙে চলে গেছেন।”
“তোমার সঙ্গে আর দেখা হয়নি?”
“না স্যার।”
কিকিরা হাত বাড়িয়ে সিগারেট চাইলেন তারাপদর কাছে। চুরুটে যেন অভিরুচি ছিল না। তারাপদ সিগারেট দিল।
সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া গিলে কিকিরা অনিলকে বললেন, “তুমি বলছ, আগে তুমি কোনো সার্কাস পার্টিতে ছিলে না। তা হঠাৎ গোল্ডেন সার্কাসে ঢুকলে কেমন করে?…আমি যতটুকু বুঝি বাবা, সার্কাসে ঢোকা, চাকরি পাওয়া–আর কোনো অফিসে কেরানির চাকরি পাওয়া এককথা নয়। তোমার মতন আনকোরা আনাড়িকে কোন সার্কাস চাকরি দেবে?”
অনিল মাথা নেড়ে বলল, “আপনি ঠিকই বলেছেন। কেউ দেয় না। আমিও চাকরি খুঁজতে সার্কাসে যাইনি। তালেগোলে ওটা হয়ে গেছে।” বলে অনিল তার সার্কাসে ঢোকার ঘটনার কথা বলল।
সেবার, বছর দুই আগের কথা, শীতের সময় অনিল গিয়েছিল আসানসোলে তার এক বন্ধুর কাছে বেড়াতে। বন্ধুর বাড়ির সিকি মাইলটাক দূরে তখন গোল্ডেন সার্কাসের তাঁবু পড়েছে। খেলা চলছিল। একদিন অনিল তার বন্ধুর কোয়ার্টারের সামনে বন্ধুরই মোটর বাইক নিয়ে খেলা দেখাচ্ছিল মজা করে। সামনের রাস্তা দিয়ে তখন একটা জিপগাড়ি করে যাচ্ছিলেন গোল্ডেন সার্কাসের মালিক। সঙ্গে সার্কাসের অন্য দুজন। মালিকের কেমন করে নজর পড়ে গেল অনিলের ওপর। গাড়ি থামিয়ে কিছুক্ষণ খেলা দেখলেন। তারপর নিজেই এসে দাঁড়ালেন অনিলের সামনে।
কিকিরা বললেন, “মালিকই তোমায় নিজে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন সার্কাসে?”
“হা স্যার। নিজে। আমি সার্কাসে ঢুকব ভাবিনি কোনোদিন। ঢুকে গেলাম। দিদি বারণ করেছিলেন, রাগ করেছিলেন। তবু লোভে পড়ে ঢুকে গেলাম।”
“কিসের লোভ?”
ইতস্তত করে অনিল বলল, “স্যার, গ্ল্যামারের লোভ। সার্কাসের টেস্ট, গ্যালারি, আলো, রং-চং খেলা–সব কেমন যেন। থ্রিলিং। তবে স্যার, প্রথমে আমি আজকের মতন এত খেলা দেখাতাম না। জানতাম না। দু-তিনটে খেলাই দেখাতাম। তারপর ধীরে ধীরে নিজে খেলা বের করেছি। প্র্যাকটিস করেছি দিনের পর দিন। আমার কোনো ট্রেনার সার্কাসে ছিল না। নিজের চেষ্টায় যা পেরেছি করেছি।”
তারাপদ আর চন্দন কোনো কথা বলছিল না। অনিলের কথা শুনছিল। মনে-মনে বাহবা দিচ্ছিল অনিলকে।
কিকিরা সিগারেট নিভিয়ে রেখে দিলেন। বললেন, “তুমি সার্কাসে ঢোকার পর থেকেই কি কৃষ্ণমূর্তি তোমার পেছনে লাগেন?”
মাথা নাড়ল অনিল। “না। আগে ভাল ব্যবহার করতেন। “
“কখন থেকে তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে শুরু করলেন?”
“এবারকার সিজিনে।”
“কেন?”
“জানি না।”
“তিনি তোমায় জখম করার চেষ্টা করেছেন শুনলাম। কেমন ভাবে?”
অনিল বলল, “কৃষ্ণমূর্তি সাহেব আমাকে, আমার খেলা নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করতে শুরু করলেন গোড়ায়-গোড়ায়। তারপর আমাকে বললেন, তাঁর সঙ্গে ওই লোহার পাতের গ্লোবটার মধ্যে ঢুকে খেলা শিখতে। মানে আমরা দুজনেই একটা গোল খাঁচার মধ্যে পাক খাব। উনি ক্লক ওয়াইজ, আমি অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজ। আমার স্যার এই খেলাটা শিখতে বা দেখাতে ইচ্ছে ছিল না। কৃষ্ণমূর্তির জোর-জবরদস্তিতে মাঝে-মাঝে ঢুকতাম। তখন উনি খেলা শেখাবার নাম করে আমাকে জখম করার চেষ্টা করতেন।”
কিকিরা শুনলেন মন দিয়ে। ভাবছিলেন। তারপর হঠাৎ বললেন, “ওই লোকটা তোমাকে আর কীভাবে শাসাত?”
“আমার টেন্টের মধ্যে জামার পকেটে, সুটকেসের ওপর ভাঁজ করা কাগজ রেখে দিয়ে যান লুকিয়ে। তাতে গালমন্দ থাকে, শাসানি থাকে। “
“কী লেখেন?”
“বেশি কিছু লেখেন না। দু-একটা কথা। বড় বড় হরফে। ভয় দেখান, মেরে ফেলার ভয় দেখান।”
“লেখাটা যে কৃষ্ণমূর্তির, তার প্রমাণ কী? তুমি কি ওঁর হাতের লেখা চেনো?”
“নিজের হাতে লেখেন না। কাগজ থেকে টাইপ কেটে-কেটে আঠা দিয়ে জুড়ে ওঁর যা লেখার লেখেন।”
কিকিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। শেষে বললেন, “ঠিক আছে। আজ থাক। পরশু আবার কথা হবে। তুমি এখানেই এসো। সন্ধেবেলায়।”
.
০৩.
সার্কাস থেকে বেরিয়ে এসে কিকিরা বললেন, “কী চাঁদু, কেমন হল?”
চন্দন কোনো কথা বলল না। কীইবা বলবে!
তারাপদ চুপ করে থাকতে পারল না। বলল, “স্যার, আপনার সবই অদ্ভুত। কখন যে কী করেন, বুঝতে পারি না।”
কথাটা তারাপদ মিথ্যে বলেনি। কিকিরা প্রথমে বলেছিলেন, তারাপদ আর চন্দনকে টিসি ইমপ্রেসারিও কোম্পানির পার্টনার আর মালিক সাজিয়ে গোন্ডেন সার্কাসে নিয়ে যাবেন। ভাল করে বুঝিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “তোমরা কোনো কথা বলবে না। নেহাত যেটুকু না বললে নয়, সেইটুকুই বলবে। আর তোমরা এমন ভাব করবে, যেন কোম্পানির মালিক হলেও দুজনেই অকর্মা, বাপের কিছু পয়সা আছে বলে নামকেওয়াস্তে এই কোম্পানি খুলে রেখেছে, নিজেরা তেমন কিছু দেখাশোনা করো না, সবই আমার হাতে ছেড়ে দিয়ে বসে আছ! আমি যা করি–তোমরা না বলো না। আমি হলাম তোমাদের বাপ-জেঠার আমলের লোক। আমাকে খাতির করো তোমরা। ব্যস, বাকি যা সব আমার হাতে ছেড়ে দাও।”
