অনিল মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ।”
“কোথাকার লোক! কলকাতার?”
“ডুয়ার্সের লোক। কলকাতাতেও থাকতেন। আগে রয়েল সার্কাসে ছিলেন।”
“কৃষ্ণমূর্তিও তো সাউথ ইন্ডিয়ান?”
“হ্যাঁ। তবে কৃষ্ণমূর্তি অনেক জায়গায় ছিলেন। কলকাতাতেও অনেক বছর। বাংলা, হিন্দি–দুই ভাল জানেন।”
“কৃষ্ণমূর্তি আর আদিনাথ–মানে মজুমদারমশাইয়ের মধ্যে ভাবসাব কেমন?”।
“বনে না। কৃষ্ণমূর্তিকে অনেকেই পছন্দ করে না।”
“কেন?”
অনিল একটু চুপ করে থেকে বলল, “কৃষ্ণমূর্তি সকলের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। গালমন্দ করেন। লোকটার বড় দেমাক। এমনিতেও নোংরা, রাফ গোছের।”
“তবু তিনি সার্কাসে টিকে আছেন কেমন করে?”
“মালিকের বন্ধু। গোল্ডেন সার্কাসটা গড়ে তোলার সময় মাস্টার–ওই। কৃষ্ণমূর্তি–অনেক করেছিলেন।”
“আচ্ছা! কৃষ্ণমূর্তি কি সার্কাসের পার্টনার?”
“জানি না। তবে ওঁর জন্যে আলাদা ব্যবস্থা থাকে। থাকেন আলাদা; ভাল-ভাল খাবার খেতে পান। টাকাও বেশি পান।”
“তোমাদের সার্কাসে একটা খোঁড়া মতন লোক আছেন?”
অনিল অবাক হয়ে বলল, “আপনি কেমন করে জানলেন?”
“আলাপ হল।”
“হরিশবাবু। হরিশবাবু আগে জিমনাস্টিকের ট্রেনার ছিলেন। নিজে জালারি দেখাতেন। একবার সার্কাসের বাইরের তাঁবুতে আগুন লাগে। হরিশবাবু আগুন নেভাতে গিয়ে জখম হন। এখন আর উনি খেলা দেখান না। মাঝেমাঝে ক্লাউন সাজেন। বেশিরভাগ সময় হরিশবাবু টিকিট ঘরে বসে থাকেন, না হলে বাইরে ঘোরাফেরা করেন।”
কিকিরা বললেন, “হরিশবাবুর সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। বাইরে ছোট তাঁবুর পাশে টিনের চেয়ার টেনে বসে ছিলেন। বিড়ি টানছিলেন।”
“নিজেই আলাপ করলেন আপনি?” তারাপদ জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ। লোকটি তো ভালই মনে হল। খানিকটা মনমরা গোছের। ভাঁড়ের চা খাচ্ছেন, বিড়ি টানছেন। আমি একটা বুদ্ধি খাঁটিয়ে আলাপটা সেরে ফেললাম।”
“কীরকম বুদ্ধি?” চন্দন বলল।
কিকিরা বললেন, “এজেন্ট সেজে গেলাম, বুঝলে। মানে দালাল। কলকাতার যাত্রা দলগুলোর দালাল থাকে বাইরে, দেখেছ না? মফস্বল শহরের দালাল, কোলিয়ারির দালাল, চা-বাগানের দালাল। আমি খানিকটা অন্যরকম দালাল হয়ে গেলাম। বললাম, আমি হলাম টিসি ইমপ্রেসারিও কোম্পানির এজেন্ট। আমরা বাইরে মফস্বল টাউনে নাচ, গান, থিয়েটার, সার্কাস–এইসব দেখাবার ব্যবস্থা করি। “
কিকিরার কথা শেষ হল না, তারাপদ যেন থ মেরে গিয়ে কোনোরকমে বলল, “আপনি এজেন্ট হয়ে গেলেন? ইমপ্রেসারিও কোম্পানির? বলেন কী সার?”
“হলাম। না হলে ভাব জমাব কেমন করে। কাজ বাগাবার জন্যে কত কী হতে হয় হে, তারাবাবু।”
“ও। টিসি কোম্পানি বলে আছে নাকি কোনো কোম্পানি?”
“তোমরাই আছ। তারা-চন্দন কোম্পানি। “
“আমরা?” তারাপদ চন্দনের দিকে তাকাল। তারপর হেসে ফেলল। “সত্যি স্যার, আপনি মাথা খাটাতে পারেন বটে।”
কিকিরা হাসতে-হাসতে বললেন, “মাথা থাকলেই খাটাতে হয়। না খাটালে মাথা আর মাথা থাকে না, ঘট হয়ে যায়। বুঝলে?”
চন্দন বলল, “আলাপ করে লাভ হল?”
“হল সামান্য। যেমন, সার্কাসে কী কী খেলা দেখানো হয়। ভাল খেলা কী আছে? কারা খেলা দেখায়–এইসব জেনে নিলুম। হরিশবাবুর মুখেই শুনলুম অলিভার দ্য জাম্পারের খেলাটা এখন বন্ধ আছে। ছোকরার অসুখ করেছে।” বলে একটু থেমে মুচকি হাসলেন। বললেন আবার, “ম্যাজিশিয়ান আদিনাথের নামটা হরিশবাবুর কাছ থেকেই জেনে নিলুম।”
তারাপদ বলল, “তাতে কোনো লাভ হবে?”
“আগে থেকে বলতে পারছি না। তবে একই জাতের পাখি তো, চান্স পেলে ভাই-ভাই হয়ে যেতে পারি। …তা, হরিশবাবু একদিন নেমন্তন্ন করলেন তাঁদের সার্কাস দেখতে যাওয়ার জন্যে। বললেন, আপনি আসুন একদিন আমাদের খেলা দেখুন, তারপর মালিকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দের কথা বলবেন।”
বগলা ট্রে করে চা নিয়ে ঘরে এল। চা আর সামান্য খাবার কুচো নিমকি, সেউ ডালমুট, শোনপাপড়ি।
চা আর খাবার নামিয়ে দিয়ে চলে গেল বগলা।
“নাও, হাত লাগাও-” কিকিরা অনিলকে বললেন। বলে তারাপদদের দিকে তাকলেন। “কাল-পরশু একদিন সার্কাস দেখতে যেতে হয়, কী বলে?”
“যান আপনি!” তারাপদ বলল “আপনাকে নেমন্তন্ন করেছে।”
“আমি একা কেন যাব, তোমরাও যাবে–তুমি আর চাঁদু। আমি তো এজেন্ট, মালিক হলে তোমরা। তোমরা পছন্দ করলে তবেই না সার্কাস কোম্পানির সঙ্গে কথাবার্তা হবে।”
চন্দন বলল, “কি যে বলেন আপনি! আমরা মালিক। ইমপ্রেসারিওর “ই’ জানি না, কথা বলব! ধরা পড়ে যাব, স্যার।”
“কথা বলতে হবে না; কথা আমি বলব। তোমরা শুধু হ্যাঁ করে যাবে, মাথা নাড়বে, কপাল কোঁচকাবে। এমন ভাবে করবে যেন, তোমাদের ঠিক পছন্দ নয় সার্কাসটা, বিজনেসের দিক থেকে। আমি শুধু তোমাদের তেলিয়ে যাব। এজেন্ট তো!”
“তারপর?”
“তারপর কিছু না। আসলে, তোমরা যাবে আমার সঙ্গে চারদিক নজর করতে। ওয়াচ করবে। আমার একার পক্ষে চারদিকে নজর করা সম্ভব নয়।”
চন্দন আর তারাপদ কিছুই বলল না। ওরা রাজি।
চা খেতে-খেতে কিকিরা এবার অনিলের দিকে তাকালেন। দেখছিলেন ছোকরাকে। কিকিরার মনে কোথায় যেন একটু খুঁতখুঁত করছিল। ছেলেটিকে দেখলে মনে হয় না ওর মধ্যে বাড়তি সাহস, বেপরোয়া ভাব তেমন একটা আছে। সার্কাসের কয়েকটি খেলা, যেমন ট্রাপিজ, জিপগাড়ি নিয়ে লাফানো, মোটর সাইকেল নিয়ে খাঁচার মধ্যে পাক খাওয়া–এসব খেলা দেখাতে হলে বেজায় সাহস, সঙ্কল্প, খানিকটা বেপরোয়া ভাব দরকার হয়। কিকিরার মনে হল, ছেলেটির চেহারা যেমন আছে–তাতে লাফ মারার খেলা দেখানোয় কোনও অসুবিধে নেই। তবে চেহারাই তো সব নয়, মনও দরকার।
