তারাপদ বিনয় করে বলল, “গলা না বেয়ালা বোঝা যাচ্ছে না সার, ভেরি সরি। মদনকে এখন বন্ধ করে দি’? কী বলেন! অনিলকে এনেছি।” বলে চোখের ইশারায় অনিলকে দেখাল।
কিকিরা নিজেই উঠলেন। গ্রামোফোন বন্ধ করলেন। পুরনো রেকর্ডটা জায়গা মতন রাখতে রাখতে বললেন, “তোমরা পুরনো জিনিসের কদর জানো না! যত্তসব আজকালকার সিনেমার গান নিয়ে নেচে বেড়াও। এই করে দেশটা গেল।” বলতে বলতে তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন। হাত বাড়িয়ে চন্দনদের বসতে বললেন।
চন্দন অনিলকে বসতে বলল।
কিকিরা বললেন, “কাল না এসে ভালই করেছ। আমি একবার বেরিয়েছিলাম। ফিরতে-ফিরতে সাতটা বেজে গেল। অবশ্য তোমরা বসে থাকলে দেখাত। বগলাকে বলে গিয়েছিলাম।”
চন্দন বলল, “কাল আর হল না। স্যার, এই হল অনিল।” কিকিরা অনিলের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কয়েক মুহূর্ত, দেখছিলেন যেন ছেলেটিকে। হাতের কব্জির কাছে একটা ব্যান্ডেজ। ক্রেপ ব্যান্ডেজ। কী মনে করে মুচকি হাসলেন। “অলিভার দ্য জাম্পার!”
অনিল কেমন যেন একটু চমকে উঠল। কিকিরাকে দেখছিল।
কিকিরা বললেন, “তোমাদের সার্কাসের বাইরে বড়বড় দুটো ছবি দেখলাম। কাপড়ের ওপর রংচং করে আঁকা। ট্রাপিজ, বাঘ, সিংহ, এক চাকা সাইকেল, ক্লাউন, তোমাদের খেলা দেখাবার ছবিও।…হ্যান্ডবিলও পেয়েছি হে।“
অনিল বুঝতে পারল। সার্কাস থিয়েটার-সিনেমা নয়। সেখানে কারও নাম থাকে না। খুব বিখ্যাত হলে অন্য কথা। অবশ্য হ্যান্ডবিলে সত্যিই তার নাম থাকে অলিভার দ্য জাম্পার বলে। কিন্তু অনিল তো খেলা দেখাচ্ছে না কদিন। পুরনো হ্যান্ডবিল পেয়েছেন বোধ হয় ভদ্রলোক। কিংবা ওরা ইচ্ছে। করেই নামটা কাটেনি।
তারাপদ বলল, “আপনি এর মধ্যে সার্কাসেও ঘুরে এসেছেন?”
হাসি-হাসি মুখে কিকিরা বললেন, “একবার ভিজিট করে এলাম। দেদার হোর্ডিং পোস্টার এঁটেছে বাইরে। রাস্তাতেও দু-চারটে হোর্ডিং দেখলাম। সার্কাসটা জমিয়ে ফেলেছে মনে হল।”
“আপনি কি সার্কাস দেখলেন?” চন্দন বলল।“
“না। এখনো দেখিনি। একদিন যাব দেখতে তোমাদের নিয়ে।”
“তা হলে আপনি কেন গিয়েছিলেন?”
কিকিরা নিজের জায়গায় বসতে বসতে বললেন, “খোঁজ-খবর করতে। একবার দেখে আসা ভাল। …তুমি কখনো ফিশিং, মানে মাছ ধরতে গিয়েছ, চাঁদু?”
“না।” মাথা নাড়ল চন্দন।
“যারা মাছধরার নেশায় মেতেছে তারা কোথাও মাছ ধরতে গেলে আগে পুকুর, দিঘি, খাল বা নদীর খোঁজখবর করে আসে, দেখে আসে। যেখানে-সেখানে ছিপ ফেললেই তো ফিশিং হয় না হে! আগেভাগে খোঁজখবর করে দেখে আসতে হয়।”
তারাপদ বলল, “আপনি কী দেখে এলেন?”
কিকিরা ধীরেসুস্থে, যেন গল্প শোনাচ্ছেন, হালকা ভাবে বললেন, “আমি কাল বিকেল-বিকেল মাকাস স্কোয়ারে গেলাম। কাল দুটো শো ছিল। প্রথম শো চলছে তখন। বাইরে তেমন একটা ভিড়ও নেই। সেকেন্ড শো ছ’টায়। আমি গিয়েছিলাম পাঁচটা নাগাদ। দেখলাম, তাঁবুর এখানে-ওখানে কটা রঙিন পতাকা উড়ছে, টিকিট কাউন্টারের কাছে কয়েকটা লোক, আশেপাশে কিছু ছেলে-ছোকরা, এক দঙ্গল বাচ্চা, সার্কাসের একটা ছোট তাঁবুবোধ হয় বাইরের অফিস। একজোড়া কাঠের রংকা রেলিং সামনে। একটা লোক ফোল্ডিং চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে ছিল। আশেপাশে পান-বিড়ি, ভাঁড়ের চা, গেলাবাদামের ফেরিঅলা।”
কিকিরা ছোট করে গোল্ডেন সার্কাসের আশপাশের বিবরণ দেওয়া শেষ করেছেন সবে, তারাপদ বলল, “আপনি শুধু এইসব দেখলেন?”
“না-না, দু-পাঁচটা খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করলাম।”
“কী খোঁজ পেলেন?”
“গোল্ডেন সার্কাসে যে ভদ্রলোক ম্যাজিক দেখান, তাঁর নাম আদিনাথ মজুমদার।
“বাঃ, স্যার, এখানেও ম্যাজিক?”
“এখানেও মানে! তুমি কি জীবনে সার্কাস-টাকাস দেখোনি। প্রত্যেক সার্কাসে একজন করে ম্যাজিশিয়ান থাকে। তারা খেলা দেখায়। হাত সাফাইয়ের খেলা। কেউ টুপির মধ্যে থেকে পায়রা বের করে, কেউ আধ বালতি জল খেয়ে আবার সেটা বের করে, কেউ জ্যান্ত মাছ মুখের মধ্যে পুরে দেয়, আবার বের করে নেয়..”
চন্দন বলল, “আমি দেখেছি স্যার।”
কিকিরা বললেন, “ভাল-ভাল সার্কাসে বড় দরের ম্যাজিশিয়ান রাখে। শুধু ম্যাজিশিয়ান কেন, অনেক রকম খেলোয়াড় রাখতে হয়। কেউ সাইকেলের খেলা দেখায়, কেউ দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটে, কেউ জিমনাস্টিক খেলা দেখায়।”
তারাপদ জানে সবই। বলল, “তা আদিনাথ কি আপনার চেনা নাকি?”
“না। ও-নাম আমি শুনিনি।”
“তা হলে?”
“জাতভাইয়ের খোঁজটা নিয়ে এলাম তারাবাবু। কাকে কখন কাজে লেগে যায়।”
“আর কী করলেন?”
“অলিভার দ্য জাম্পারের খেলাটার খবরও নিলাম। শুনলাম জাম্পারের অসুখ বলে খেলাটা এখন দেখানো হচ্ছে না। তার বদলে অন্য খেলা দেখাবার ব্যবস্থা হয়েছে।” বলে কিকিরা অনিলের দিকে তাকালেন।
অনিল কোনো কথাই বলছিল না। কিকিরাকে দেখছিল। তার কিছুতেই মাথায় ঢুকছিল না, এই রোগা লম্বা মামুলি একটা লোক তার কোন উপকার করতে পারে? ভদ্রলোককে দেখলে হয়ত মজাদার মানুষ বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এই লোকটির ক্ষমতা কতটুকু? অনিলের মোটেই ইচ্ছে ছিল না এখানে আসে; দিদির জন্য আসতে হল। দিদি জোর করলেন। ডাক্তারবাবুর কথায় দিদি কেন বিশ্বাস করলেন কে জানে!
কিকিরা অনিলকে দেখতে-দেখতে বললেন, “কী হে জাম্পারসাহেব। আমি ঠিক বলেছি কি না! আদিনাথ মজুমদার তোমাদের সার্কাসে ম্যাজিক দেখান না?”
