“এই সিস্টার তোমাকে তাঁর ভাইয়ের কথা বলেছেন?”
“হ্যাঁ। আসলে গত সোমবার আমি হাসপাতালে ছিলাম। নিজের ওয়ার্ড ছেড়ে একটু অন্য দরকারে ইমার্জেন্সিতে গিওগছিলাম। ফেরার সময় মায়াদির সঙ্গে দেখা। ছোকরা মতন একজনের সঙ্গে মায়াদি কথা বলছিলেন। তার ডান হাতে ব্যান্ডেজ। আমাকে দেখে ছোকরা তাড়াতাড়ি চলে গেল। মায়াদিকে বললাম, কী ব্যাপার? মায়াদি তখন আমাকে কথায় কথায় বললেন ব্যাপারটা।”
“ব্যান্ডেজ কেন?”
“চোট পেয়েছিল।”
“তারপর?”
“তারপর পরের দিন মায়াদি আমাকে এক জায়গায় ধরে নিয়ে গেলেন। সেখানে অনিলকে দেখলাম।”
“কোথায় ধরে নিয়ে গেলেন?”
“তালতলা। মায়াদির বাড়িতে সে থাকছে না ভয়ে। তালতলায় অন্য একটা বাড়িতে অনিল লুকিয়ে রয়েছে। বাড়িটায় নানা ধরনের লোক। অনিল এক বুড়ির কাছে শেল্টার নিয়েছে। ওদের চেনাজানা।”
কিকিরা কী যেন ভাবছিলেন। পরে বললেন, “আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না চাঁদু। অনিলকে তাদের সার্কাস পার্টির একটা লোক ভয় দেখাচ্ছে, মেরে ফেলব বলছে। মেরে ফেলব, খুন করব বললেই তো মেরে ফেলা যায় না। তা অনিল কেন কথাটা সার্কাসের মালিক বা ম্যানেজারকে বলল না। সে পালিয়ে এল কেন?
চন্দন বলল, “না পালিয়ে এলে তার হয়ত বড় বিপদ হত। কৃষ্ণমূর্তি শুধু পুরনো লোকই নয়, সার্কাসে তার ভীষণ ক্ষমতা। তা ছাড়া লোকটা নাকি নটোরিয়াস।”
“ভাল কথা। তা অনিল সরাসরি সার্কাস ছেড়ে চলে এলে পারত। চাকরি ছেড়ে। পালিয়ে এল কেন?”
“অনিল আপনাকে ভাল বলতে পারবে। আমায় যা বলল, তাতে মনে হল, সার্কাস দলের সঙ্গে ওর যা কনট্রাক্ট তাতে ও জখম, অসুস্থ বা বড় কোনো কারণ না ঘটলে খেলা দেখাতে বাধ্য। খেলা না দেখালে খেসারত দিতে হবে। টাকাটাও কম নয়।”
তারাপদ বলল, “কিকিরা আমার মনে হয়, অনিল যেরকম আপসেট হয়ে পড়েছিল–তাতে ওভাবে খেলা দেখানো যায় না। এসব খেলায় লাইফ রিস্ক। সেন্ট পার্সেন্ট কনসেনট্রেশান দরকার। মন ঠিক না থাকলে, যে-কোনো সময়ে একটা বিশ্রী রকম গণ্ডগোল হয়ে যেতে পারে। অনিল হয়ত সত্যিই বড় রকম জখম হত, মারা পড়ত।”
কিকিরা কিছু বললেন না।
সামান্য অপেক্ষা করে চন্দন বলল, “স্যার, আমি কি অনিলকে নিয়ে আসব এখানে? বা অন্য কোথাও যদি বলেন–তাকে ধরে আনতে পারি।”
কিকিরা ভাবলেন সামান্য। বললেন, “তুমি কি তাকে কিছু বলেছ?”
“না,” মাথা নাড়ল চন্দন, “স্পষ্ট কিছু বলিনি তাকে। তবে মায়াদিকে বলেছি। আপনার কথা বলেছি। মায়াদি আমার কথায় ভরসা করে বসে আছেন।”
তারাপদ বলল, “কেসটা নিয়ে নিন কিকিরা। এর আগে আপনি একজন জাদুকরের ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন। যদিও সে-বেচারি আগেই খুন হয়েছিল। এটা অবশ্য সার্কাস-খেলোয়াড়দের কে। এ এখনো বেঁচে আছে, হয়ত পরে আর বেঁচে থাকবে না।”
কিকিরা যেন একটু অসন্তুষ্ট হলেন। “কেন বেঁচে থাকবে না? সার্কাস ছেড়ে একজন পালিয়ে এসেছে বলে সে বেঁচে থাকবে না? এটা কি একটা কথা হল? অনিল নিশ্চয় ভয় পাচ্ছে। কিন্তু তার ভয় পাওয়ার পেছনে কতটা মনগড়া ব্যাপার আছে–আমরা তো জানি না। তা ছাড়া সে এভাবে লুকিয়ে থাকবে কেন? সার্কাসের লোক কি এই কলকাতা শহরে তাকে তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছে! আমার তো তা মনে হয় না। এত বড় কলকাতা শহরে লাখ লাখ লোকের ভিড়ে অনিলকে কেউ খুঁজে বেড়াবে। …পালিয়ে আসার যেকারণটা বলছে সেটা ছুতোও হতে পারে। অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। তবু আমি ধরে নিচ্ছি-অনিল যা বলছে তা সত্যি। কিন্তু একটা লোকের শাসানির ভয়ে খেলা দেখানো ছেড়ে পালিয়ে আসবে?”
চন্দন বলল, “আপনি ঠিকই বলেছেন। ঠিক এই কথাই আমি মায়াদি আর অনিলকে বলেছি। কিন্তু অনিলের ধারণা, কৃষ্ণমূর্তি সাঙ্ঘাতিক লোক। তার নানা ঘাঁটি আছে, চেনাজানা আছে কলকাতা শহরে সে নিশ্চয় অনিলের খোঁজ চালাচ্ছে।”
কিকিরা কী ভাবলেন। তারপর বললেন, “দেখা চাঁদু, সার্কাস পার্টি এক জায়গায় বেশিদিন থাকে না। দিন কতক পরে তারা এখান থেকে চলে যাবে। তখন আর কে অনিলের খোঁজ করতে আসছে! অনিল যেমন গা-ঢাকা দিয়ে আছে–সেইভাবেই না-হয় থেকে যাক দশ-পনেরোটা দিন। তারপর আর তার ভয়ের কিছু থাকবে না।”
চন্দন বলল, “হ্যাঁ, তা ঠিক। তবু আমার মনে হচ্ছে, সার্কাস, সার্কাস পার্টি, কৃষ্ণমূর্তি, অনিল–এদের মধ্যে অন্য কিছু ব্যাপার আছে। লুকনো ব্যাপার। সেটা আমাদের খোঁজ করে দেখলে ভাল হয়।”
কিকিরা ভাবলেন কিছু সময়। বললেন, “বেশ, অনিলকে তবে নিয়ে আসতে পারো। এখানেই নিয়ে এসে তাকে। কাল-পরশু, যেদিন সুবিধে হয়। “
.
০২.
পরের দিন, তার পরের দিন তারাপদরা অনিলকে নিয়ে হাজির। কিকিরা বাড়িতেই ছিলেন। আজ আর খাঁচার ছবি আঁকছিলেন না, বসে বসে গান শুনছিলেন। তাঁর সেই চোঙঅলা পুরনো গ্রামোফোনে কোন আদ্যিকালের এক রেকর্ড চাপিয়ে গান শুনছিলেন। যেমন গ্রামোফোন, তেমনই রেকর্ড। রেকর্ড থেকে খসখসে, অস্পষ্ট এক আওয়াজ বেরোচ্ছিল, গানের সুর বা কথা কিছুই। বোঝা যাচ্ছিল না।
তারাপদ বলল, “ওটা কার গান শুনছেন, স্যার?”
কিকিরা বললেন, “গান নয়, বেয়ালা।”
“বেয়ালা?”
“ওই যাকে তোমরা বলো বেহালা। আগেকার বুড়োরা বলত, বেয়ালা। প্রোফেসর মদন শীলের বেয়ালা শুনছি। মদন শীল ছিলেন জেনাফোন রেকর্ড কোম্পানির মিউজিক টিচার।”
