“না-না, আমি কেন দেখাব! হরেন দেখাবে। আমি সব তৈরি করে দিচ্ছি। এ হল ধোঁকাবাজির ব্যাপার। কল-কৌশলের খেলা। চালাকি আর বোকা বানানোর খেলা। খাঁচাটাই আসল। কায়দা করে তৈরি করাতে হয়। আমি ড্রয়িং করে দিচ্ছি, শিয়ালদার সুরি লেনের গঙ্গাপদ খাঁচাটা তৈরি করে দেবে। গঙ্গা হল কলকাতার এক নম্বর মিস্ত্রি, ম্যাজিকঅলাদের মিস্ত্রি।”
চন্দন বলল, “হরেন আবার কে?”
“ছোকরা ম্যাজিশিয়ান। অ্যামেচার। ব্যাঙ্কে কাজ করে। মাঝে-মাঝে ম্যাজিক দেখায় ছোটখাট জায়গায়। আমার কাছে আসে মাঝেসাঝে। “
এমন সময় চা এল। বগলা চা নিয়ে এসেছে।
চা নিতে নিতে তারাপদ দলল, “কিকিরা-সার, চাঁদু আপনার জন্যে একটা কেস নিয়ে এসেছে। ভেরি ইন্টারেস্টিং…।”
কিকিরা চা নিলেন। সরিয়ে রাখলেন ডেস্ক। বগলাই সরিয়ে রাখল।
বগলা চলে যাওয়ার পর কিকিরা চন্দনের মুখের দিকে তাকালেন। যেন বোঝবার চেষ্টা করছিলেন–কথাটা ঠিক, না বেঠিক।
চন্দন মাথা নাড়ল। বলল, “হ্যাঁ, স্যার।”
চায়ে চুমুক দিলেন কিকিরা। মুখ তুলে আবার তাকালেন। চোখে কৌতূহল। “কী কেস?”
চন্দন বলল, “সার্কাসের এক ছোকরার কেস স্যার।”
“সার্কাস?”
“গোল্ডেন সার্কাস। এখন মাকাস স্কোয়ারে খেলা দেখাচ্ছে।”
“গোল্ডেন সার্কাস!..ও! কাগজে যেন বিজ্ঞাপন দেখেছি। নতুন বলে মনে হচ্ছে।
“একেবারে নতুন নয়। বছর পাঁচ-সাতের সার্কাস। বাঙালি মালিক, সার। সার্কাস খুব বড় নয়, আবার একেবারে ছোটও নয়। আসলে পুরনো অনেক সার্কাস তো ভেঙে গিয়েছে। তারই কিছু কিছু খেলোয়াড় নিয়ে এই সার্কাস। এরা কলকাতায় বড় আসে না। পাত্তা পাবে না বলে। মফস্বল শহরেই বেশি ঘুরে বেড়ায়। কলকাতায় এক-আধবার আগে এসেছে। সুবিধে করতে পারেনি। এবারে এসে মাকাস স্কোয়ারে তাঁবু ফেলেছে।…সেই সার্কাসের এক ছোকরা…”
কিকিরা বললেন, “কী করে ছোকরা সার্কাসে?”
“খেলা দেখায়। খেলোয়াড়।”
“কিসের খেলা দেখায়?”
চন্দন বলল, “মোটর সাইকেলের। নাম অনিল। পুরো নাম অনিল ভৌমিক। সার্কাসে অনেকে ওকে ঠাট্টা করে “অলিভার বলে ডাকে। আসলে ওরা বাঙালি ক্রিশ্চান। অনিলের বয়েস বছর পঁচিশ-ছাব্বিশ। দেখতে ছিপছিপে। গায়ের রং কালো। মাথার চুল কোঁকড়ানো।”
কিকিরা বাধা দিয়ে বললেন, “ডেসক্রিপশন পরে; আগে কী হয়েছে শুনি।”
চন্দন একবার তারাপদর দিকে তাকাল। যেন তারাপদই বলবে ঘটনাটা। শেষে নিজেই বলল, “সার্কাস থেকে অনিল পালিয়ে এসেছে। ওকে বেশ কিছুদিন ধরে একটা লোক খুন করার চেষ্টা করছিল। মানে, হুমকি দিচ্ছিল। বারবার থ্রেট করায় ও ভয় পেয়ে পালিয়ে এসেছে।”
কিকিরা বললেন, “কে হুমকি দিচ্ছিল?”
“সার্কাসেরই অন্য একটা লোক। সেও খেলোয়াড়। পুরনো খেলোয়াড়। সেই লোকটাও মোটর সাইকেল নিয়ে খেলা দেখায়। তার নাম কৃষ্ণমূর্তি। সার্কাসে তাকে সবাই মাস্টার বলে ডাকে। লোকটার দারুণ দাপট সার্কাসে।”
কিকিরা চা খেতে-খেতে তাঁর সেই সরু ধরনের চুরুট ধরালেন। বললেন, “আরও একটু খুলে বলল। ঠিক ধরতে পারছি না।”
চন্দন ঘটনাটা যা বলল তা মোটামুটি এইরকম :
অনিল আজ বছর দুই হল সার্কাসে গিয়েছে। কৃষ্ণমূর্তি পুরনো লোক। গোল্ডেন সার্কাসের গোড়া থেকেই সে ওই দলে আছে। কৃষ্ণমূর্তি আর অনিল দু’জনেই মোটর সাইকেল নিয়ে খেলা দেখাত সার্কাসে। কৃষ্ণমূতির দেখাত পুরনো খেলা : একটা মস্ত বড় গোল খাঁচা বা গ্লোবের মধ্যে মোটর বাইক নিয়ে বন বন করে ঘুরত। নিচে, ওপরে, পাশে পাক খেত। খুবই চমকপ্রদ খেলা। ভয়ের খেলা। আর অনিল যে-খেলা দেখাত মোটর বাইক নিগে, সেটা অন্যরকম। অনিল খেলা দেখাত ফাঁকায়, সার্কাস রিঙের মধ্যে। একটার পর একটা বাধা টপকানোর খেলা, যেমন প্রথমে টপকাত সার দিয়ে সাজিয়ে রাখা চারটে ড্রাম, তারপর টপকাত আগুন, তারপর জোড়া কাচের দরজা। জোড়া। কাচের দরজা মানে দুটো বিশাল কাঁচ দুদিকে “A’ অক্ষরের মতন সাজানো থাকত, তার তলা দিয়ে গলে যেত হাই স্পিডে। শেষপর্যন্ত ছিল, স্পট জাম্প।…অনিলের এই খেলাগুলো নতুন ধরনের। সচরাচর কোনো সার্কাসে দেখা যায় না। গ্লোবের মধ্যে মোটর সাইকেল নিয়ে পাক মারার খেলাটা যতই কেননা চমকপ্রদ হোক, খেলাটা এখন পুরনো হয়ে গিয়েছে। প্রায় সব সার্কাসেই এটা দেখা যায় আজকাল। বোধ হয় তার ফলে, অনিলের খেলা নতুন ধরনের বলে, দর্শকদের ভাল লাগত বেশি, হাততালির ঝড় উঠত। সার্কাসে অনিলের কদর বেড়ে যাচ্ছিল। কৃষ্ণমূর্তি মাস্টারের এটা পছন্দ হয়নি। প্রথমে সে অনিলকে হিংসে করতে শুরু করে। ঘৃণা করত শেষে তার পেছনে লাগে। এমনকী দু-একবার তাকে জখম করার চেষ্টাও করেছিল। আর হালে তো অনিলকে ক্রমাগত শাসাচ্ছিল। বলছিল, ছোকরাটাকে সে খতম করে। দেবে। অনিলের আর সাহস হয়নি। সে ভয় পেয়ে সার্কাস ছেড়ে পালিয়ে এসেছে।
কিকিরা মন দিয়ে সব শুনছিলেন। মাঝে-মাঝে মাথাও নাড়ছিলেন।
তারাপদ বলল, “আমি চাঁদুকে বলেছিলাম, অনিলকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে। সে থাকলে, আপনি ভাল করে সব শুনতে পেতেন।”
কিকিরা চন্দনকে বললেন, “তুমি ওই অনিল ছোকরাকে চেনো?”
চন্দন মাথা নাড়ল। “আগে চিনতাম না। আজ ক’দিন হল চিনেছি।”
“কেমন করে?”
“আমাদের হাসপাতালে এক সিনিয়র সিস্টার আছেন। নাম মায়া। আমরা তাঁকে মায়াদি বলি। অনিল মায়াদির ভাই।”
