সিংহ বলল, “রায়সাহেব, আমার মনে হয়, মোহনবাবুর এখানে একটা চাল ছিল। উনি নিজেই এগুলো ফুলকুমারের কাছ থেকে চুরি করেছিলেন। চোরাইমাল কেমন করে পাচার করবেন, দুজনের মধ্যে আগেই শলাপরামর্শ হয়ে গিয়েছিল। বোধহয় সব দিক থেকে ভেবেচিন্তে ঠিক করা হয়েছিল, ফুলকুমারের ম্যাজিক দেখানোর দিন, হারমোনিয়ামের মধ্যে করে পাচার করাই সবচেয়ে সুবিধের।”
কিকিরা বললেন, “বোধহয়, ঠিকই বলেছেন। মোট কথা কমল সেদিন হারমোনিয়াম চুরি করার ছক সাজিয়ে বাজনাটা চুরি করে। কিন্তু..।”
“কিন্তু! কিসের কিন্তু?”
“হারমোনিয়ামের মধ্যে কিছু ছিল না। কমল স্বীকার করেছে, সে কিছু পায়নি।”
“সে মিথ্যে কথা বলছে না তার প্রমাণ কী?”
“প্রমাণ মোহনভাই!” কিকিরা রাজকুমারের দিকে তাকালেন। বললেন, “রাজাবাবু, আপনি কি একদিন মোহনভাইকে ভাল করে নজর করেননি?”
“করেছি, রায়বাবু! ও দোকানে আসছিল না। বাড়িতে নিজের ঘরে চুপ করে বসে থাকত। কান্নাকাটি করত। ওর স্ত্রী আর আমার স্ত্রী মোহনকে অনেক করে সমঝিয়েছে। আমি ভাবতাম, ফুলকুমারের জন্যে মোহনের এই অবস্থা। ছোট ভাই খুন হয়ে যাওয়ায় নিজেকে ও সামলাতে পারছে না। কেমন করে বুঝব, রায়বাবু, আমার ফ্যামিলিতে…” কথা শেষ করতে পারলেন না রাজকুমার। গলা বুজে গেল।
কিকিরা বললেন, “মোহনভাই আমায় বলেছে, রায়বাবু, উনি জানতেন না ফুলকে ওরা মেরে ফেলবে। ওরা চুরি করবে জানতেন। মেরে ফেলবে। ভাবেননি। হারমোনিয়ামের মধ্যে ফুল কিছু নিতে পারেনি। আমি জানি। মোহনভাই বলেছেন–আমার পাপে আমার ভাই মরল। আমাকে জেলে দিন।”
রাজকুমার হঠাৎ যেন কেঁদে ফেললেন। বগলা বাতি এনে ঘরে রাখল।
কিকিরা বললেন, “পুলিশ মোহনভাইকে ছাড়বে না রাজাবাবু! আপনি থানায় যান কাল সকালে। উকিলের সঙ্গেও কথা বলুন। দেখুন, কার ভাগ্যে কী আছে! হরিমাধব, মোতিয়া, কমল এখন পুলিশের হেফাজতে। মোহনভাইকেও ছেড়ে দেবে না পুলিশ! দেখুন কী হয়!”
২.৩ সাকার্স থেকে পালিয়ে
০১.
শীত তখনো ফুরিয়ে যায়নি। মাঘের শেষ। এক-একদিন মনে হয়, এই বুঝি শীত গেল, বসন্ত এল। আবার কোনো কোনো দিন শীতের ছোঁয়া থাকে বাতাসে।
সেদিন সামান্য শীত শীত ভাব ছিল। কিকিরা নিজের ঘরে বসে কী যেন করছিলেন। ড্রয়িং পেপার, পেনসিল, স্কেল, কম্পাস, রঙিন সিসকলম সামনে সাজানো রয়েছে। বাতি জ্বলছিল। ডেস্কের মতন এক কাঠের হেলানো তক্তা তাঁর হাতের কাছে।
এমন সময় সদরে ডোর-বেলের শব্দ। তারপরই তারাপদর গলা। বগলার সঙ্গে কথা বলছে তারাপদ।
প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই তারাপদ আর চন্দন ঘরে এল।
কিকিরা হাতের কাজে সারতে-সারতে আড়চোখে যেন দুজনকে দেখে নিলেন। মুখে বললেন, “হ্যালো?”
তারাপদ দু’ পা এগিয়ে এসে একটু ঝুঁকে পড়ে কী যেন দেখল। বলল, “স্যার, আপনি যেন খুব ব্যস্ত?”
কিকিরা বললেন, “খুব নয়, অল্প-স্বল্প। বোসো। তারপর কী খবর তোমাদের?”
দিন দশেক এদিকে আর আসা হয়নি তারাপদদের। হপ্তায় অন্তত একবার এ বাড়িতে না এলে কিকিরা বেশ অখুশি হন। অভিমানু হয় তাঁর। চাঁদু ডাক্তার, সে তার হাসপাতালের দোহাই দিয়ে পার পেয়ে যায়। তারাপদ নিছক কেরানি। তার কোনো কৈফিয়ত কিকিরা কানে তোলেন না।
তারাপদ আর চন্দন বসল।
তারাপদ বলল, “খবর অনেক, স্যার। প্রথম খবর, আমি সর্দি-জ্বরে দিন চারেক কাবু হয়ে পড়ে ছিলাম। দ্বিতীয় খবর, চাঁদু একটা ঝাট বয়ে এনেছে। আপনি তো আপাতত বেকার…।”
চন্দন বলল, “আমাদের কথা পরে বলছি। আপনার খবর কী? ওটা আপনি কী করছেন?”
“ড্রয়িং।” কিকিরা গম্ভীর গলায় বললেন
। “ড্রয়িং! হঠাৎ ড্রয়িং কেন? কিসের ড্রয়িং?”
“খাঁচা। “
“খাঁচা?…বলেন কী! সন্ধেবেলা বসে বসে খাঁচা আঁকছেন?”
তারাপদ তামাশার গলায় বলল, “খাঁচা আঁকতে অত সাজ-সরঞ্জাম লাগে নাকি, কিকিরা? এ কোন খাঁচা? বাঘের খাঁচা নিশ্চয় নয়।”
কিকিরা বললেন, “খাঁচার তুমি কী বোঝ? খাঁচার কত ভ্যারাইটি আছে জান? বর্মি-খাঁচা দেখেছ? তিব্বতি-খাঁচা? ইউ নো নাথিং।”
তারাপদ হাত জোড় করে বলল, “ভেরি সরি সার। আমি কিছু জানি না। এখন দয়া করে বলুন, এই বয়েসে হঠাৎ রং পেনসিল নিয়ে খাঁচা আঁকবার শখ হল কেন? আমরা তো ওয়ান-টু ক্লাসে পড়ার সময় এইসব এঁকেছি চায়ের কেটলি, কলা, কমলালেবু, কাপ-ডিশ, গেলাস, খাঁচা…!”
কিকিরা এবার মুখ তুললেন। বললেন, “এ তোমার ওয়ান-টু ক্লাসের খাঁচা নয়। এ হল ম্যাজিক-খাঁচা। ম্যাজিশিয়ানস কেজ।”
“মানে?”
“মানে, ম্যাজিক দেখাবার খাঁচা, ম্যাজিশিয়ানদের খেলা দেখাবার খাঁচা।”
“ও!..তা এতে কী খেলা দেখানো হবে, সার?”
“হবে।” মাথা নাড়তে নাড়তে কিকিরা বললেন, “প্রথমে এই খাঁচায় একটা পাখি থাকবে। ছোট্ট পাখি। পাখি সমেত খাঁচাটা তোমাকে দেখানো হবে। তারপর একটা কালো কাপড় ঢাকা দেব খাঁচার ওপর। দু-চারটে বোলচাল দিয়ে যেই না কাপড়টা তুলব, দেখবে খাঁচা আছে–পাখি নেই। নো বার্ড অনলি খাঁচা। “
তারাপদ বলল, “বাঃ! পাখি ফুড়ত?”
“নো স্যার। আবার কালো কাপড়টা ঢাকা দেব। দু-পাঁচটা বাত-চিত হবে। কাপড়টা তুলে নেব খাঁচার ওপর থেকে; দ্য বার্ড ইজ দেয়ার..”
তারাপদ মজার গলায় বলল, “দারুণ! খাঁচার পাখি ছিল খাঁচায়–তারপর ভ্যানিশ। আবার দেখতে-দেখতে খাঁচায়। তা স্যার আপনি কি আবার খেলা দেখাবেন ভাবছেন নাকি?”
