“হারমোনিয়ামটা তার আগেই পাচার হয়ে গিয়েছিল?” তারাপদ জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ। সঙ্গে-সঙ্গে।”
“কেউ দেখতে পেল না?”
“পাবার কথা নয়। তোমরা লালাজির কাছেই শুনেছ, ফুলকুমার কালো পোশাক পরে খেলা দেখাত। ঠিকই করত। নয়ত ভূতের খেলা জমে না। যে-লোকটা ফুলকুমারকে জখম করেছিল, সেও কালো পোশাকে ঢুকেছিল। হারমোনিয়াম নিয়ে যাবার সময়ও কালো কাপড়ে চাপা দিয়ে নিয়ে পালিয়েছে।”
“কেমন করে পালাল?” চন্দন জিজ্ঞেস করল।
“পালানোর পথ ছিল। তোমরা স্টেজটা মনে করে দেখো। সাজঘরের পাশ দিয়ে প্যাসেজ ছিল। সেই প্যাসেজ দিয়ে হলের বাইরে এসে পেছন দিকে গিয়ে দাঁড়ালে একটা গুদোমখানার মতন, যত কাঠকুটো, ছেঁড়াফাটা জিনিস জড়ো হয়ে আছে। তার পাশে কল একটা। তার পরই ভাঙা পাঁচিল। একবার পাঁচিল টপকে বেরিয়ে আসতে পারলে আর কে মারে! সামান্য এগিয়ে গেলেই তো গাড়ি চড়ে পালাতে পারবে।”
তারাপদ মনে-মনে জায়গাটার কথা ভেবে নিল। কিকিরা ঠিকই বলছেন। “ওদের গাড়ি দাঁড় করানো ছিল, তাই না কিকিরা?”
“নিশ্চয় ছিল। নয়ত পালাবে কেমন করে?”
চন্দন নিজের মনেই মাথা নাড়ল। ববি সিগারেট ধরাল। সকলকেই উত্তেজিত মনে হচ্ছিল।
রাজকুমার বললেন, “রায়বাবু, ওই লোকটা কে, যে ফুলকুমারকে খুন করল? কেন খুন করল?”
কিকিরা কিছুক্ষণ কোনো কথা বললেন না। পরে নিজের জায়গায় বসতে বসতে বললেন, “রাজাবাবু, আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, মোতিয়া ফুলকুমারকে খুন করেছে। পরে বুঝলাম, মোতিয়া নয়। কমল অতি ধূর্ত। সে একটা ছক সাজিয়েছিল। ছকটা কেমন জানেন? একজনের ওপর ভার পড়েছিল, ফুলকুমারকে জখম করার। ফুলকুমারকে জখম করে সে হারমোনিয়ামটা নিয়ে পালিয়ে আসবে হলের বাইরে। অন্য একজনকে ঠিক করে রেখেছিল কমল, তার ওপর হুকুম ছিল, ভাঙা পাঁচিলের সামনে গা-ঢাকা দিয়ে সে দাঁড়িয়ে থাকবে, হারমোনিয়ামটা হাতে পাবার পর সোজা গাড়িতে গিয়ে উঠবে। যে ফুলকুমারকে জখম করেছিল সে ওরই দলের লোক, ম্যাজিক-পার্টির লোক, একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট। সে সব জানত। জানত কেমন করে, কোন্ সময় ফুলকুমারকে জখম করা যায়। আর এটাও জানত, জখম করে পালিয়ে গেলে পুলিশ তাকে সন্দেহ করবে। কাজেই সে আবার স্টেজে ফিরে এসেছিল। তখন ফুলকুমারকে নিয়ে হইচই হচ্ছে। ওই অবস্থায় তার ওপর নজর পড়ার কথা নয়। এই লোকটা কে হতে পারে?”
চন্দন বলল, “আগে তো মনে হত মোতিয়া। সে কিছুক্ষণ নিজের জায়গায় ছিল না।”
“হ্যাঁ। কিন্তু মোতিয়া নয়। সেই লোকটার নাম হরিমাধব। ফুলকুমারের ম্যাজিক-পার্টির ম্যানেজার। নতুন ম্যানেজারও বলতে পারেন।”
“হরিমাধব?” রাজকুমার অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে থাকলেন। ভাল করে চেনেনও না ছোকরাকে।
কিকিরা বললেন, “মোতিয়া এই ছকের মধ্যে ছিল। জানত সব। কিন্তু সে ফুলকুমারকে জখম করেনি। তার ওপর ভার দেওয়া ছিল, কমলের ছকমতন যেন সব ঠিকঠাক হয়, ম্যাজিক-শো চলার সময়, সেটা লক্ষ রাখতে। মোতিয়া তার কাজ করেছিল। কিন্তু ভাবতে পারেনি, ফুলকুমারকে ওরা মেরে ফেলবে। ভেবেছিল, ফুলকুমার জখম হবে, চোট পাবে, বেহুঁশ হয়ে থাকবে কিছুক্ষণ। ফুলকুমার মারা যেতে সে ভয় পেয়ে গেল। তারপর দু-একদিনের মধ্যে ফেরার হল।”
তারাপদ বলল, “মোতিয়া এখন কোথায়?”
“পুলিশ হাজতে। আজ সকালে সে নিজে থানায় গিয়ে ধরা দিয়েছে। কমলের হোটেলে সে লুকিয়ে ছিল। কমল ধরা পড়ার পর, সে নিজের থেকে গিয়েই ধরা দিল। ভালই করেছে।”
কিকিরার কথা শেষ হল কি হল না, বাতি চলে গেল। অন্ধকার। লোডশেডিং হয়ে গেল।
হঠাৎ কেমন চুপচাপ। কেউ কোনো কথা বলছিল না।
শেষে রাজকুমার বললেন, “রায়বাবু, হারমোনিয়ামের আন্দার কোন্ চিজ ছিল? আগার ফাঁকা থাকত তো…!”
কিকিরা বললেন, “কুমারবাবু, রাজাবাবু! আপনি বহুত কুছ জানেন না।” কিকিরা ইচ্ছে করেই একটু হিন্দি কথা বললেন, “আপনি জানতেন না, আপনার ছোট ভাই খেলনার দোকানের নাম করে চোরাই সোনা, পাথর, রিভলবার, আরও হয়ত কিছু বিক্রি করে। ও ছিল স্মাগলারদের বড় এজেন্ট। আপনি এটাও জানেন না রাজাবাবু, আপনার মেজো ভাই, মোহনবাবুর হঠাৎ মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ফুলকুমারের ব্যবসার কথা মোহনভাই জানতে পারে। টাকার লোভ বড় লোভ। ছোট ভাইকে ভয় দেখিয়ে টাকা-পয়সা নিত মোহনভাই। পরে ফুলকুমার তার দাদাকে বাধ্য হয়ে নিজের কথা মাঝে সাঝে বলত। মোহনভাই আবার কমলের সঙ্গে লুকিয়ে যোগাযোগ করত। ফুলকুমারের হাতে নতুন কী এসেছে, তার দাম কত হতে পারে, জানিয়ে দিত। কমল আবার ফুলকুমারকে নজরে রাখত, চাপ দিত, যেন ওই জিনিসগুলো তার হাত দিয়ে বিক্রি হয়। মানে, তার মক্কেলরা কিনতে পারে।”
“কমল বিক্রির ওপর কমিশন নিত?”
“হ্যাঁ। ফুলকুমারকে নিজের কমিশন থেকে কমলকে ভাগ দিতে হত। সব সময় সেটা পছন্দ করত না ফুলকুমার।”
“সেদিন কী হয়েছিল?”
কিকিরা বললেন, “মোহনভাই কমলকে আগেই খবর দিয়েছিলেন, লাখ চারেক টাকার দামি পাথর, হীরে, চুনি আর নীলা, ফুলকুমার তার হারমোনিয়ামের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে যাবে ঠিক করেছে। ম্যাজিক দেখানোর পর পাথরগুলো সে অন্য একজন দালালকে দিয়ে দিতে পারে কিংবা কোনো জুয়েলারকে। পাথরগুলো একটা কাগজের প্যাকেটে থাকবে। তুলোর মধ্যে জড়ানো। জিনিসটা থাকবে হারমোনিয়ামের মধ্যে লুকনো। মোহনাই চায়, অন্যের হাতে গিয়ে পড়ার আগে যেন কমল সেটা হাতিয়ে নেয়।
