কিকিরার কথামতন তাঁর চোখ বাঁধা হল। ঘর অন্ধকার করা হল। ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল ঘর। শোবার ঘরের হাত কয়েক তফাতে গ্রামোফোন।
কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। কিকিরা বললেন, “অধৈর্য হবেন না, আমার আজকাল অভ্যেস নেই। একটু দেরি হবে। ততক্ষণ আপনারা ভূতের নাম জপ করুন।”
রাজকুমাররা বসে থাকলেন। চুপচাপ। সময় কাটতে লাগল। পাঁচ-সাত মিনিট কেটে গেল। কোনো সাড়াশব্দ নেই। অন্ধকারে বসে থাকল তারাপদরা। তারপর কখন যেন শব্দ হল। ঘষঘষে শব্দ। শেষে গান বেজে উঠল গ্রামোফোনে। রেকর্ড বাজছিল।
কিকিরার গলা শোনা গেল, “চন্দন, আলোটা জ্বেলে দাও।”
চন্দন আলো জ্বালল।
কিকিরা গ্রামোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে। হাতের বাঁধন খোলা। চোখের বাঁধন আগের মতনই। হাসছেন।
চন্দন হাততালি দিয়ে উঠল, “দারুণ কিকিরা স্যার। ওয়ান্ডারফুল।”
“চোখটা খুলে দাও।”
ববি এগিয়ে গিয়ে চোখের বাঁধন খুলল। খুলতে খুলতে বলল, “আলগা লাগছে কিকিরাসাহেব?” বলে হাসল।
কিকিরা একবার চোখ রগড়ে নিলেন। তাকালেন সকলের দিকে। হাসলেন। বললেন, “আপনারা অবাক হবেন না। এর মধ্যে অদ্ভুত কিছু নেই। একে বলা হয়, ব্ল্যাক আর্ট। মানে কালোর খেলা। কালোয় ঢেকেছে আলো। কালোর মধ্যে কালো দেখা যায় না। ঘুটঘুটে অন্ধকারে আপনি কালো জামা পরে যদি দাঁড়িয়ে থাকেন, আপনাকে দেখবে কার সাধ্য!এই দেখুন, আমার প্যান্ট কালো, জামা কালো, মায় মাথায় সাদা চুল চোখে পড়ে, সেই ভয়ে একটা কালচে বাঁদুরে টুপি পরেছি। টুপিটা আমার পকেটেই ছিল, হাতের বাঁধন খোলার পর পরে নিয়েছি।”
সিংহ বলল, “জানলার পরদাগুলোও তো কালো।”
“ইচ্ছে করেই টাঙানো হয়েছে সিনাসাহেব। যাতে আলো না আসতে পারে। আর একটা জিনিস দেখুন, গ্রামোফোনটা এমনভাবে রাখা আছে, যাতে আমি খুব সহজে দেওয়াল ধরে সেখানে যেতে পারি। আমার নিজের ঘরবাড়ি, ঘরটাও ছোট, কাজেই আমার আন্দাজ আছে, অভ্যেস আছে।”
ববি বলল, “আপনি হাতের বাঁধন খুললেন কেমন করে?”
কিকিরা হাসলেন। “আমি ম্যাজিশিয়ান। বাঁধন খোলা আমার পক্ষে একটুও কঠিন নয়। হ্যান্ডকা খোলা আরও সোজা। অনেক রকম হ্যান্ডকা হয় ম্যাজিশিয়ানদের। যে যেমন পারে এক-একটা গালভরা নাম দিয়ে নেয়। ওর মধ্যে কলাকৌশল আছে। ট্রিক। খানিকটা আবার হাত-পায়ের অভ্যেস।”
“আপনি কি বলতে চাইছেন, ফুলকুমারের হারমোনিয়াম বাজানোর সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে?”
“হ্যাঁ,” কিকিরা মাথা নাড়লেন, “ফুলকুমার কেমন করে হারমোনিয়াম বাজানোর খেলাটা দেখাত, আমি তার দলের লোকদের জিজ্ঞেস করে করে জেনে নিয়েছি। সে খেলাটা দেখাত, স্টেজ উইদিন দি স্টেজ করে, আমরা আগে একে বলতাম ডাবল স্টেজ। এখন কী বলে জানি না।”
“লালাজি বলেছিলেন..” তারাপদ কিছু বলতে গেল।
“লালাজি ঠিকই বলেছিলেন। তাঁর বলতে একটু ভুল হয়েছিল। তিনি দু’ নম্বর স্টেজটাকেই স্টেজ বলেছিলেন। আর তিনি বলেননি, বা বলতে পারেননি, ছোট স্টেজের পেছন আর দু পাশ ঢাকা ছিল। ইট ওয়াজ অল্ ব্ল্যাক। সামনের দিকটা ছিল খোলা। আর সামনে একটা টেবিলের ওপর হারমোনিয়ামটা রাখা ছিল। ফুলকুমার হাত-দুই তফাতে দাঁড়িয়ে ছিল।”
“আপনি বলতে চাইছেন ফুলকুমার নিজেই হারমোনিয়াম বাজাচ্ছিল?”
“হ্যাঁ।”
“হ্যান্ডকাফ খুলে ফেলে?”
“অবশ্যই। ফুলকুমারের অ্যাসিসট্যান্ট মোতিয়া যে হ্যান্ডকা লাগানোর পর চাবিটা দর্শকদের কাছে দিয়ে আসত, ওটা নেহাতই ধাপ্পা। দশটা চাবি দিয়ে এলেও হ্যান্ডকাফ খোলা কিছু নয়।”
“ওকে কেমন করে মারা হল?”
“ফুলকুমারকে মারা হয়েছে বুদ্ধি করে। প্ল্যান করে। প্রথম দফায় সে একটা গৎ বাজায় হারমোনিয়ামে। বাজনা শেষ হলে, বড় স্টেজের আলো জ্বেলে দেখানো হয়, হ্যান্ডকা বাঁধা অবস্থায় সে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ বাঁধা। তার সামনে হারমোনিয়াম। মানে দর্শকদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়, দেখো হে, ম্যাজিশিয়ান সেই একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে।”
“গুড শো!” ববি বলল।
“দ্বিতীয় দফায় যখন নতুন করে ফুলকুমার হারমোনিয়াম বাজাতে শুরু করে, তখন দু নম্বর স্টেজের পেছনের লুকনো জায়গা থেকে কালো পোশাক পরা কেউ এসে তার মাথার পেছন দিকে মারে। ভারী শক্ত জিনিস দিয়ে মেরেছিল। হাতুড়ি বা কোনো রকম ভারী ওজনের লোহা দিয়ে। ফুলকুমার মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। বাজনা যায় বন্ধ হয়ে। ওই সময় স্টেজ পুরো অন্ধকার। ব্যাপারটা কী হচ্ছে খেয়াল হতে সময় যায় খানিকটা। আর তারপর যখন আলো জ্বালানো হয়, দেখা যায়, ফুলকুমার মাটিতে পড়ে আছে।”
সিংহ বলল, “হারমোনিয়ামও গায়েব?”
“তাই হয়েছিল। তখন ওই অবস্থার মধ্যে কেউ হারমোনিয়ামের কথা খেয়াল করেনি। পরে যখন খেয়াল হল, দেখল, বাক্সটা আছে হারমোনিয়ামের। ভাবল, ঠিক আছে। আরও পরে তাদের খেয়াল হল, বাক্সটা আছে, হারমোনিয়াম নেই।”
চন্দন বলল, “কিন্তু কিকিরা, আমরা প্রথমে শুনেছিলাম, ফুলকুমারের হ্যান্ডকা মোতিয়া খুলে দিয়েছিল।”
কিকিরা বললেন, “আমার মনে হয়, মোতিয়া হ্যান্ডকা খোলার ভড়ং দেখিয়েছিল। পাছে লোকে দেখে ফেলে ফুলকুমারের এক হাতের হ্যান্ডকা খোলা, তাই ঝটপট মাটিতে বসে পড়ে অন্য হাতের হ্যান্ডকা খুলে দেয়। আসলে সে ধোঁকা দিয়েছিল। ওই রকম একটা সাঙ্ঘাতিক সময়ে, সবাই দিশেহারা, কেউ বুঝতে পারছে না, কী হল, কী করবে!”
