“ভদ্রলোক মধুপুরের?” তারাপদ জিজ্ঞেস করল।
“না। মধুপুরের নন। ভদ্রলোকের টিকিট ছিল কিউলের। পকেটে শ’ দুয়েক টাকা, একটা হিন্দি ম্যাগাজিন ছাড়া, আমরা আর কিছু পাইনি। জিনিসপত্রের মধ্যেও কোনো ঠিকানা ছিল না। উনি যে কেন মধুপুরে নেমে গিয়েছিলেন তাও বোঝা গেল না। এমন হতে পারে, কেউ ভদ্রলোককে ফলো করছিল। হয়ত হীরের জন্যেই। ভদ্রলোক ভয় পেয়েই হোক, বা লোকটাকে এড়াবার জন্যে হোক, মাঝপথেই নেমে পড়েন। এবং হার্ট অ্যাটাকে মারা যান।”
রাজকুমার বললেন, “আপনারা তার কোনো পাত্তা পাননি?”
“না। উনি কে, কোথাকার লোক, আমরা জানতে পারিনি। কিউলের টিকিট সঙ্গে ছিল ঠিকই, তবে কিউলের লোক নন। উনি কিউল থেকে অন্য কোথাও চলে যেতেন হয়ত।”
“তারপর?”
“আমাদের বড় কর্তাদের সন্দেহ হয়, চোরাই-সোনা আর হীরে-চুনি-পান্না, নানা রকম স্টোনের কারবার চলছে ওদিকে। এটা তার প্রমাণ। নেশাভাঙের চোরাই-চালান আমাদের হাতে ধরা পড়ত মাঝে-মাঝে। সোনাদানা, হীরে আমরা আগে পাইনি। আমার কতারা ব্যাপারটা তদন্ত করার জন্যে আমাকে বেছে নিলেন। আমার ওপর ভার পড়ল কলকাতায় এসে ইভেস্টিগেট করার। আমি বিজয় মুস্তাফি সেজে এখানে আমার কাজ করছিলাম,” সিংহ হাসল হালকাভাবে, বলল, “আমার কপাল ভাল, কৃষ্ণা নাশারির আতাবাবুর সঙ্গে একটা সম্পর্ক আছে আমার। সুবিধেই হয়েছিল কাজের।”
“এখানে এসে আপনি ফুলকুমারের ওপর নজর রেখে যাচ্ছিলেন?” চন্দন। বলল।
“হ্যাঁ। ফুলকুমারের দোকান আমার কাছে খুবই সন্দেহজনক মনে হয়। একটা কথা বলা দরকার। যে-পুতুলের মধ্যে আমরা হীরে দুটো পাই, সেটা যেবাক্সে রাখা ছিল, তার একপাশে ফুলকুমারের দোকানের রাবার স্ট্যাম্প ছিল, এ কথা আগেই বলেছি আপনাদের। কিন্তু সেই সূত্র ধরে ফুলকুমারকে ধরা বা দোষী বলা যেত না, বা বললেও সেটা বোকামি হত। …আমি ওর দোকানের ওপর নজর রাখতে শুরু করি। ওর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিশে ভেতরের খোঁজখবর নেবার চেষ্টা করি। কমলকে আমি শেষ পর্যন্ত হাতে আনতে পেরেছিলাম। কমল বুঝতেই পারেনি আমি পুলিশের লোক
ববি বলল, “আপনি আমাকে সন্দেহ করতেন।”
সিংহ হাতজোড় করে বলল, “আমরা নানা চালে চলি। আপনাকে সন্দেহ হয়, এটা না দেখালে কমল আমার হাতে থাকত না। সরি, ববিসাহেব। কিছু মনে করবেন না।”
রাজকুমার বললেন, “আপনি কমলকে ধরলেন না কেন?”
“ধরার সময় হলেই ধরতাম। ফুলকুমারকে হাতেনাতে ধরব বলেই অপেক্ষা করেছি। শুধু ও কেন, ওর সঙ্গে সেইসব রুই কাতলা, যারা এই ব্যবসাটা চালাচ্ছে। তবে, বলতেই হবে ফুলকুমার প্রচণ্ড চালাক ছিল, ভেরি মাচ ক্লেভার। ওকে সরাসরি ধরা সহজ ছিল না। তবে ধরা পড়ত, দুদিন আগে আর পরে। এমন সময় ফুলকুমার খুন হল। আমাকেও থমকে দাঁড়াতে হল। খুনের ঘটনাটা আমার কাছে মিস্টিরিয়াস মনে হচ্ছিল। আমি ভাবছিলাম, কী করা যায়। এমন সময় রায়সাহেব হাজির হলেন,” বলে সিংহসাহেব হাত বাড়িয়ে কিকিরাকে দেখাল, “পরের ব্যাপারটা উনিই জানেন, আমি জানি না।” একটু থেমে সিংহ কী মনে করে হাসল। বলল, “ছোট একটা কথা বলে নিই, রায়সাহেব। আমি যে খোঁড়া নই, এটা আপনি ধরতে পারবেন, আমি মোটামুটি সেটা আন্দাজ করেছিলাম। আপনি বড় আচমকা গিয়ে পড়েছিলেন। আমি তৈরি হতে পারিনি। আমার একটা মোজা ধরনের জিনিস আছে, নাইলনের। গায়ের চামড়ার সঙ্গে এমনভাবে মিশে থাকে যে, ধরা যায় না। তার রঙ খানিকটা মরা চামড়ার মতন। সেটা আমি খোঁড়া পায়ে পরতাম। পরে তার ওপর প্যান্ট চাপাতাম। সেদিন কমল আমার ঘর থেকে চলে যাবার পর, সবে আমি মোজাটা খুলে লুঙ্গি পরেছি, আপনারা গিয়ে হাজির। ধরা পড়ে গেলাম।” সিংহ জোরে হেসে উঠল।
সামান্য সময় সকলেই চুপচাপ। অল্পক্ষণের বিরাম যেন। তারপর রাজকুমার কিকিরাকে বললেন, “রায়বাবু, আপনার মুখে বাকিটা শুনতে চাই।”
কিকিরা ঘাড় দোলালেন। বললেন, “বলব বলেই আপনাদের সকলকে ডেকেছি রাজাবাবু। কিন্তু কোন্টা আগে বলব, কোন্টা পরে, তাই ভাবছি। আমার মনে হয়, যেমন-যেমন ঘটেছে তেমন করে বলাই ভাল। তাই নয়?”।
তারাপদ বলল, “আপনার যেমন করে বললে সুবিধে হয়, তেমন করেই বলুন, স্যার।”
কিকিরা বললেন, “তা হলে ম্যাজিশিয়ান ফুলকুমারের ভুতুড়ে হারমোনিয়াম বাজানো দিয়েই শুরু করা যাক। মুখে সব বলার চেয়ে একটু বরং হাতে কলমে দেখাই। আমার এই ছোট্ট ঠাসা ঘরে আপনাদের সব তো দেখাতে পারব না। আমার কাছে ম্যাজিক দেখানোর জিনিসপত্রও নেই। তবু একটা জিনিস দেখাই। খানিকটা আন্দাজ করতে পারবেন।” বলে কিকিরা উঠে দাঁড়ালেন। ঘরের চারদিক দেখলেন। বললেন, “আমার বাড়িতে হারমোনিয়াম নেই। থাকার মধ্যে রয়েছে ওই পুরনো আমলের গ্রামোফোন আর রেকর্ড। আপনারা আমার হাত বেঁধে দিন, চোখ বেঁধে দিন। আমি আমার শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে গ্রামোফোনের কাছে যাব। রেকর্ড বার করব। বাজাব। আপনারা আমায় দেখতে পাবেন না। শুধু একটা কাজ করবেন। হাত-পা বাড়াবেন না। আর দেশলাই জ্বালাবেন না। আসুন, কে আমার হাত বাঁধবেন? ববিসাহেব, আপনি আসুন।” বল্লে কিকিরা একপাশ থেকে হাত বাঁধা দড়ি, আর চোখ বাঁধা কালো রুমাল বার করে দিলেন।
ববি উঠে গিয়ে কিকিরার হাত বাঁধল। শোবার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে কিকিরা বললেন, “এবার আমার চোখ বাঁধুন। ভাল করে বাঁধবেন। আমার চোখ বাঁধা হয়ে গেলে, আপনি নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়বেন। চন্দন, তোমার ঠিক হাতের কাছে আলোর সুইচ আছে। তুমি আলো নিভিয়ে দেবে। তার আগে জানলার পরদাগুলো টেনে দাও। আলো যেন না আসে।”
