কমল কিকিরার চোখের দিকে তাকাল। “খেলনার দোকানে খেলনা বিক্রি হত!”
“তা তো হবেই,” কিকিরা ঠাট্টার গলায় বললেন, “পানের দোকানে কি মশাই পোনামাছ বিক্রি হয়? আমি সে কথা বলছি না। আমি বলছি, ওখানে আর কী হত?”
মাথা নাড়ল কমল, “আমি জানি না।” বলে চোখ নামিয়ে নিল।
কিকিরা হঠাৎ রুক্ষ গলায় বললেন, “আপনি জানেন। মিথ্যে কথা বলবেন না, বোকা সাজার চেষ্টা করবেন না, স্যার। আপনি ভাল করেই জানেন দোকানে কী হত? আর যদি না জানেন, আমি আপনাকে বলছি, ফুলকুমারের খেলনার দোকানে চোরাই-সোনা, চোরাই-পাথর, আরও পাঁচরকম জিনিস বিক্রি হত। খেলনার দোকানটা ছিল বাইরের ভে। আসলে ওই দোকান থেকে চোরাই-মালের কারবার হত।”
কমল তার শুকনো ঠোঁট জিভের আগা দিয়ে ভেজাতে লাগল। কথা বলছিল না।
কিকিরা বললেন, “আপনি এখন ধোয়া তুলসীপাতা সাজতে চাইছেন? ওতে লাভ হবে না। ফুলকুমারের দালালি করে, তার বিশ্বস্ত লোক হয়ে আপনি মোটামুটি ভাল পয়সা কামাতেন।”
“বাজে কথা, সমস্ত বাজে কথা,” কমল চিৎকার করে উঠল, “কে আপনাকে এ-সব কথা বলেছে? আপনি নিয়ে আসুন তাকে। টেনে জিভ ছিঁড়ে দেব রাস্কেলের।”
কিকিরা যেন কমলের রাগ দেখছিলেন। কমুহূর্ত পরে বললেন, “যে বলেছে তার কাছ থেকে আপনি দু’দফায় পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছেন। শুধু টাকাই নেননি, তাকে বলেছিলেন, মোতিয়ার সঙ্গে আপনি কথা বলে ব্যবস্থা করবেন। হাজার চার-পাঁচ টাকা মোতিয়াকেও দিতে হবে। না না, মাথা নাড়বেন না। চেঁচাবেন না। আমার কাছে প্রমাণ আছে।” বলে কিকিরা জামার পকেটে হাত ঢোকালেন। মামুলি খাম বার করলেন পকেট থেকে, তার মধ্যে থেকে একটুকরো ভাঁজ করা কাগজ। কাগজটার ভাঁজ খুললেন। বললেন, “এই কাগজটার মাথার ওপর আপনার হোটেলের নাম-ঠিকানা লেখা আছে। মেমো স্লিপ। আপনি কী লিখেছেন, পড়ে শোনাচ্ছি। আপনি লিখেছেন, “কেমন করে কী করতে হবে, আমি জানিয়ে দেব। পালোয়ানকে কিছু দিতে হবে। চার-পাঁচ লাগবে। ঝামেলার কাজ।”
কমল যেন লাফ মেরে এগিয়ে আসত, চন্দনের ভয়ে পারল না।
এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল।
কমল উঠল না। বসে থাকল।
কিকিরা চন্দনকে ইশারা করলেন। চন্দন এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলল।
বিজয় মুস্তাফি। ছিমছাম চেহারা। পরনে প্যান্ট শার্ট। দু’পায়ে সমান ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
চন্দন অবাক।
বিজয়কে দেখে কমল দাঁড়িয়ে পড়ল। কিছু বলতে যাচ্ছিল। বিজয় হাত তুলে কমলকে থামতে বলল। “তোমার সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। অনেকক্ষণ এসেছি। ওয়েট করতে পারলাম না আর। সরি।”
কিকিরাও অবাক হয়ে বিজয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
বিজয় যেন ঠোঁট টিপে হাসল। বলল, “অরাক হবার কোনো দরকার নেই। কমলের কাছে আমি আসি মাঝে-মাঝে। চোরে-চোরে মাসতুতো ভাই। তবে কী কিকিরাসাহেব, আমি বিহার পুলিশের লোক। রতন সিংহ। আজ ক’মাস ধরে ফাঁদ পেতে বসে ছিলাম, ফুলকুমার অ্যান্ড পার্টিকে ধরার জন্যে। কমলবাবু আমার ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। জাল প্রায় গুটিয়ে নিচ্ছিলাম, এমন সময় ফুলকুমার খুন হল। আমার ইল মুশকিল। ঘাটের কাছে ভেড়া নৌকো আবার জলে ভাসাতে হল। শেষ পর্যন্ত বাকি কাজটা আপনারাই সারলেন মনে হচ্ছে!”
কিকিরা কোনো কথা বললেন না। বিজয় মুস্তাফিকে দেখছিলেন।
বিজয় মুস্তাফি, মানে রতন সিংহ কিকিরাকে বললেন, “ঘাবড়াবেন না। তেওয়ারিসাহেব আমাকে আপনার চিঠির কথা জানিয়েছেন। নিন, হাত মেলান।”
কিকিরা উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন।
কমল দরজার দিকে তাকাল। চন্দন পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে।
.
হারমোনিয়াম–রহস্য
কিক্রির ঘরে আর যেন জায়গা কুলোচ্ছিল না। রাজকুমার, বিজয় মুস্তাফি মানে রতন সিংহ, ববি, তারাপদ, চন্দন আর কিকিরা। রতন সিংহ আর ববিকে অতিথি হিসেবে ডেকে আনা হয়েছে। সিংহ হয়ত এমনিতেই আসত; তবু কিকিরা তাকে ডেকে এনেছেন। সন্ধে হয়ে গেছে কখন। বড় বাতিটাই জ্বালিয়ে রেখেছেন কিকিরা। বগলা চা-জলখাবার দিয়ে গিয়েছিল। চা খেতে-খেতে সাধারণ কিছু কথাবার্তা হচ্ছিল। রাজকুমার চা খেলেন না, শরবত খেলেন। খাবারে হাত দিলেন না। মানুষটি নিয়ম মেনে চলেন। বাইরে কিছু খান না।
কিকিরাই শেষে সিংহকে বললেন, “সিনাসাহেব, আপনিই আজ শুরু করুন। শুনি।”
বিহার পুলিশের সিনাসাহেব সিগারেট ধরিয়ে বলল, “আমার বলার কথা কম রায়সাহেব। ঘটনাটা ঘটেছিল, ছ’সাত মাস আগে। মধুপুর স্টেশনের ওয়েটিংরুমে এক ভদ্রলোক হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। তাঁর কোনো সঙ্গী ছিল না। জিনিসপত্রও ছিল সামান্য। ওঁর অ্যাড্রেস খুঁজতে গিয়ে আমরা ভদ্রলোকের জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করি। জিনিসপত্রের মধ্যে একটা পুতুল ছিল। আধ-হাত মতন লম্বা, একটা জাপানি ড। ওই পুতুলটা নাড়াচাড়া করার সময় হঠাৎ পায়ের জুতোটা ভেঙে গেল। খুলে গেলও বলতে পারেন। আর অবাক কথা, পুতুলের ভেতর থেকে দু’টুকরো হীরে, তা ধরুন, পাঁচ-সাত রতি করে তো হবেই, আমাদের হাতে পড়ে। ব্যাপারটা অদ্ভুত! আমাদের এক কর্তা জহুরিকে দিয়ে হীরে দুটো পরখ করিয়ে বললেন, ওর দাম কম করেও হাজার পঞ্চাশ-ষাটের মতন। এই হীরে কোথা থেকে এল, কেমন করে এল, কেনই বা পুতুলের মধ্যে করে আনা হচ্ছিল, এ-সব নিয়ে মাথা ঘামাতে বসে আমরা একটাই মাত্র হদিস পেলাম। পুতুলটা কলকাতার নিউমার্কেট থেকে কেনা হয়েছে। না, কোনো রসিদ ছিল না। বাক্স ছিল পেস্টবোর্ডের। তার একপাশে দোকানের স্ট্যাম্প মারা ছিল। ফুলকুমারের দোকানের।”
