বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না, সত্যি-সত্যি সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল কমল। বিরক্ত। কিকিরার সামনে এসে বলল, “আপনাকে আমি যে বলে পাঠালাম, আমার দেরি হবে আজ।”
কিকিরা হাসিমুখেই বললেন, “তোক না দেরি। আমরা থাকব।”
“থাকবেন? বাঃ! আমি বলছি দেরি হবে, তবু বলছেন থাকব।”
“কথা আছে।”
“আপনাদের সঙ্গে আমার কোনো কথা নেই। ফুলকুমারের ব্যাপার আমি কিছু জানি না।”
“ফুলকুমার! কই, আমরা তো ফুলকুমারের ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে আসিনি!”
কমল থতমত খেয়ে গেল। মনে হল, নিজের বোকামির জন্যে আফসোস করছে। অবাক চোখে কিকিরাদের দেখছিল। কী বলবে যেন বুঝতে পারছিল না। শেষে বলল, “তা হলে কেন এসেছেন? কোন্ কথা বলতে?”
কিকিরা হাসিমুখেই বললেন, “আপনার কাজকর্ম শেষ হোক। তখন বলা যাবে।”
কমল চটে গেল, “আমার কাজকর্ম শেষ হবে না। আপনারা যান। আমি কোনো কথা আপনাদের সঙ্গে বলব না।”
কিকিরা মুখ টিপে হাসলেন। ইশারায় চন্দনকে দেখালেন। বললেন, “আমাকে না বললেন। ওঁকে তো বলতে হবে। উনি কিন্তু বাইরে চন্দন, ভেতরে জ্বালাতন; আসলে লালবাজার…!”
লালবাজার শুনে কমল কেমন চমকে গেল। দেখল চন্দনকে। চন্দনের শরীর স্বাস্থ্য চেহারা দেখে লালবাজারের লোক মনে হওয়া অসম্ভব নয়। সাদা পোশাকের গোয়েন্দা-অফিসার নাকি? কমলের মুখের চেহারা পালটে যাচ্ছিল।
কমলের যেন গলা শুকিয়ে গেল। বারদুয়েক ঢোক গিলল। “লালবাজার! লালবাজারের সঙ্গে আমার…!” কথাটা আর শেষ করতে পারল না।
কিকিরা সাহস দেবার মতন করে বললেন, “না, না, আপনার সঙ্গে কিছু নেই। শুধু কয়েকটা কথা। ওঁর সামনে হলেই ভাল। “
কমল একবার বাইরের দরজার দিকে তাকাল। ভাবছিল। শেষে বলল, “আসুন। “
কিকিরা আর চন্দন উঠে দাঁড়াল।
কমলের সঙ্গে দোতলায় এলেন কিকিরা। চন্দনের সঙ্গে ইশারায় যেন তাঁর কথা হয়ে গিয়েছে। চন্দন গম্ভীর মুখ করে লালবাজার হবার চেষ্টা করছিল।
নিজের ঘরের কাছে এসে কমল বলল, “একটু দাঁড়ান। বলে আসি। অফিসে বসে কথা বলা অসুবিধে। অন্য জায়গায় বসব।”
কিকিরা মাথা হেলালেন।
কমল তার অফিসে ঢুকল। বেরিয়ে এল। তারপর কিকিরাদের নিয়ে দোতলার অন্য পাশে চলে গেল। শেষের দিকের একটা ঘরে এনে বলল, “এটা আমাদের রেস্টরুম। বসুন।”
ছোট ঘর। একটা সোফাকাম-বেড, গোটা-দুয়েক চেয়ার, নিচু এক টেবিল রয়েছে ঘরে। লম্বাটে জানলা। আলোপাখা আছে। কমল নিজেই পাখা চালিয়ে দিল।
কিকিরা বসলেন। চন্দন দু’পা এগিয়ে গিয়ে জানলার পাশে দাঁড়াল। জানলা খোলা। ঝুঁকে পড়ে বাইরেটা দেখল। রাস্তা ঘেঁষে এই ঘর। নিচের সবই দেখা যাচ্ছে।
কমল বলল, “বলুন, কী কথা?”
কিকিরা বললেন, “আপনি বসুন। আমরা কোনো বদ মতলব নিয়ে আসিনি। কয়েকটা কথা আপনার কাছে জানতে এসেছি। আপনার দুশ্চিন্তার কারণ নেই।”
কমল বসল। সে যে রীতিমতন ঘাবড়ে গিয়েছে, বোঝাই যাচ্ছিল। চোখ-মুখ শুকনো, কপালে গলায় ঘাম জমেছে।
চন্দন জানলার কাছে দাঁড়িয়ে কিকিরাদের দিকে তাকিয়ে থাকল।
কিকিরা চন্দনকে বললেন, “আমার কথাগুলো জেনে নিই।”
ঘাড় হেলিয়ে চন্দন বলল, “নিন।”
কিকিরা কমলের দিকে সহজভাবেই তাকিয়ে বললেন, “আপনি স্যার, রাজকুমারবাবুদের ফ্যামিলি-ফ্রেন্ড?”
“না,” কমল মাথা নাড়ল। “রাজাদা’র ছোট ভাই ফুলকুমার আমার ছেলেবেলার বন্ধু। সেই হিসেবে ওবাড়ির সকলকে আমি চিনি। আমাকে সবাই চেনেন।”
“আপনি ফুলকুমারের ম্যাজিকের দলে আগে ছিলেন না?”
“দলে আমি কোনো দিনই ছিলাম না। ফুল যখন ম্যাজিক দেখাবার জন্যে মেতে উঠল, আমাকে তার দলের দেখাশোনা করতে বলেছিল। সেটা অর্ডিনারি ব্যাপার। শৌখিন ম্যাজিক শো। পরে আর আমি ওর সঙ্গে ছিলাম না।”
“ফুলকুমার কীভাবে মারা গিয়েছে, সবই আপনি শুনেছেন?”
“হ্যাঁ। আমি ভাবতেও পারিনি এ-ভাবে ও মারা যাবে!”
“একটা কথা স্যার! ফুলকুমারকে নিয়ে কথা বলতে আসিনি আমরা। আগেই আপনাকে বলেছি। কথাটা উঠল বলে বলছি। আচ্ছা, আপনার কী মনে হয়? কে আপনার বন্ধুকে খুন করতে পারে?”
কমল পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছল। “আমি জানি না।”
“ফুলকুমার আপনার বন্ধু ছিল। ও কি কোনো দিন কারও সম্পর্কে কিছু বলেছে?”
কমল কয়েক পলক তাকিয়ে থাকল। মাথা নাড়ল, “না।”
“আপনার কাউকে সন্দেহ হয়?”
“সন্দেহ! না, মানে সন্দেহ করার মতন কেউ নেই। তবে আজকাল ওর বন্ধুবান্ধবদের ভাল মনে হত না।”
“দু’একটা নাম বলতে পারেন?”
“নাম বলে লাভ কী! ববি বলে ওর এক বন্ধুকে আমার ভাল লাগত না।”
“ববি! আচ্ছা, রাজকুমারবাবু সম্পর্কে আপনার কী মনে হয়?”
কমল কয়েক পলক তাকিয়ে থাকল। “রাজাদা! রাজাদা অত্যন্ত ভালমানুষ। ছোট ভাইকে তিনি খুবই ভালবাসতেন। রাজাদার সঙ্গে আমি দেখাও করেছি। “
“মোহনবাবু? মানে, মোহনকুমার?”
কমলকে যেন কেউ আচমকা ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে থাকল কমল। “মোহনদাদা?”
“হ্যাঁ; মোহনভাই। ফুলকুমারের মেজদা।”
“আপনি কী বলছেন, আমি ভাল বুঝতে পারছি না। মোহনদাদা মাটির মানুষ। নিরীহ। তাঁর একটা হাত..”
“জানি। একটা হাত কাটা,” কিকিরা বললেন, “ভাল লোকও কখনোকখনো মন্দ হয়ে যায়। দশচক্রে ভগবানও ভূত হয়, জানেন তো?”
কমল কোনো কথা বলল না। ঠোঁট কামড়ে বসে থাকল।
কিকিরা বললেন, “ফুলকুমারের খেলনার দোকান সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন?”
