অফিস-ঘরের দরজা ঠেলতেই খুলে গেল।
কিকিরা কমলকে আন্দাজ করে নিতে পারলেন। ছবি দেখা আছে কমলের।
এগিয়ে গেলেন কিকিরা। কমল বসেবসে সিগারেট খাচ্ছিল। হাতে কাজ নেই। তার টেবিলের পাশে খাতাপত্র, বিল বুক, কলম-পেনসিল পড়ে আছে। এক কাপ চা। একটা ভাঁজ করা খবরের কাগজ।
কিকিরা হাসি-হাসি মুখ করে বললেন, “কমল ব্যানার্জি?”
কমল দেখছিল কিকিরাকে। “আমি। আপনি?”
“কিকিরা। রাজকুমারবাবুর বন্ধু” বলে দু পা পেছনে দাঁড়ানো চন্দনকে দেখাল, “চন্দন।”
কমলের মুখ দেখে মনে হল, ও যেন কিকিরার কথা আগে শোনেনি। বলল, “কী ব্যাপার বলুন?”
“আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে। একটু সময় লাগবে।”
“সময়। কিন্তু এখন…এখন আমার সময় কোথায়?”
“ঘণ্টাখানেক,” কিকিরা বিনয়ের মুখ করে বললেন।
কমলের হাত কয়েক তফাতে অবাঙালি মাঝবয়েসী এক ভদ্রলোক কাজ করছিলেন। বেয়ারা আসা-যাওয়া করছিল।
কমল বলল, “স্যরি। দু’পাঁচ মিনিট কথা বলা যায়, এক ঘণ্টা গল্প করা অসম্ভব?” বলে হাত দিয়ে কাগজপত্র দেখাল, “এত কাজ।”
কিকিরা বললেন, “তা হলে ছুটির পর?”
“ছুটির পর?” কমল অবাক হয়ে বলল, “আমার ছুটি হতে-হতে আট সোয়া-আট বাজবে। ততক্ষণ…”
“আমরা অপেক্ষা করব।”
“অপেক্ষা করবেন?”
“তাতে আর কী! বাইরে রিসেপশানের ওখানে বসে থাকব! এখন কটা বাজে? সাড়ে ছয়। ঘণ্টা দেড়েক বসে থাকা যাবে তুমি কী বলল, চন্দন?”
চন্দন মাথা নাড়ল, “নো প্রবলেম।”
কমল প্রথমটায় যেন বুঝতে পারেনি, বা, খেয়া করেনি। পরে তার খেয়াল হল। বলল, “রিসেপশানে বসে থাকবেন? এতক্ষণ!”
কিকিরা রগুড়ে হাসি হেসে বললেন, “নট মাছ স্যার। ওনলি ওয়ান অ্যান্ড হাফ আওয়ার্স। রেশনে লাইন দিলে দু ঘণ্টা দাঁড়াতে হয়, ঝাঁঝাঁ রোদে। আর এখানে তো আরামেই বসে থাকব, কী বলল চন্দন?”
চন্দন মাথা হেলিয়ে সায় দিল।
কমলকে খুশি মনে হল না, বাধ্য হয়েই বলল, “বেশ, বসুন।”
কিকিরা চলে যাচ্ছিলেন, কমলই আবার বলল, “আমার সঙ্গে আপনাদের এমন কী কথা মশাই, দেড় ঘন্টা বসে থাকবেন?”
“জরুরি কথা। শুনলেই বুঝতে পারবেন।”
“রাজাদা আপনাদের পাঠিয়েছেন?”
“আপনি কাজ সেরে নিন; আমরা আছি। পরে কথা হবে।”
কিকিরা আর দাঁড়ালেন না। চলে এলেন চন্দনকে নিয়ে।
নিচে রিসেপশানের জায়গায় ভিড় প্রায় নেই। সোফাসেট পাতা ছিল। দেওয়ালে দু একটা ছবি ঝুলছে।
কিকিরা একপাশে বসলেন। সামান্য আড়াল থাকে যেন। চন্দনকে বললেন, “একটা ম্যাগাজিন টেনে নাও তো।”
চন্দন গোটা দুয়েক ম্যাগাজিন তুলে আনল।
“ছোকরাকে কি নার্ভাস দেখলে?” কিকিরা বললেন।
“নার্ভাস? না, নার্ভাস নয়, তবে…”
“তবে আমাদের দেড় ঘণ্টা বসে থাকায় ও খুশি হল না।”
“কেন বলুন তো?”
“দেখা যাক্, কেন? একটা সিগারেট দাও। আর শোনো, তুমি একবার বাইরে গিয়ে তারাপদকে বলে এসো, আমরা না বেরোনো পর্যন্ত ও যেন হোটেলের কাছাকাছি থাকে। দরকার হলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে। পালিয়ে না যায়।”
চন্দন সিগারেটের প্যাকেট দেশলাই কিকিরার হাতে তুলে দিয়ে বাইরে চলে গেল।
কিকিরা সিগারেট ধরালেন। ম্যাগাজিন তুলে নিলেন। হোটেলে যারা আসছে-যাচ্ছে তাদের লক্ষ করতে লাগলেন।
চন্দন ফিরছিল না। দেওয়াল-ঘড়িতে পৌনে সাত হল। বোধহয় তারাপদর সঙ্গে কথা বলছে চন্দন। কিকিরা ব্যস্ত হলেন না, অধৈর্য হলেন না।
লোকজন দেখতে দেখতে কিকিরার মনে হল, এখানে যারা আসে, তারা বেশির ভাগই অবাঙালি। হোটেলের খদ্দেররা মাঝারিআনার। ব্যবসাপত্রের কাজে যারা কলকাতায় আসে, সেই ধরনের লোকই বেশি। বেড়াতে এসে হোটেলে উঠেছে বউ বাচ্চা নিয়ে, এমন লোক চোখে পড়ে না বললেই হয়।
চন্দন ফিরে এল। এসে ঠাট্টার গলায় বলল, “তারা একটা পজিশন পেয়ে গৈছে। ইলেকট্রনিকস্ মালপত্র বিক্রির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বলছে, দেড়-দু’ ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হলে পা ধরে যাবে।”
“যাক। পায়চারি করুক। লয়টারিং।”
আরও খানিকটা সময় কাটল। সোয়া সাত।
কিকিরা আর চন্দন কথা বলছেন, নেপালি চেহারার এক বেয়ারা এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে তাঁদের সামনে এসে দাঁড়াল। কিকিরাকে দেখল। বলল, “কমলবাবুসে মোলাকাত করনে কৌন্ আয়া? আপ?”
হ্যাঁ।
“দেরি হোগা সাব! ন’ বাজ যায়গা।”
“ঠিক হ্যায়। আগার দশ ভি হো তো বাত নেহি..”
বেয়ারাটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যেন দাঁড়িয়ে থাকল ক মুহূর্ত; তারপর চলে গেল।
চন্দন বলল, “কী ব্যাপার কিকিরা? কমল আমাদের তাড়াতে চাইছে যেন।”
“ঠিক ধরেছ। হঠাতে চাইছে।”
“কেন?”
“কেন? হয় ও আমার সঙ্গে কথা বলতে রাজি নয়, না-হয় এই হোটেল থেকে বেরিয়ে ও কোথাও যাবে।”
“কিংবা কেউ আসবে। আসার কথা আছে।”
“রাইট স্যার।” কিকিরা সিঁড়ির দিকে তাকালেন, “আমরা বাপু উঠছি না। সে যত রাতই হোক।”
চন্দন বলল, “আমি একটা চেষ্টা করব?”
“কী চেষ্টা করবে?”
“বাইরে গিয়ে ফলস্ ফোন করব। এই হোটেলের দু’একটা বাড়ির পর একটা ড্রাগ স্টোর আছে। ওখান থেকে হোটেলে কমলকে ফোন করতে পারি।”
কিকিরা ভাবলেন। কথাটা তাঁর পছন্দ হচ্ছিল, “কী ফোন করবে?”
“কী ফোন! ধরুন, ধরুন মুস্তাফি হয়ে ফোন করলাম। বললাম, কথা আছে। কিংবা বললাম, কমলের কখন ছুটি হচ্ছে? বা আপনি যদি অন্য কিছু সাজেস্ট করেন।”
কিকিরা চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, “না থাক আর খানিকক্ষণ দেখা যাক। আমার মনে হচ্ছে, কমল নিজেই আসবে। ওর ইচ্ছে নয়, আমরা হোটেলে থাকি। আমাদের হোটেলে থাকায় ও ভয় পাচ্ছে। বসে থাকো, দ্যাখো, কী হয়।”
