কিকিরা মাথা নাড়লেন। কফি খেতে লাগলেন চুপচাপ।
তারাপদ বলল, “ফুলকুমার যে একটা বাজে দলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল, আমরাও তা সন্দেহ করি। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই দলের কাউকে ধরতে পারছি না।”
ববি ঘাড় কাঁপাল। যেন বলল, সে আপনারা বুঝে নিন।
কিকিরা কফি শেষ করলেন। বললেন, “টাইগারকে চেনেন, স্যার?”
“ভাল করেই চিনি।”
“কেমন লোক?”
“পয়সা পেলে সবই করতে পারে।”
“খুন?”
“ওটা বোধহয় পারে না। চুরি, গুণ্ডামি, সিনেমার টিকিট ব্ল্যাক, পকেটমার, ছিনতাইয়ে তার হাত আছে। খুনের ব্যাপারে এগোবে বলে মনে হয় না। আর যদিবা এগোয়, বে-পাড়ায় খুন করতে যাবে না। টাইগার সেই ধরনের ক্রিমিন্যাল নয়।”
কিকিরা যেন হতাশ হয়ে বললেন, “না, কিছুই ধরা যাচ্ছে না।…আচ্ছা ববিসাহেব, একটা কথা বলুন, ফুলকুমার নোংরা ব্যাপারে সুত গলিয়েছে দেখেও আপনি ওর বন্ধু থাকলেন কেমন করে?”
ববি মুচকি হাসল, “কেন বলুন তো? আপনি সঙ্গদোষের ভয় পাচ্ছেন!..যাক্, এবার আমায় ছাড়ন। আমি দিদিকে নিয়ে সিনেমায় যাব। তৈরি হতে হবে। দরকার পড়লে পরে আসবেন। আড্ডা মারতে আমার আপত্তি নেই।” বলে ববি হাত তুলে বিদায় জানাল।
কিকিরা যেন বাধ্য হয়ে উঠে পড়লেন।
.
কমলের হোটেল
দুতিনটে দিন কিকিরাকে বাড়িতে পাওয়াই মুশকিল হয়ে পড়ল। তারাপদরা আসে যায়, অপেক্ষা করে, কিকিরাকে ধরাই যায় না। বগলা কিছু বলতে পারে না। শুধু বলে, “আপনাদের বসতে বলে গেছেন।“
তিন দিনের দিন কিকিরাকে ধরা গেল। চন্দন বলল, “আপনার ব্যাপার কী স্যার? আমরা তো ভাবলাম, আপনি নিজেই গায়েব হয়ে গেছেন।”
কিকিরা বললেন, “আমার দোষ নেই। রোজই বলে যাই তোমাদের বসিয়ে রাখতে, ফিরে এসে দেখি, তোমরা নেই। না, না, দোষ তোমাদেরও নয়। আমি সময় মতন ফিরতে পারি না। আটকে যাই।”
“যাক গে, আসল কথা বলুন! প্রগ্রেস্ কতদূর?” তারাপদ বলল।
“মোটামুটি।…আমার এখন সন্দেহ হচ্ছে, তারাপদ; শেষ রক্ষা করা যাবে না।“
চন্দন ঠাট্টা করে বলল, “তা হলে আর বেগার কেন খেটে মরছেন। ছেড়ে দিন। ফর নাথিং …”
চন্দনকে কথা শেষ করতে দিলেন না কিকিরা। বললেন, “আর একটু দেখি। কাল একটা লাস্ট চান্স নেব!”
“লাস্ট চান্স?”
“কাল আমরা কমলের সঙ্গে দেখা করব। তার হোটেলে। বাড়িতে নয়।”
তারাপদ দু মুহূর্ত তাকিয়ে থাকল। “হোটেলে?”
“বাড়িতে যাব না। হোটেলেই যাব।…তুমি একটু খোঁজ করে জেনে নাও তার ডিউটি কখন?”
“দুপুরেই হবে।”
বিকেলেও হতে পারে। খোঁজ করে নাও,” বলে কিকিরা পিঠ এলিয়ে বসলেন, “ভাল কথা, যশিডি থেকে চিঠির জবাব পেয়েছি। তেওয়ারি লিখেছে, মুস্তাফি বলে কোনো লোকের বাগান যশিডিতে নেই। বিজয় মুস্তাফি বলে কোনো লোকও থাকে না। তবে মধুপুরের এক মুন্তাফি নাশারির ব্যবসা করে।”
চন্দন কিকিরাকে দেখছিল। বলল, “আপনি অ হলে ঠিকই ধরেছেন, কিকিরা। বিজয় মুস্তাফি একটা ব্লাফ!”.
কিকিরা একটু হেসে বললেন, “লোকটা ভাল অভিনেতা। তা ছাড়া কী জানো, ও যে-ধরনের খোঁড়া তেমন খোঁড়া হওয়া সহজ। আমার মনে হয়, ও যদি পন্ট পরে, ওইরকম এক পেয়ে ল্যাংচা হয়ে থাকে, চট করে ধরাও যাবে না।”
চন্দন বলল, “ওর মতলবটা কী বলুন তো?”
“সেটাই বুঝতে পারছি না। তবে লোকটা নিজেকে ধরিয়ে দিয়েছে। ফুলকুমারের ব্যাপারটার সঙ্গে সে জড়িয়ে আছে, বোঝা যাচ্ছে। কীভাবে আছে সেটা ধরতে হবে।”
চন্দন ঘড়ি দেখল। আটটা বাজে। তার কাজ আছে। বলল, “আমরা আজ উঠি, কিকিরা। রাত আটটা। কাল দেখা হবে। আপনি কখন যাবেন জানলে সুবিধে হত।”
“তারাপদ খোঁজ না করা পর্যন্ত বলতে পারছি না। তা ও তোমায় জানিয়ে দেবে। একটা কথা বলে নিই। কমলের হোটেলে আমি আর তুমি দুজনে যাব। তারাপদকে বাইরে বসিয়ে রাখব।”
“কেন, আপনি কি মনে করছেন.”
“আমি কিছুই মনে করিনি। কমল যে মুস্তাফির কাছ থেকে আমাদের খবর শুনবে, সেটাও আমি ধরে নিচ্ছি। তবু তারাপদকে হোটেলের বাইরে রাখব।”
“যা ভাল বোঝেন। উঠি…”।
তারাপদ আর চন্দন উঠে পড়ল।
.
একপশলা ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল শেষ বিকেলে। বাতাসে তখনও বাদলা ভাব, আকাশে মেঘও রয়েছে। ট্যাক্সি থেকে নেমে বোঝা গেল, আজ গুমোট বা গরম থাকবে না, বরং আরামই লাগবে।
কিকিরা ভাড়া মিটিয়ে দিলেন ট্যাক্সির। সন্ধে হয়ে আসার মতন দেখাচ্ছে। ঘড়িতে মাত্র সোয়া ছয়। কিকিরা বললেন, “তারাপদ, তুমি হোটেলের বাইরে কোথায় থাকবে?”
“আপনি বলুন।”
“রেস্টুরেন্ট?” চার দিকে তাকালেন কিকিরা। রেস্টুরেন্ট দেখতে পেলেন না। সোডা ফাউনটেন গোছের একটা কী আছে দেখা গেল। কিকিরা বললেন, “আপাতত ওখানে থাকবে। একটু নজর রাখবে। অবশ্য নজর রাখবে কার ওপর? তুমি আমি ক’জনকে বা চিনি? তবু নজর রেখো।”
কিকিরা চন্দনকে নিয়ে হোটেলের দিকে পা বাড়ালেন।
হোটেলটা বাইরে থেকে দেখতে বাহারি নয়। ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায়। বাহারি না হোক, এই হোটেলের প্রাচীনত্ব রয়েছে, হয়ত সেই জন্যেই খানিকটা আভিজাত্য। রঙচঙে ঝকঝকে ভাবের চেয়ে পরিচ্ছন্নতাই নজরে আসে। ঘোট রিসেপশান। দুজনে বসে কাজকর্ম করছিল। পাশে ফোন।
চন্দন এগিয়ে গিয়ে কমলের খোঁজ করল।
কমল বসে দোতলায়। সিঁড়ির মুখে বাঁ দিকের ঘরে।
কিকিরা আর চন্দন সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায় এলেন। একটা ঘর দেখতে পেল চন্দন বাঁ দিকে। “অফিস লেখা রয়েছে। এপাশে দোতলার অন্য ঘরগুলো থাকা-খাওয়ার জন্যে নয় বলে মনে হল। বোধহয় হোটেলের স্টোর, কিচেন, ম্যানেজারের ঘরটর হবে। তিরিশ-পঞ্চাশ পা তফাতে ঢাকা বারান্দা চোখে পড়ছিল। টেবিল-চেয়ার পাতা। হোটেলের রেস্টুরেন্ট হতে পারে।
