“তা ঠিক,” কিকিরা মুখ ফেরালেন, “যা বলছিলাম, ফুলকুমারকে আমি দেখিনি। চিনি না। রাজকুমারকে চিনি। পুরনো চেনাজানা লোক। তিনি আমার কাছে এসে কান্নাকাটি করছেন। শুধু সেই জন্যে…!”
কিকিরাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে ববি বলল, “আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন? আপনি কি ভাবছেন, এই খুনের মধ্যে আমার হাত আছে?”
মস্ত জিভ বার করে কিকিরা ছি ছি করে উঠলেন। বললেন, “না, না, এ আপনি কী বলছেন, স্যার! আমি আপনার কাছে জানতে এসেছি, সাহায্য নিতে এসেছি।”
“আপনি এসেছেন সাহায্য নিতে!..কই, ফুলকুমারের দাদা তো আসেননি?”
কিকিরা চুপ করে থাকলেন। পরে বললেন, “আসা উচিত ছিল, স্যার। আপনার সঙ্গে আলাপ আছে রাজকুমারবাবুর?”
“না।”
“হয়ত সেজন্যে আসেনি। আপনার কথাও রাজকুমার আমাকে বলেনি।”
“আমার কথা কে বলেছে আপনাদের? কমল? মুস্তাফি?”
তারাপদ একদৃষ্টে ববির দিকে তাকিয়ে ছিল। ববি যেন সবই জানে।
কিকিরা বললেন, “ঠিকই ধরেছেন।”
ববির মুখ রুক্ষ রূঢ় হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে কিছু বলল অস্ফুটভাবে। শোনা গেল না। শেষে ববি বলল, “চোরে-চোরে মাসতুতো ভাই!…যাক গে, আপনি আমার কাছে কী ধরনের সাহায্য চান?”
একটা ছেলে কফি নিয়ে এল ট্রে করে। কিকিরা চিনতে পারলেন। এর আগে এই ছেলেটির কাছ থেকেই ববির খবর নিয়ে গেছেন।
ছেলেটি চলে গেল।
ববি ডাকল কিকিরাকে, “নিন, কফি খান।”
ফিরে এসে নিজের জায়গায় বসলেন কিকিরা। বললেন, “আপনার কী মনে হয়? হঠাৎ ফুলকুমারকে খুন করার দরকার হল কেন? খুন করার কারণ?”
ববি সরাসরি জবাব দিল না। বলল, “আমার কথা পরে। আপনার ধারণা কী?”
“আমি…আমি কিছুই বুঝতে পারছি না,” কিকিরা বললেন, “ফুলকুমারকে খুন করার পেছনে কার স্বার্থ? কী জন্যে তাকে খুন করা হল এখনো কোন হদিস করতে পারিনি। তবে বুঝতে পারছি, ভেবেচিন্তে ছক করে সাজিয়ে তাকে খুন করা হয়েছে। যাকে বলে প্ল্যান করে।”
ববি বেঁকা করে হেসে বলল, “এই প্ল্যানের মধ্যে আমাকে আপনি জড়াতে চান? দেখুন মশাই, আমি যদি খুন করতে চাইতাম, ফুলকুমারকে তুলে নিয়ে যেতাম লরি করে, খুন করে জি. টি. রোডে, জঙ্গল ঝোপঝাড়ে ফেলে দিতাম। প্ল্যান আমার মাথায় আসত না। তার ধার ধারতাম না। আমি লেখাপড়া কম শিখেছি। আমার বুদ্ধিসুদ্ধি কম। আপনাদের প্ল্যান আমার আসে না। তবে আমি খুনখারাপির মধ্যে থাকি না। কখনো ছিলাম না। আমি খুনি হলে আমার দিদিকে দেখতেন গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে। দিদি ছাড়া আমার কেউ নেই। আর দিদি বেঁচে থাকতে কোনো নোংরা কাজ আমি করব না, এটা ফুলকুমারও জানত।”
কিকিরা কফিতে চুমুক দিলেন। দেখছিলেন ববিকে। ছোকরা সাফসুফ কথা বলে। মেজাজি।
“আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, ফুলকুমার আপনার বন্ধু হলেও তার ওপর আপনার রাগ ছিল!”
“যদি সত্যি কথা শুনতে চান, রাগ ছিল।…কেউ যদি বন্ধু হয় তার ওপর রাগ করা যাবে না, এমন কথা আছে?”
“তা ঠিক। তবে রাগের কারণ তো থাকবে! আপনার রাগ ছিল কেন?”
“তাও বলতে হবে?”
“বললে উপকার হয়।”
“ফুলকুমার ম্যাজিক-ট্যাজিক কী করত আমি জানি না। আমি ওর ম্যাজিক দেখিনি। দোকানে বসে কখনো কখনো তাসের খেলা দেখাত। দেখেছি। কিন্তু আমি জানতাম, ফুলকুমার তার খেলনার দোকানে বসে চোরাই স্মাগলড মালপত্র বিক্রি করে।”
তারাপদ এতক্ষণ কোনো কথা বলেনি, হঠাৎ বলল, “চোরাই সোনা?”
ববি তারাপদর দিকে তাকাল। “শুধু সোনা নয়, আরও অনেক কিছু।”
“তার খরিদ্দার কারা ছিল?”
“খরিদ্দাররা সোজাসুজি বোধহয় আসত না। স্মাগলাররাই তাদের পাঠাত। ফুলকুমার ছিল, কী বলব, সাপ্লায়ার। এজেন্ট। মানে, যারা বেচাকেনা চালাত, তারা ফুলকুমারের হাত দিয়ে কারবার করত। ভাল কমিশন পেত ফুলকুমার।”
কিকিরা কফি খাচ্ছিলেন। খেতে-খেতে বললেন, “আপনি নিজের চোখে এরকম কাউকে দেখেছেন?”
“আমার চোখের সামনে আট-দশ হাজার টাকা রতির চুনি, হীরে বিক্রি হবে এটা কি আপনি আশা করেন? আপনি কি মনে করেন, যারা চোরাই মাল বিক্রি করে, তারা ইঞ্চি-ছয়েক লম্বা ইটালিয়ান রিভলবার আমার নাকের ডগায় বিক্রি করবে?”
তারাপদ যেন চমকে ওঠার মতন শব্দ করল। কিকিরাও চুপ।
ববি বলল, “আপনি ভাববেন না, ফুলকুমার আমার কাছে তার লুকনো কারবারের কথা বলত। আমি জানতাম। একবার ফুলকুমার আমাকে বলেছিল, ছোট এক পেটি চকোলেট ধানবাদে পৌঁছে দিতে। বলেছিল, পার্টি হাজার চারেক টাকাও দেবে। আমি রাজি হইনি। বুঝতেই পারছেন, পেটিটা চকোলেটের নয়।..মাল-মশলার। মানে…” ববি আঙুলের ইশারায় গুলিবন্দুক বোঝাল।
কিকিরা একদৃষ্টে ববির দিকে তাকিয়ে থাকলেন কয়েক পলক, তারপর বললেন, “আপনি জানলেন কেমন করে?”
ববি এবার মুচকি হাসল। বলল, “আপনি গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছেন, অথচ সহজ নিয়মগুলো জানেন না। কোনো চোরাই কারবার একা-একা করা যায় না। তার জন্যে দল থাকা দরকার। চোরাই কারবারটা হল রিলে রেসের মতন। হাতে-হাতে এগোয়।”
কিকিরা বললেন, “আপনি বলতে চাইছেন, ফুলকুমার আপনাকে দলে ভেড়াতে চেয়েছিল। “
“হ্যাঁ। আমার ট্রান্সপোর্টের কারবার। আমার পক্ষে সোনা-দানা, রিভলবার, গুলি-বারুদ কোনোটাই জায়গামতন পৌঁছে দেওয়া অসম্ভব নয়। ধরুন, আমাকে বলা হল, ট্রাক নিয়ে যাবার সময় অমুক জিনিসটা পানাগড়ে অমুক লোকের হাতে ফেলে দিয়ে যেতে। কাজটা কি কঠিন?”
