তারাপদ বারবার সিঁড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। অদ্ভুত বাড়ি, অদ্ভুত সিঁড়ি। কলকাতা শহরে এমন জেলখানার মতন বাড়ি আছে, স্বর্গে চড়ার মতন সিঁড়ি আছে সে জানত না। পাড়াটা যে অনেক পুরনো বোঝা যায়; ঘরবাড়ির বেশির ভাগই বোধহয় শ’খানেক বছরের পুরনো। ছাঁদছিরি থেকে মনে হয়, অনেককাল আগে যেন এখানে সাহেবসুবোদের ব্যবসার মালপত্র রাখার গুদোমখানা ছিল। কে জানে কী ছিল?
কিকিরা মুখ ফিরিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন তারাপদকে, দরজা খুলে গেল।
ববি। কিকিরা সঙ্গে-সঙ্গে বুঝতে পারলেন, ও ববি।
ববি বলল, “ইয়েস? কিয়া বাত?”
কিকিরা বুঝতে পারলেন ববি জানতে চাইছে, কে তোমরা? কী দরকার?
কিকিরা বললেন, “ববি?”
ববি মাথা হেলাল, “ইয়েস।”
কিকিরা পকেট হাতড়ে একটা কার্ড বার করে এগিয়ে দিলেন।
কার্ড নিয়ে ঘরের আলোয় লেখাগুলো পড়ল ববি। তারপর খানিকটা অবাক হয়ে দেখল কিকিরাকে, “ম্যাজিশিয়ান?”
“কিকিরা,” মাথা ঘাড় ঝুঁকিয়ে কিকিরা হাসি-হাসি মুখ করলেন।“ইন্ডিয়ান; নট জাপানিজ।”
ববি হেসে ফেলল, “আসুন।” স্পষ্ট বাংলায় বলল ববি।
কিকিরা আর তারাপদ ভেতরে এলেন। দরজা বন্ধ করে দিল ববি।
ঘরের অবস্থা দেখে তারাপদ হকচকিয়ে যাচ্ছিল। দশ-বিশ হাতের ঘর, কিন্তু জিনিসপত্রে ঠাসা। সোফাসেট, টেবিল, আলমারি, স্টিরিও। একপাশে মাঝারি এক কাচের বাক্সে রঙিন মাছ, অ্যাকোয়ারিয়াম। টিমটিমে আলো জ্বলছে বাক্সের মধ্যে। তারই পাশে নিচে গোটা দুই বড় বড় পেস্টবোর্ডের প্যাকিং বাক্স।
ববি এগিয়ে গিয়ে স্টিরিও বন্ধ করে দিল। ঘরের ডান পাশে দরজা। ভেতর দিকের জানলা দিয়ে করিডোর দেখা যাচ্ছিল। রান্নাবান্নার গন্ধ আসছিল ভেতর থেকে। ববি বোধহয় একা থাকে না।
কিকিরা ববিকে দেখছিলেন। মাথায় বেঁটে। নাক আর চোয়াল খানিকটা বসা; বিশেষ করে নাক, নয়ত ববিকে দেখতে খারাপ নয়। চোখ সামান্য কটা। মাথার চুল কোঁকড়ানো, ব্যাকব্রাশ করা। গায়ের রঙ ফরসা। ববির পরনে সাদা শার্ট-প্যান্ট। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি।
কিকিরা বললেন, “আমি দু’দিন এসে ঘুরে গিয়েছি।”
“আপনি এসেছিলেন? দিদি বলছিল, কে একজন এসে..”
“দিদি? আমার সঙ্গে আপনার দিদির দেখা হয়নি। একটা ছোকরা…।”
“আমাদের বাড়িতে কাজ করে। দিদিকে আপনার কথা বলেছে। …বসুন। দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
কিকিরা আর তারাপদ বসলেন। তারাপদ দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিল। ববি সম্পর্কে যা শুনেছে, কিছুই যে মিলছে না!
“আপনি কলকাতায় ছিলেন না?” কিকিরা জিজ্ঞেস করলেন।
“না। আমার ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা। মাঝে-মাঝে লরির সঙ্গে বাইরে যাই। বাইরে কাজ থাকে। নিজে না দেখলে ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা চলে না।”
“আপনার শুনেছিলাম বাস-মিনিবাসও…।”
“না। আমাদের দুটো লরি আছে। আমি আর আমার একজন বন্ধু মিলে ব্যবসা করি। “
তারাপদ কী ভেবে আচমকা বলল, “আপনি কলকাতার লোক “
ববি হেসে উঠল, “তিন জেনারেশান। আমার বাবা ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাইয়ের অফিসার ছিলেন। ঠাকুরদা পোর্টে কাজ করতেন।”
কিকিরা হেসে বললেন, “ববি নাম শুনে অন্যরকম মনে হয়েছিল।”
“নামটা বাবা দিয়েছিলেন। বাবা হকি-প্লেয়ার ছিলেন। বাবা ভেবেছিলেন, আমি ববি বিশ্বাসের মতন ভাল হকি-প্লেয়ার হব। ববি বিশ্বাসের খেলা আমি ছেলেবেলায় দেখেছি। ভাল খেলত। এখন মনে নেই।”
“আপনি বক্সার?”
ববি হাসল। ঝকঝকে হাসি, “ছিলাম।”
কিকিরা ববির ভাবভঙ্গি লক্ষ করছিলেন। ছেলেমানুষি রয়েছে।
ববি নিজেই হঠাৎ বলল, “আমার বাড়িতে ম্যাজিশিয়ান কেন?” বলে হাসল।
কিকিরা একটু চুপ করে থেকে বললেন, “ম্যাজিশিয়ানদের সম্পর্কে আপনার ধারণা ভাল নয়, স্যার?”
ববি টেবিল থেকে প্যাকেট তুলে নিল সিগারেটের, “না না, ভালই লাগে। ফুলকুমার আমার বন্ধু ছিল। নাম শুনেছেন?” বলে বাঁকা চোখেই যেন তাকাল।
কিকিরা বুঝতে পারলেন, ববিকে বোকা বানানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। বললেন, “শুনেছি। আগে শুনিনি। এখন শুনছি।”
“আপনারা বোধহয় সেজন্যে এসেছেন?” ববি সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিল কিকিরার দিকে।
কিকিরা ববিকে লক্ষ করলেন। লুকোচুরি করে লাভ হবে না।
সিগারেট নিতে-নিতে কিকিরা বললেন, “আপনি বুঝলেন কেমন করে?”
ববি লাইটার এগিয়ে দিল। চোখে হাসি। বলল, “বোঝা যায়।”
কিকিরা সামান্য চুপ করে থেকে বললেন, “আমি রাজকুমারবাবু, মানে ফুলকুমারের দাদার পরিচিত। ছোট ভাই খুন হয়ে যাবার পর তাঁর মনের অবস্থা ভাল নয়। রাজকুমারবাবু এই খুনের রহস্যটা জানতে চান। কেন ফুলকুমার খুন হল? কে তাকে খুন করল?”
ববি নিজের সিগারেট ধরাল। ভেতর দিকের জানলার কাছে গিয়ে হাঁক মেরে কিছু বলল। ফিরে এল। “আপনি ম্যাজিশিয়ান, না ডিটেকটিভ?” ঠাট্টা করেই বলল ববি।
কিকিরা জোরে হেসে উঠলেন। “আমি ম্যাজিশিয়ান! এখন আর ম্যাজিক দেখাই না। পারি না। আর মাঝে-মাঝে শখের গোয়েন্দাগিরি করি স্যার। করতে হয়,” বলে কিকিরা উঠে দাঁড়ালেন। দু-চার পা এগিয়ে অ্যাকোয়ারিয়ামের কাছে গেলেন। রঙিন মাছ দেখতে দেখতে বললেন, “বিউটিফুল! ওই মাছটা সোনার গয়নার মতন দেখতে। কী সুন্দর রঙ! ওই জাতের আর কটা আছে? দুই, তিন…।”
ববি বলল, “দু জোড়া। ওকে বলে গোল্ডেন নাইফস”
“নাইফ? ছুরি?”
“পাতলা ছুরির মতন দেখতে। এ-সমস্ত নাম বাজারের লোকেরা দেয়। আসল নাম কেউ জানে না।”
