সামনের ছোট টেবিলে বাসী চায়ের কাপ পড়ে আছে লক্ষ করেছেন তিনি। মাথা নাড়লেন কিকিরা, “না, থাক।…আচ্ছা, ওই টাইগারটিকে কোথায় পাব?”
বিজয় ভাল করে নজর করল কিকিরাকে। বলল, “এদিকেই পাবেন। ওর বাড়ি কোথায় আমি জানি না। সন্ধেবেলায় ওকে এই এলাকায় দেখা যায়। এলিট সিনেমা, মিনাভা সিনেমা, মার্কেটের এ-পাশে ও-পাশে ঘুরে বেড়ায়। ওর দু’চারজন চেলা থাকে সঙ্গে।” ১১৪
“কেমন দেখতে?” চন্দন জিজ্ঞেস করল।
“লম্বা, কালো। মুখে দাগ। দাঁত উঁচু। দুলে-দুলে হাঁটে।”
“ফুলকুমারের সঙ্গে ওর ভাব কত দিনের?”
“বলতে পারব না।”
“কেন আসত ফুলকুমারের কাছে, জানেন কিছু?”
“না।”
কিকিরার যেন আর কিছু জানার নেই। উঠে পড়ার ভাব করে বললেন, “আজ আমরা চলি। পরে আপনার সঙ্গে দেখা করব, মুস্তাফিবাবু। চলো, চন্দন।” বলে উঠে পড়লেন কিকিরা। “ভাল কথা, একটু জল খাওয়াতে পারেন?”
“জল? দিচ্ছি।” বিজয় মুস্তাফি উঠে দাঁড়াল। ক্রাচ নিল। জল গড়িয়ে দেবার জন্যে জানলার দিকে যাচ্ছিল।
কিকিরা চোখের ইশারায় চন্দনকে কিছু বললেন। চন্দন বুঝতে পারল। বিজয় মুস্তাফির হাঁটা নজর করতে লাগল তীক্ষ্ণ ভাবে।
জল গড়িয়ে নিল বিজয়। কাচের গ্লাস।
এগিয়ে গেলেন কিকিরা। গ্লাস নিলেন। “আপনার এখানে ফুলকুমার আসত না?”
“না।”
“কোনো দিনই আসেনি?”
“না। দোকানে দেখা হত। আসবার দরকার করেনি।”
জল খেতে গিয়েও কিকিরা মুখের সামনে থেকে গ্লাস সরিয়ে নিলেন। “ববি, টাইগার, এরা এখানে এসেছে?”
“ববি এক-আধবার এসেছে। টাইগার আসেনি।”
“কমল?”
“কমল আসত।”
“শেষ কবে এসেছে?”
“শেষ?” বিজয় কিকিরার চোখের দিকে তাকাল। মনে করবার চেষ্টা করছে যেন। বলল, “দিন-তিনেক আগে।”
তারাপদ কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল।
কিকিরা জল খেলেন। পুরো গ্লাস খেলেন না। আধগ্লাস মতন জল খেয়ে নিজেই জানলার পাশে রাখতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ তাঁর হাত থেকে গ্লাসটা পড়ে গেল মাটিতে। শব্দ হল ভাঙার। ভেঙে চুরমার হল, কাঁচ ছড়িয়ে গেল মাটিতে পায়ের কাছে।
“ইশ!” কিকিরা আফসোসের শব্দ করে বিজয়কে ধরে ফেললেন, “হাত ফসকে পড়ে গেল। সাবধান মুস্তাফিবাবু। পায়ে কাঁচ ফুটবে। এ-দিক দিয়ে আসুন। কাচের টুকরো বাঁচিয়ে।”
বিজয় মুস্তাফিকে সাবধানে কাচের টুকরো থেকে সরিয়ে আনছিলেন কিকিরা। মুস্তাফির বগলে ক্রাচ।
এক টুকরো বিশ্রী কাচের ধারালো ফলার দিকে তাকিয়ে কিকিরা বললেন, “দেখবেন, সামলে।” বলতে বলতে কী যে করলেন কিকিরা, বিজয়ের কাছ পিছলে গেল। হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতে-যেতে নিজেকে সামলে নিল বিজয়। কিকিরা পায়ে করে সেই বিশ্রী কাচের টুকরোটা সরিয়ে দিলেন।
“তারাপদ, কাচের টুকরোগুলোকে সরিয়ে একপাশে রেখে দাও তো,” কিকিরা ব্যস্তভাবে বললেন। তারপর বিজয়ের দিকে তাকালেন, “আপনার একটা ক্ষতি করলাম। স্যরি। “
বিজয় কিছু বলল না।
.
বাইরে এসে কিকিরা কিছু বলার আগেই তারাপদ বলল, “মুস্তাফি মিথ্যে কথা বলেছে, কিকিরা। ও বলল, কমল দিন-তিনেক আগে এসেছিল। ডাহা মিথ্যে কথা। কমল আজই এসেছিল। ওই গলির মুখেই আমি কমলকে দেখেছি।”
কিকিরা কিছু ভাবছিলেন। বললেন, “গলির মুখে দেখেছ বলেই কিছু প্রমাণ হয় না। তবে, তুমি যা বলছ, সেটাই ঠিক মনে হয়। মুস্তাফির ঘরে দুটো চায়ের কাপ পড়ে ছিল। আমাদেরই চোখের সামনে। টেবিলের ওপর। কাপ দুটোর তলায় তলানি চা যতটুকু পড়ে ছিল, তা বাসী নয়। টাটকা চেহারা। মনে হয়, কমল আর মুস্তাফি বসে বসে চা খেয়েছে।”
চন্দন বাহবা দেবার মতন করে বলল, “দারুণ, কিকিরা। ওয়ান্ডারফুল।”
কিকিরা বললেন, “দাঁড়াও, দাঁড়াও, আরও আছে। মুস্তাফি লোকটা খোঁড়াও নয়।”
“খোঁড়া নয়?” তারাপদ অবাক হয়ে বলল।
“না,” মাথা নাড়লেন কিকিরা, “ও লুঙ্গি পরে বসে ছিল দেখেছ তো? খোঁড়া পায়ের দিকে নজর পড়তে আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছিল। শরীরের যে-অঙ্গ কাজ করে না, তার বাইরের চেহারা বড় একটা স্বাভাবিক হবার কথা নয়। মুস্তাফির খোঁড়া পায়ের চেহারা দেখে আমার মনে হল, পায়ের চেহারায় গোলমাল তেমন নজরে আসছে না। ব্যাপারটা জানার জন্যে আমি একটা চাল চালোম। উঠে আসার সময় জল খেতে চাইলাম মুস্তাফির কাছে। মুস্তাফি জল দিতে গেল। চন্দনকে বললাম ওর পায়ের দিকে নজর রাখতে। তারপর তো দেখলে কী করলাম? ইচ্ছে করে ওর পায়ের কাছে কাচের গ্লাস ভাঙলাম। খোঁড়া মানুষকে আগলাবার নাম করে ঠেলে দিলাম কাচের ওপর। ভাঙা কাঁচ থেকে পা সামলাতে গিয়ে মুস্তাফি খোঁড়া পা সোজা করে নিজেকে সামলে নিল। অবশ্য মুহূর্তের জন্যে। আমার চোখ কিন্তু এড়ায়নি। কী চন্দন? আমি রাইট?”
চন্দন বলল, “রাইট। আমিও দেখেছি। আপনি কিকিরা, ফ্যান্টাসটিক্।”
কিকিরা বললেন, “আমায় খোঁজ নিতে হবে, লোকটা কে? কেন ও খোঁড়া সেজে রয়েছে?”
“কেমন করে খোঁজ নেবেন?”
“আমার ব্যবস্থা আছে; মুস্তাফি বললে, যশিডিতে ওর বাগান।…তোমরা বোধহয় সেই কাপালিক ভুজঙ্গের কথা ভুলে যাওনি। তখন তোমাদের বলেছিলাম, যশিড়িতে আমার জানাশোনা পুলিশের লোক আছে। তেওয়ারি। আমি খোঁজ করে নেব।”
.
ববির সঙ্গে
কলিংবেলটা বাজে কী বাজে না কিকিরা বুঝতে পারছিলেন না। এই নিয়ে বার-তিনেক বোতাম টিপলেন কলিংবেলের। কেউ দরজা খুলল না। অথচ ভেতরে লোক আছে। গান বাজছিল। রেকর্ড। জোরেই বাজছিল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সেই বাজনা শুনতে পাচ্ছিলেন কিকিরা। কোনো ইংরেজি গানবাজনা চলছে।
