কিকিরা একবার তারাপদর দিকে তাকালেন। চোখ ফিরিয়ে নিলেন। বিজয়কে দেখতে দেখতে বললেন, “ফুলকুমারকে খুন করা হয়েছে, আপনি জানেন?”
ঘাড় হেলাল বিজয়, “জানি।”
“আপনি ফুলকুমারকে কত দিন ধরে চিনতেন?”
“চার-ছ’ মাস।”
“আপনার এই নার্সারি কত দিনের?”
বিজয় কয়েক পলক কিকিরাকে দেখল। চোখের তলায় যেন হাসি এল। বলল, “দোকান আমার নয় আপনাকে আমি বলেছি। দোকানের মালিক আতাবাবু। আতাবাবু মালিকের ডাকনাম। সবাই তাকে আতাবাবু বলে। মালিক বেহালায় থাকে। তার ভারী এক অসুখ করার পর থেকে রোজ দোকানে আসতে পারে না। ওর লোক আছে দোকান দেখার। আমিও কিছু কিছু দেখি।”
“আপনি দোকানের কর্মচারী নন?”
বিজয় যেন অসন্তুষ্ট হল। বলল, “না। আমি কারও চাকরি করি না। কী নাম আপনার?”
“কিকিরা বলেই ডাকতে পারেন। ওর নাম তারাপদ, আর ওর নাম চন্দন।”
“অদ্ভুত নাম,” বিজয় একটু হাসল। “আপনি কে? কী করেন?”
“আমি রাজকুমারবাবুর বন্ধু। পুরনো বন্ধু।..মাঝে মাঝে চোর গুণ্ডা বদমাশের খোঁজখবর করি,” বলে কিকিরাও মুচকি হাসলেন, “তা বলে পুলিশে কাজ করি না।”
বিজয় কয়েক পলক কিকিরাকে দেখল। তারপর বলল, “ডিটেকটিভ?”
“আধা-ডিটেকটিভ,” কিকিরা হাসলেন, “আমি আপনার কাছে কয়েকটা কথা জানতে এসেছি। যদি আপত্তি না থাকে আমায় বলতে পারেন। না বলতে চাইলে বলবেন না। আমি পুলিশের লোক নই, জোর করে কথা আদায় করতে পারি না। “
চন্দন সিগারেটের প্যাকেট বার করল। বিজয় মুস্তাফি লোকটাকে তার নির্বোধ মনে হচ্ছিল না।
বিজয় বলল, “কী কথা জানতে চান?”
কিকিরা বললেন, “আপনি নাশারির মালিক নন বললেন। আপনি কর্মচারীও নন। তা হলে আপনি কী? মানে…?”
“আমার সঙ্গে আতাবাবুর আসল সম্পর্ক ব্যবসার। আমি দেওঘরের লোক। যশিড়িতে আমার ফল-ফুলের বাগান আছে। আতাবাবুকে আমি ফুলের টুকরি পাঠাতাম রেল-পার্শেলে। মাঝে-মাঝে কলকাতায় আসতাম। ওর অসুখ হবার পর আমাকে কলকাতার দোকানটা দেখতে হয়। ও আমায় দেখতে বলেছে। আমি পনেরো-বিশ দিন কলকাতায় থাকি। আবার যশিড়ি ফিরে যাই। পাঁচ-সাতদিন পর আবার আসি। এটাই আমার ডেরা। “
চন্দন আচমকা জিজ্ঞেস করল, “নিচে গুদোম মতন দেখলাম। ওটা কী?”
“ইউ. পি, গভর্নমেন্টের হ্যান্ডলুমের গোডাউন। তার পাশে বিহার গভর্নমেন্টের কটেজ ইন্ডাসট্রির গোডাউন। এই বাড়িটার নিচে গোডাউন দু তিনটে। একটা ছোট বেকারি আছে।”
চন্দন সিগারেট দিল কিকিরাকে। বিজয়কেও। তারাপদ সিগারেট নিল না।
সিগারেট ধরানো হয়ে গেলে কিকিরা বললেন, “ফুলকুমারের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব ছিল?”
মাথা হেলিয়ে বিজয় বলল, “চেনা-জানা ছিল। ফুলবাবুর দোকানে বসে কথাবার্তা বলতাম, গল্প করতাম।”
“দোকানটা কেমন চলত?”
“সবসময় ভাল চলত না। পরবের আগে ভাল চলত।”
“ফুলকুমারের দোকানে আপনি কাদের আসা-যাওয়া করতে বেশি দেখতেন? কারা এসে আড্ডা মারত? মানে, ওর বন্ধুবান্ধবের কথা বলছি।”
বিজয় মুঠো পাকিয়ে সিগারেট খায়। শব্দ করে টান মারল সিগারেট, বলল, “আসত অনেকে। হরিমাধব, মোতিয়া, কমল, ববি। আর-একজন আসত। তার নাম “টাইগার’। আসল নাম পিন্টু দুবে।”
চন্দন-তারাপদ চোখ চাওয়াচাওয়ি করল।. কিকিরা সিগারেটের ধোঁয়া গিলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। পরে বললেন, “মুস্তাফিবাবু, আপনি একটা কথা আমাদের বলতে পারেন? কিন্তু তার আগে বলুন, ফুলকুমার কেমন ভাবে খুন হয়েছে, কোথায় খুন হয়েছে, আপনি জানেন?”
বিজয় মুস্তাফি ঘাড় হেলিয়ে বলল, “জানি। শুনেছি। স্টল হোল্ডাররা অনেকেই জানে।”
“তা হলে নতুন করে বলার কিছু নেই।…আচ্ছা, বলতে পারেন, পুলিশ এদিকে কোনো খোঁজখবর করেছে কি না?”
“আমি জানি না। শুনেছি, একদিন এক ইনসপেক্টারসাহেব এসেছিল।”
“আপনার কী মনে হয় মুস্তাফিবাবু? ফুলকুমারের কেউ শত্রু ছিল?”
বিজয় ছাদের দিকে চেয়ে বসে থাকল কিছুক্ষণ। পরে মুখ নামিয়ে বলল, “কে কখন শত্রু হয় কেমন করে বলব? আমিও তার শত্রু হতে পারি, বিজয় যেন চাপা হাসি হাসল।
কিকিরা বুঝতে পারছিলেন বিজয় যেন রেখে-ঢেকে কথা বলছে। তেমন করে কান দিলেন না কথায়। বললেন, “আপনি কেন শত্রু হবেন! আমি ওর বন্ধুদের কথা বলছি।”
“বাবু, ফুলকুমারের সঙ্গে আমার ফালতু গল্প হত। আমি কিছু জানি না।”
কিকিরা হঠাৎ কথা ঘুরিয়ে নিলেন, “ববিকে আপনি ফুলকুমারের দোকানে দেখেছেন। কেমন লোক?”
বিজয় একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল কিকিরার চোখে-চোখে। পরে বলল, “আমার ভাল লাগত না।”
“টাইগার?”
“পাক্কা গুণ্ডা। ববি কাজকারবার করে। টাইগার শুধু গুণ্ডা বদমাইশি করে। শয়তান। পুলিশের খাতায় নাম আছে টাইগারের।”
কিকিরা চুপ করে থেকে কিছু ভাবলেন। “ববিকে কোথায় পাওয়া যাবে মুস্তাফিবাবু?”
“ওর বাড়িতে খোঁজ করুন। চাঁদনি বাজারের পিছনে ওর বাড়ি। টেম্পল স্ট্রিট।”
চন্দন হঠাৎ বলল, “আরে, ওই দিকে কোথায় যেন আমি গুমঘর লেন দেখেছি,” বলে তারাপদর দিকে তাকাল। মনে আছে, তোকে সেদিন গুমঘর লেনের কথা বলছিলাম!”
তারাপদ মাথা নাড়ল। তার মনে আছে।
বিজয় জানালার দিকে তাকাল অন্যমনস্ক চোখে।
ববির বাড়ির নম্বরটা জানতে চাইলেন কিকিরা। মুস্তাফি সঠিকভাবে বলতে পারল না।
হঠাৎ বিজয় মুস্তাফির যেন মনে পড়ে গেল কিকিরাদের অন্তত এক কাপ করে চা খাওয়ানো উচিত। বলল, “চা খাবেন?”
