নিউ মার্কেটের গা ধরে আরও খানিকটা হেঁটে গেলেন কিকিরা। হাঁটতে হাঁটতে প্রায় যখন দক্ষিণের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছেন, চোখে পড়ল, একটা নাশরি। নিছক ফুলের দোকান নয়, তবে নাশরি। দোকান অবশ্য বন্ধ। বন্ধ হলেও দোকানের সামনে কয়েকটা টব পড়ে আছে। পাতাবাহারের টব। একটা বেতের বড় ঝুড়ির মধ্যে বাসী ফুল আর পাতার জঞ্জাল। দোকানটার নাম, “কৃষ্ণা নাশারি’।
তারাপদ দাঁড়িয়ে পড়েছিল। বলল, “এই দোকান?”
মাথা হেলালেন কিকিরা। দেখলেন দোকানটা, তারপর এদিক-ওদিক তাকালেন।
চন্দন বলল, “আপনার খোঁড়া লোক কোথায়?”
আশেপাশে কাউকে বিশেষ দেখা যাচ্ছিল না। খানিকটা তফাতে জনা দু-তিন বাজারের মুটে বসে বসে সুখদুঃখের গল্প করছে।
কিকিরা কী যেন ভাবছিলেন। বললেন, “তারাপদ, ওই যে উলটো দিকে একটা দোকান আছে, ওটা কিসের দোকান?”
মার্কেটের উলটো দিকে একটা ছোট দোকান দেখা যাচ্ছিল। বেতের জিনিসপত্র বিক্রি করে বলে মনে হল। বেতের টুকরি, চেয়ার, টেবিল, টুকিটাকি দেখা যাচ্ছিল। তারাপদ বলল, “বেতের জিনিস বিক্রি হয় মনে হচ্ছে। ওটা রাস্তার ওপারে। ভোলা আছে।”
“চলো, একবার খোঁজ করি।”
রাস্তা পেরিয়ে এ-পারে দোকানের কাছে আসতেই লুঙ্গি আর হাফ শার্ট পরা একজনকে দেখা গেল। দোকানে খদ্দের নেই। লোকটা বোধহয় নতুন-আসা কিছু মালপত্র মিলিয়ে নিয়ে দোকান বন্ধ করার অপেক্ষায় ছিল।
কিকিরা কিছু বলার আগেই লোকটা বলল, “এখন আর বিক্রি হবে না।”
কথার ঢঙ থেকে বোঝা গেল, লোকটা দক্ষিণ ভারতীয়।
কিকিরা বললেন, তিনি একজনের খোঁজে এসেছেন। ওই নাশারিতে খোঁড়ামতন একটি লোক থাকে, তার খোঁজে!
ভাঙা-ভাঙা ইংরেজি আর বেখাপ্পা হিন্দি মিশিয়ে লোকটা বলল, “মুফতি? ইউ ওয়ান্ট হিম? উধার যাও,” বলে আঙুল দিয়ে লিন্ডসে স্ট্রিটের দিকে একটা গলি দেখাল। বলল, “টেলারিং শপ! মিন্ জায়গা।”
কিকিরা আর দাঁড়ালেন না। চোখের ইশারায় তারাপদদের পা বাড়াতে বললেন।
দশ-পনেরো পা হেঁটে এসে চন্দন বলল, “লোকটার নাম কি মুফতি?”
“বোধহয়। “
“বাঙালি বলে মনে হচ্ছে না?”
“চলো, দেখা যাক।”
“আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে কিকিরা, ফুলকুমার ম্যাজিকই দেখাক, আর খেলনার দোকান দিক, সে কোনো একটা বাজে দলে ভিড়ে গিয়েছিল। মোতিয়া, ববি, মুফতি…এ যেন এক শয়তানের চক্র!”
কিকিরা ঠোঁট টিপে হাসলেন, বললেন, “এত তাড়াতাড়ি কোনো কিছু ঠিক করে নিও না। তুমি যা বলছ তা হতে পারে। আবার এমনও তো হতে পারে চন্দন, ফুলকুমার স্বভাবে বোকা ছিল। হয়ত সে নিজে কিছু জানত না। চালাকি করে তাকে ফাঁদে ফেলা হয়েছে।“
কিকিরার কথা শেষ হয়নি, হঠাৎ তারাপদ চেঁচিয়ে উঠল, “কমল, কিকিরা, ওই যে কমল। স্কুটারে করে চলে যাচ্ছে।”
তাকালেন কিকিরা। চন্দনও তাকাল।
তারাপদ হাত তুলে আঙুল দিয়ে দূরের কাকে যেন দেখাতে লাগল। স্কুটারে-চড়া লোক অন্তত জনা-তিনেক। “ওই গলি দিয়েই বেরিয়ে এল কমল। ধরব?”
“ধরো।”
তারাপদ পা চালিয়ে ধরতে যাচ্ছিল কমলকে। কিন্তু ধরতে পারল না। লিন্ডসে স্ট্রিট ধরে কমল সোজা চৌরঙ্গির দিকে চলে গেল।
.
বিজয় মুস্তাফি
দরজির দোকান নয়, দরজির দোকানের পাশে খোঁড়া মানুষটিকে পাওয়া গেল। নাম তার মুফতি নয়–মুস্তাফি। বলল, “ওই নাশারির মালিকের বন্ধু আমি। মুস্তাফি। আমার নাম বিজয় মুস্তাফি। ভুল করে আমায় মুফতি বলেছে। মাথায় আসেনি ওর। বুঝতে ভুল হয়েছে।”
কিকিরা খানিকটা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। রাজকুমারের চিঠি পড়ে যে-মানুষটিকে খুঁজতে এসেছিলেন, বিজয় মুস্তাফির সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। বিজয়ের বয়েস বছর চল্লিশ কি বিয়াল্লিশ। শক্ত চেহারা। গায়ের রঙ তামাটে। চোখ দেখলে বোঝা যায়, চতুর। বুদ্ধিমান। সাদা লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে বসেছিল বিজয়। খাটের উপর। লুঙ্গি পরে থাকার দরুন কিকিরা পা দেখতে পাচ্ছিলেন বিজয়ের। খোঁড়া বলতে যেমনটি মনে হয়েছিল তেমন নয়। বাঁ পায়ের নিচের অংশ, হাঁটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত, সোজা করতে পারে না বিজয়। ভর দিতে পারে না মাটিতে। ক্রাচ নিয়ে হাঁটে।
তারাপদ আর চন্দন বিজয় মুস্তাফির ঘরবাড়ি দেখছিল। দেখার মতন যদিও নয়, তবু এই ঘরের এক অন্যরকম চেহারা রয়েছে। মাঝারি ঘরু, গোটাতিনেক জানলা। জানলাগুলোর তলার অর্ধেক খোলা যায় না, ওপরের অংশ খোলা যায়, খোলাই ছিল। খড়খড়িকরা জানলা। দরজা দুটোও বড়। উঁচু। ঘরের দেওয়াল স্যাঁতসেঁতে ধরনের, খাপচা-খাপচা হলদেটে দাগ ধরেছে অনেক জায়গায়। মাথার ওপর থেকে বাতি আর পুরনো পাখা ঝুলছিল। আসবাবপত্র বলতে একটা শোবার খাট, টেবিল, দু’তিনটে নানা ছাঁদের চেয়ার। ঘরের একপাশে এক বড় মিটশেফ। মিটশেফের মাথার ওপর কৌটোবাটা, চায়ের কেটলি, প্ল্যাস্টিকের বাটি। মিটশেফের পাশে কেরোসিন স্টোভ আর প্রেশার কুকার। বোঝাই যায়, বিজয় মুস্তাফির এই ঘরই তার সংসার।
কিকিরা যেন ভেবে নিচ্ছিলেন কেমন করে কথা শুরু করবেন। শেষে বললেন, “আমরা রাজকুমারবাবুর কাছ থেকে আসছি। চেনেন আপনি রাজকুমারকে?”
বিজয় মুস্তাফি ঘাড় নাড়ল। “নাম জানি। ফুলকুমারবাবুর দাদা।”
“ওঁকে দেখেননি?”
“না। ফুলকুমারের দোকানে ওঁকে আমি দেখিনি। উনি আসতেন না।”
“কখনোই আসতেন না?”
“দু চারবার নিশ্চয়ই এসেছেন। ভাইয়ের দোকান। তবে আমি দেখিনি।”
