তারাপদ বলল, “কী থাকতে পারে বলে আপনি মনে করেন?”
মাথা নাড়লেন কিকিরা। “বলতে পারছি না। চোরাই হীরে, জহরত, দামি পাথর। সোনার বিস্কুট বার থেকে শুরু করে নেশার জিনিস, কোকেন, হাসিস সবই থাকতে পারে। আবার অন্য কোনো বহুমূল্য জিনিস থাকতে পারে।”
তারাপদ বলল, “ফুলকুমার কি সেটা জানত?”
“বলতে পারি না।”
“ফুলকুমার কি নিজেই হারমোনিয়াম বাজাচ্ছিল?”
“বাইরে থেকে দেখতে গেলে তার বাজাবার কথা নয়। কেন নয়? কারণ তার হাতে ছিল হ্যান্ডকা; হ্যান্ডকাফের চাবি অন্যের কাছে–মানে কোনো দর্শকের কাছে। তার ওপর ফুলকুমারের চোখ বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।”
চন্দন বলল, “আপনি বলতে চাইছেন, অন্য কেউ তার হয়ে বাজাচ্ছিল?”
কিকিরা এবার ছোট-ছোট চোখ করে হাসিমুখে বারকয়েক নাক চুলকোলেন। পরে বললেন, “চন্দন, তোমরা এতদিন ম্যাজিশিয়ান কিকিরার চেলাগিরি করেও নাথিং নোয়িং হয়ে রইলে। দু’চারটে ম্যাজিকের বই পড়তে বলি, তাও পড়বে না। পড়লে অনেক কিছু জানতে পারতে! কথায় কথায় এত অবাক হতে হত না। যাক গে, সবুর করো। সবুরে মেওয়া ফলে।”
বগলা চা নিয়ে এল।
হাতে-হাতে চা এগিয়ে দিয়ে বগলা কিছু টাকা চাইল কেনাকাটার জন্য।
কিকিরা নিজে উঠলেন না। শোবার ঘরের টেবিলের ওপর খুচরো টাকা কিছু পড়ে আছে। নিয়ে যেতে বললেন বগলাকে।
টাকা এনে চলে যাচ্ছিল বগলা, কিকিরা বললেন, “আধ ঘণ্টার মধ্যে ফিরবে; আমরা ঠিক পাঁচটায় বেরোব।”
চলে গেল বগলা।
চায়ে চুমুক দিয়েছিল তারাপদ। বলল, “কোথায় বেরোবেন?”
“নিউ মার্কেট,” কিকিরা বললেন।
“নিউ মার্কেটে? সেখানে কী?”
“সেখানে একটি খোঁড়া লোকের সন্ধানে। সেই-যে ফাস্ট বুকে পড়েছ, ওয়ান মর্ন আই মেট এ লেম্ ম্যান, এও হল অনেকটা তাই। একজন লেম্ ম্যানকে খুঁজে বার করতে হবে।”
চন্দন একবার ঘড়ির দিকে তাকাল। চারটে কুড়ি। বলল, “আপনার সঙ্গে কি তার দেখা করার কথা?”
“না। আমি তাকে চিনি না। সেও আমাকে চেনে না।”
“তা হলে আর নাই বা গেলেন? আপনি কিকিরা-স্যার, কলকাতার অনেক খবর রাখেন না। শনিবার নিউ মার্কেট আধবেলা। আপনি গিয়ে দেখবেন সব বন্ধ।”
কিকিরা বললেন, “লোকটাকে আমি পাব,” বলে জামার পকেট থেকে চিঠি বার করলেন। “রাজকুমার যে চিঠিটা পাঠিয়েছে, তাতে কী লিখেছে জানো? লিখেছে ফুলকুমারের খেলনার দোকান বা “টয় শপ’-এর আশেপাশে এই লোকটা আজ কদিন ঘুরঘুর করছে। লোকটার চালচলন সন্দেহজনক। সে। কেন ফুলকুমারের বন্ধ খেলনার দোকানের সামনে ঘুরঘুর করছে এটা জানা দরকার।”
“খবরটা রাজকুমারবাবুকে কেউ দিয়েছে, না তিনি নিজে দেখেছেন?”
“পাওয়া খবর। ফুলকুমারের স্টলের পাশে যাদের দোকান আছে, তাদের কেউ দিয়েছে খবরটা। “
চন্দন বলল, “কিন্তু সেই খোঁড়া লোকটাকে এখন আপনি কেমন করে পাবেন? দোকান বন্ধ। মার্কেট বন্ধ।”
“দেখতে ক্ষতি কিসের,” কিকিরা বললেন, “হিন্দু একটা আছে। যদি পাই! আর না যদি পাই–বিকেলের দিকে একটু বেড়ানো তো হবে। তোমরা এমন অলস কেন? ইয়ং ম্যান!”
চন্দন বলল, “অলস নই, স্যার। আমরা দারুণ অ্যাকটিভ কিন্তু আপনার এই ফুলকুমার রহস্যতে মারদাঙ্গা দেখছি না। একবার চা দিন, তারপর দেখুন কী হয়?” চন্দন হাসতে লাগল।
কিকিরাও হেসে ফেললেন। বললেন, “মুখে তো বলছ, কাজের সময় পারবে মারদাঙ্গা করতে?”
“তারা পারবে না, স্যার। আমি পারব।”
.
নিউ মার্কেটের সামনে ঠিক নয়, নিউ এম্পায়ার সিনেমার কাছে আচমকা একটা গণ্ডগোল বেঁধে গিয়েছিল। ছোটখাটো ভিড়। ছোকরামতন একজনের চোখ-মুখের অবস্থা দেখে মনে হল, ছোকরা বেদম মারধোর খেয়েছে। চোখের তলায় কালশিটে, ঠোঁটের পাশে রক্ত, ধুলো লেগে রয়েছে চুলে, শার্টের একটা হাতা ছেঁড়াখোঁড়া।
চন্দন ভিড়ের মধ্যে মুখ বাড়িয়ে খবরটা জেনে এল। এসে বলল, “মোটর বাইক কাকে ধাক্কা মেরেছিল। পাবলিক বেদম মেরেছে লোকটাকে।”
কিকিরা বললেন, “তবু রক্ষে! ওর গায়ে সইতে হল; গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিলে বেচারির অনেকগুলো টাকা যেত।”
ভিড়ের কাছ থেকে সরে এল তারাপদরা।
শনিবারের বিকেল, সিনেমার ভিড় গিজগিজ করছে। উলটো দিকের দোকানগুলো খোেলা। শরবতের দোকানের সামনে বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের ভিড়।
কিকিরা বললেন, “এ-পাশে নয়, লিন্ডসে স্ট্রিটের দিকে চলো।”
নিউ মার্কেট বন্ধ হয়ে গেছে কোন্ দুপুরে। ওদিকের রাস্তাটা সামান্য ফাঁকা। কিকিরা হাঁটতে হাঁটতে বললেন, “গ্লোব সিনেমার উলটো দিকে, মার্কেটের গায়ে একটা ফুলের দোকান আছে। একেবারে শেষের দিকে, মনে হচ্ছে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের দিকে। দোকানটা খুঁজে বার করতে হবে।”
চন্দন বলল, “দোকান না হয় খুঁজে বার করা গেল। কিন্তু লাভ কী? দোকান বন্ধ দেখবেন।”
“চলো দেখি।”
কিকিরা ধীরেসুস্থে হাঁটতে লাগলেন। যেন বেড়াতে এসেছেন। আশেপাশে তাঁর নজর ছিল। সন্ধে হয়ে আসছে প্রায়। জায়গাটা গমগম করছে। গাড়ি রাখার জায়গাগুলো ভরতি। দুটো ছেলে প্ল্যাস্টিকের জল-ভরতি ব্যাগে রঙিন মাছ পুরে নিয়ে খদ্দের ধরার চেষ্টা করছে।
চন্দন আর তারাপদ সিগারেট ধরাল।
চন্দন বলল, “আপনি যে বললেন, খোঁড়া লোকটিকে আপনি চেনেন না। তা হলে ফুলের দোকানে খোঁজ করছেন কেন?”
“রাজকুমার তার চিঠিতে একটা হদিস দিয়েছে। তাই কিকিরা বললেন।
“তাই বলুন।“
