“জি” লালাজি মাথা হেলালেন, “আমি আপনাকে বলেছি বাবুজি।”
কিকিরা অস্বীকার করলেন না। রাজকুমারের দোকানে গিয়েছিলেন তিনি। লালাজির সঙ্গে কথাও বলেছেন। ফুলকুমার কেমনভাবে খেলাটা দেখাত, ভাল করে জেনে নিয়েছেন।
“লালাজি, আপনি কি জানেন, হারমোনিয়ামটা কে তৈরি করেছিল?”
“জি, না।”
“আপনি বলেছেন, হারমোনিয়ামটা সরু আর লম্বা ছিল। মামুলি হারমোনিয়ামের মতন দেখতে ছিল না।”
“আমি ঠিক বলেছি বাবুজি!”
“আচ্ছা লালাজি, ফুলকুমার যখন হারমোনিয়ামের খেলা দেখাত, ও কী। ধরনের পোশাক পরত? মানে, ওর সাজ কী হত?”
“আমি বলেছি আপকো।”
“বলেছেন,” কিকিরা একটু হাসলেন, “আর-একবার বলুন।” লালাজি বললেন, “রায়বাবু, আমি বুড়া আদমি। খেলা-ঊলা আমি দেখি না। ছোটবাবু আমায় জবরদস্তি করলেন। আমি যিস্ দিন খেলা দেখি, উস্ দিন, ফুলকুমার ওস্তাদজির কাপড় পরেছিল। “
“পাজামা আর পাঞ্জাবি?”
“জি। “
“কালো রঙের?”
“তফাতসে ওইসে মালুম হয়।”
“মোতিয়া ছিল?”
“নাম আমার মালুম ছিল না, বাবুজি। মগর, আপ যার কথা বলেছিলেন, উও ছোকরা ছিল।”
কিকিরা সামান্য চুপ করে থাকলেন। পরে বললেন, “লালাজি, আপনি ফুলকুমারকে ছেলের মতন ভালবাসতেন শুনেছি। একটা কথা আমায় বলুন। ফুলকুমারের দুশমন কে ছিল? কাকে আপনার সন্দেহ হয়?”
লালাজি কিকিরার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তাঁর মুখে কষ্ট ও বেদনার ছাপ ফুটে উঠছিল। চোখ নামিয়ে নিয়ে ভাঙা-ভাঙা ভাবে বললেন, “রায়বাবু, আমি রাজাজির সঙ্গে দোকানে থাকি। ফুলবেটা কাদের সাথ দোস্তি করত, আমি জানি না। ত সাচ বাত কী জানেন? আচ্ছা দোস্ত ওর জাদা ছিল না।”
তারাপদ হঠাৎ বলল, “আপনি কমলকে জানেন লালাজি?”
“জি, জানি।”
“কমল কেমন লোক?”
“কমল আচ্ছা ছোকরা। “
“মোতিয়া?”
“আমার মালুম নেহি।”
লালাজি আর বসতে চাইছিলেন না। কাজ আছে তে। উঠে দাঁড়ালেন।
কিকিরা বললেন, “আপনি আসুন। কুমারবাবুকে বলবেন, কাল আমি থাকব। উনি আমাকে বাড়িতে পাবেন।”
লালাজি চলে গেলেন।
কিকিরা সামান্য চুপচাপ থাকলেন। হাই উঠল। বললেন, “বোসো তোমরা, চোখে-মুখে জল দিয়ে আসি। ঘুমিয়ে পড়েছিলুম একটু।”
বাইরে গেলেন কিকিরা।
চন্দন বলল, “তারা, আমি কাল এই ব্যাপারটা নিয়ে রাত্তিরে অনেক ভাবছিলুম। প্রবলেমটা টু-ফোল্ড। মানে, ডবল ব্যাপার। একটা হল, ফুলকুমারকে খুন; আর দু নম্বর হল, হারমোনিয়াম চুরি। একটার সঙ্গে অন্যটার সম্পর্ক আছে বলেই মনে হয়। তবু বলব, মতলব যদি চুরির হত, অনর্থক একটা মানুষকে খুন করতে যাবে কেন? চোর হিসেবে ধরা পড়লে যে শাস্তি, সেটা হল চুরির শাস্তি। বড়জোর ছ’ মাস এক বছরের জেল। খুনি হিসেবে ধরা পড়লে যে ফাঁসির দড়ি, এটা সকলেই জানে। হঠকারিতা করে খুন করে না ফেললে মানুষ সহজে খুন করে না। এমনকী ক্রিমিন্যালরাও ঝট করে খুন পর্যন্ত এগোতে চায় না। তবে যারা পাক্কা খুনি তাদের কথা আলাদা।…আমার এইটেই অবাক লাগছে।”
তারাপদ বলল, “এমন তো হতে পারে, হারমোনিয়াম চুরি করতে হলে ফুলকুমারকে খুন না করে উপায় ছিল না।”
“মনে হয় তাই। কিন্তু একটা ম্যাজিক দেখানো হারমোনিয়াম কি এতই দামি যে তার জন্যে মানুষ খুন করতে হবে?”
“দেখো চাঁদু, আমারও সেটা মনে হয়।…তা ছাড়া আমি বুঝতেই পারি না–হারমোনিয়ামটা বাজত কেমন করে। কিকিরা কিছু বলেন না।”
ঘরে এলেন কিকিরা। চোখ-মুখ ধুয়ে এসেছেন। বললেন, “কী বলছিলে কিকিরাকে নিয়ে?”
“বলছিলাম, আপনি হারমোনিয়াম রহস্যটা আমাদের কাছে ভাঙছেন না…” তারাপদ বলল।
কিকিরা কোনো জবাব দিলেন না। নিজের জায়গাটিতে বসলেন। ঘড়ি দেখলেন দেওয়ালের। বললেন, “চা খাবে তো?”
চন্দন বলল, “সে-চিন্তা বগলাদার। আপনি আমাদের কথা এড়িয়ে যাচ্ছেন।”
কিকিরা হাসি-হাসি মুখ করলেন। মাথার চুল ঘাঁটলেন অভ্যাসবশে। বললেন, “হারমোনিয়ামটা কেমন করে বাজত, এটা জানা তেমন জরুরি নয়, স্যান্ডাল উড়। ম্যাজিক মানে ভেলকি। বুদ্ধির খেলা, হাতের খেলা, কথার খেলা, আর তোমার প্রেজেন্টেশান, এই সব মিলিয়ে ম্যাজিক হারমোনিয়ামটা কেমন করে বাজত, সেটা তোমাদের সামনে দেখিয়ে দিতে পারলে ভাল হত, বেশ তো, একদিন দেখিয়ে দেব। একটা হারমোনিয়াম জোগাড় করে এনো।”
“আপনি জানেন?” তারাপদ বলল।
“না, আমি জানি না।” মাথা নাড়লেন কিকিরা, “ওরকম খেলা আমি কখনো দেখাইনি।”
“তা হলে?”
“তা হলে কিছু নয়,” কিকিরা মজার চোখে হাসলেন। “প্রসেসটা জানি। ছেলেবেলায় তোমরা তো কত অঙ্ক করেছ, জ্যামিতি করেছ। নিয়মটা জানলে যেমন সেই নিয়মের অন্য অঙ্কগুলো করা যায়, এ হল তাই। জিনিস এক। তবে দেখাবার সময় এক-একজন এক-এক কায়দা করে দেখায়। যে যত চমক দিতে পারবে তার কপালে তত হাততালি জুটবে।” বলে কয়েক মুহূর্ত থামলেন কিকিরা। আবার বললেন, “হারমোনিয়ামটা কেমন করে বাজছিল, সেটা আমার কাছে তত বড় কথা নয়। আমার কাছে বড় কথা, ওই হারমোনিয়ামের মধ্যে কী ছিল? কে ফুলকুমারকে খুন করল?”
চন্দন কিকিরার চোখে-চোখে তাকিয়ে থাকল। বলল, “আমরাও তাই বলাবলি করছিলাম। ম্যাজিক-দেখানো হারমোনিয়াম কি এতই মূল্যবান যে, তার জন্যে মানুষ খুন করতে হবে?”
“ঠিকই,” কিকিরা ঘাড় হেলিয়ে সায় দিলেন। “আমার মনে হয় চন্দন, হারমোনিয়ামটা উপলক্ষ। ওর মধ্যে কিছু ছিল। যাই থাক, সেটা মূল্যবান।”
