“তৃতীয় কারণটা কী?”
“মোতিয়ার কাজ ছিল, ভুতুড়ে হারমোনিয়াম বাজার খেলা শুরু হওয়ার সময় ফুলকুমারের চোখ বাঁধা, হ্যান্ড কাফ পরানো। হ্যান্ড কাফের চাবিটা সে দর্শকদের মধ্যে একজনকে দিয়ে দিত। দিয়ে নিজে আবার স্টেজে উঠে আসত। স্টেজে ফুলকুমার আর মোতিয়া ছাড়া তৃতীয় কারও থাকার কথা নয়।” কিকিরা সিগারেটের জন্যে হাত বাড়ালেন। সিগারেট নিয়ে ধরালেন অন্যমনস্কভাবে। ধোঁয়া গিললেন। তারপর বললেন, “চোখ বাঁধা, হ্যান্ড কাফ লাগানো, চাবি দেওয়া হয়ে যাবার পর মোতিয়ার উইংসের পাশে চলে আসার কথা। স্টেজ তারপর অন্ধকার হয়ে যাবে। …আমি শুনলাম, মোতিয়া উইংসের পাশে এসে দাঁড়াবার পর, আচমকা নিজের জায়গা ছেড়ে কোথাও চলে যায়।”
“কোথায় যায়?”
“সেটা জানতে হবে।…মোতিয়াকে আবার দেখা যায় যখন ফুলকুমারকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।”
“হাসপাতালে গিয়েছিল মোতিয়া?”
“হ্যাঁ।”
“তবে তো সে বলতে পারে, স্টেজের কাছাকাছি ছিল সে।”
“বলতে পারে। বলেছে নিশ্চয়ই পুলিশের কাছে। ফুলকুমারের হ্যান্ড কাফের চাবি তার পকেটে থাকার কথা নয়। মোতিয়াই হ্যান্ড কাফ খুলে দিয়েছিল হাসপাতালে নিয়ে যাবার আগে।”
তারাপদ বলল, “তবু আপনি মোতিয়াকে সন্দেহ করছেন?”
“দেখো হে, একটা জটিল অসুখ হলে চন্দনরা চট করে কি কোনো একটা বিশেষ রোগ হয়েছে বলে ঠিক করে নেয়? না, তারা পাঁচটা লক্ষণ মেলায়, দশ রকম পরীক্ষা করে, অপেক্ষা করে দেখে, শেষে রোগটা ধরতে পারে। এখানেও সেই কথা। সন্দেহ অনেককেই হয়। দশরকম দেখে, প্রমাণ পেয়ে তবে না আসল লোককে ধরতে হবে!” কিকিরা সামান্য সময় চুপ করে থাকলেন। সিগারেট খেলেন নিজের মনে, শেষে বললেন, “মোতিয়া হাসপাতালে বেশিক্ষণ ছিল না।”
“কতক্ষণ ছিল?”
“আধ ঘণ্টা চল্লিশ মিনিট।”
“অন্যরা ছিল?”
“দলের চার-পাঁচজন ছিল। রাজকুমার যখন খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যায়, তখনো মোতিয়া ছিল না।”
“আপনাকে এসব কথা কে বলেছে?”
“হরিমাধব।…হরিমাধব ফুলকুমারের দলের ম্যানেজার হয়ে কাজ করছিল ইদানীং। সেদিনের শো-এর বায়না ধরেছিল হরিমাধব। সাড়ে তিন হাজার টাকা শোবাবদ, আর অন্যান্য খরচ বাবদ পাঁচশো টাকা পাবার কথা ছিল তাদের। শোয়ের ব্যবস্থা করেছিল একটা জুট মিলের রিক্রিয়েশান ক্লাব।” মাথা চুলকে চন্দন বলল, “আপনি অনেক খবরই নিয়েছেন তা হলে?”
“নিতে হয়েছে। সবেই শুরু। এখনো কত খবর নিতে হবে,” বলে আঙুল দেখালেন তারাপদর দিকে, “তারাপদ আবার এক ববি’র কথা বলল। কে সে? খোঁজ নিতে হবে। তারপর রয়েছে লালাজি!”
চন্দন বলল, “কিকিরা-স্যার, আর-একটা দিন। পরশু থেকে আমি আপনার সার্ভিসে।”
কিকিরা হেসে ফেললেন।
.
ফুলের দোকানের খোঁড়া মানুষটি
দেখতে দেখতে গরম পড়ে গেল। সপ্তাহখানেক আগেও এমন গরম ছিল না। তখন বিকেলের দিকে এলোমেলো বসন্তের হাওয়া দিয়ে যেত। এখন আর তেমন বাতাস বইছে না, বরং গরমের ঝলকানি দিচ্ছে থেকে-থেকে।
দুপুরের দিকে ঘোরাফেরা করতে কষ্ট হয় কিকিরার। বাধ্য না হলে বাড়ির বাইরে বড় বেরোন না।
ঘুম নয়, আবার পুরোপুরি যে জেগে ছিলেন তাও নয়, তার মধ্যে শুয়ে ছিলেন, এমন সময় তারাপদ আর চন্দনের গলা পেলেন। এই সময়টা ওদের আসার সময় নয়। চোখ খুলে কান পেতে থাকলেন। স্বপ্ন নয়, সত্যি-সত্যি ওরা এসেছে। এসে বাইরের ঘরে বসে হাঁকডাক ছাড়ছে।
বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন কিকিরা।
বাইরের ঘরে পা দিতেই চোখে পড়ল, তারাপদ-চন্দনদের সঙ্গে রয়েছেন লালাজি।
“কী ব্যাপার? তোমরা এই অসময়ে?”
চন্দন বলল, “তারার আজ শনিবার। আর আমার ডিপার্টমেন্ট বন্ধ।”
“বন্ধ! কেন?”
“আপনি স্যার কলকাতায় থাকেন। কলকাতার হাসপাতাল মাঝে-মাঝে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, জানেন না? অবশ্য আমার হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হয়নি। দিন-দুয়েকের জন্যে ডিপার্টমেন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একটা গোলমাল হচ্ছিল।”
কিকিরা লালাজির দিকে তাকালেন।
লালাজি মানুষটিকে দেখলেই মনে হয়, সাদামাটা নিরীহ বয়স্ক মানুষ। তাঁর কপালে চন্দনের ফোঁটা, গলার কাছে একটি মালা, তুলসীর মালার মতন। চোখের তলায় দাগ ধরেছে। মাথার চুল সবই প্রায় সাদা।
কিকিরা বললেন, “লালাজি, আপনি?”
লালাজি বললেন, “আমি আপনার কাছেই আসছি, রায়বাবু। কুছ খবর আছে।” বলে পকেট থেকে একটা খাম বার করে কিকিরার দিকে এগিয়ে দিলেন। “রাজাজি দিয়েছেন।”
চিঠিটা নিলেন কিকিরা। খামের মুখ বন্ধ। তারাপদদের আসার সঙ্গে লালাজির আসার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে একপক্ষে ভালই হয়েছে। লালাজিকে তারাপদরা দেখেনি। দেখার সুযোগ হয়ে গেল।
চন্দন বোধহয় আগেই জল চেয়েছিল। বগলা জলের জগ আর গ্লাস নিয়ে ঘরে এল।
কিকিরার যেন মনে পড়ে গেল কিছু। তারাপদদের সঙ্গে লালাজির পরিচয় করিয়ে দিলেন। রগড় করে বললেন, “লালাজি, এরা দুজনে পাক্কা জাসুস!” বলে হেসে উঠলেন।
বগলা লালাজিকে জল দিতে যাচ্ছিল। লালাজি হাত নেড়ে বারণ করলেন।
কিকিরা চিঠির মুখ খুলে পড়লেন চিঠিটা। বার-দুই। তাঁর মুখ দেখে বোঝা গেল না কিছুই।
লালাজি খানিক অপেক্ষা করে বললেন, “বাবুজি, আমি যাই?”
“যাবেন?..দোকানে যাবেন?”
“দুসরা একটা কাম আছে। এক-আধ ঘণ্টা বাদ যাব।”
“আসুন তবে।”
লালাজি উঠতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ কী মনে করে কিকিরা বললেন, “একটু বসুন লালাজি! পাঁচ-দশ মিনিট,” বলে কিকিরা তারাপদদের দিকে তাকালেন একবার। চোখ ফিরিয়ে লালাজির দিকেই তাকালেন আবার, “আচ্ছা লালাজি, আপনি ফুলকুমারের হারমোনিয়ামের খেল একবারই দেখেছেন?
