তারাপদ চা-খাওয়া শেষ করে কাপটা মাটিতে নামিয়ে রাখল।
সন্ধের মুখে চন্দনদের মেডিক্যাল মেস গমগমে হয়ে উঠেছে। করিডোর দিয়ে লোকজন আসছে যাচ্ছে। চেঁচিয়ে কথা বলছে। হাসাহাসি করছে। নিচে রাস্তায় একটা ব্যান্ড-পার্টি যাচ্ছিল। বাজনার আওয়াজ আসছিল।
কিকিরা চুপচাপ। তারাপদর দিকে তাকাচ্ছেন মাঝে-মাঝে, আবার চোখ ফিরিয়ে ঘরের ছাদ দেখছেন, দেওয়াল দেখছেন। উঠে পড়লেন। ঘরের মধ্যে পায়চারি করলেন বারকয়েক। তারপর বললেন, “আমি কাল থেকে চেষ্টা করেও ওই ছোকরার কোনো হদিস করতে পারলাম না।”
“কোন্ ছোকরা?” চন্দন জিজ্ঞেস করল।
“দ্যাট বডি বিল্ডার।…তুমি তার ছবি দেখোনি। আমরা দেখেছি।…ছোকরার চেহারা দেখে বডি বিল্ডার বলে মনে হয়। তাগড়া, বেঁটে, গোল মুখ, মাথার চুল কোঁকড়ানো। ওকে মাসল-ম্যানও বলা যেতে পারে। আমি অনেক চেষ্টাচরিত্র করে নামটা উদ্ধার করেছি। মোতিয়া।”
“মোতিয়া?” তারাপদ অবাক চোখ করে বলল, “কেমন নাম? বাঙালি নাম বলে মনে হচ্ছে না!”
কিকিরা মাথা নাড়লেন, “সেভাবে বাঙালি নয়। ওরা ভাগলপুরের লোক। মোতিয়ার বাবা কলকাতায় এসেছিল চাকরিবাকরির খোঁজে। কাজ করত গ্যাস কোম্পানিতে। বাবা অনেক কাল আগে মারা গেছে। মোতিয়ার মা ছেলেকে মানুষ করেছে। মা কাজ নিয়েছিল মেয়ে হাসপাতালে। আয়ার কাজ। মাও মারা গিয়েছে বছরখানেক আগে। মোতিয়া এখন গণেশ টকির দিকে একটা গলিতে থাকে। যে বাড়িতে থাকে, সে বাড়িতে নানান রকমের লোক, পঞ্চাশ রকম ব্যবসা। দাঁতের মাজন, কলপের শিশি থেকে ফলের দোকানের খেজুরের প্যাকেট-কী না হচ্ছে, চন্দন। খুপরি-খুপরি ঘর, যে-যার মতন ব্যবসাও করছে, আবার তোলা উনুন-হাঁড়ি-কড়া নিয়ে সংসারও ফেঁদে বসেছে। মোতিয়া ওই বাড়িতে একটা ঘর নিয়ে থাকত।”
চন্দন বলল, “একলা?”
মাথা হেলালেন কিকিরা, “একলাই থাকত। খাওয়াদাওয়া করত হোটেলে, দোকানে।”
তারাপদ কিকিরাকে লক্ষ করছিল। বলল, “আপনি মোতিয়ার খবর পেলেন কেমন করে?”
“খবর পাওয়া কঠিন কিসের? আমি তো তোমায় বলেছিলাম, রাজকুমার না চিনুক আমি চিনে নেব। রাজকুমার কমলের কথা বলেছিল। তোমাকে পাঠালাম কমলের খোঁজ করতে। অন্য ফোটোটা কার সে বলতে পারেনি। আমি ফুলকুমারের দলের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দেখা করলাম। তাদের দুএকজনের নাম-ঠিকানা রাজকুমারই বলে দিয়েছিল জোগাড় করে। বাকিগুলো আমি দেখা করে জোগাড় করে নিলাম। ওরাই বলে দিল মোতিয়ার কথা।”
“ফোটো দেখে?”
“ফোটো দেখাবার দরকার করল না। চেহারা বলতেই বলে দিল।”
চা নিয়ে এসেছিল শাঁটুল। কিকিরাকে সে চেনে কখনো-সখনো চন্দনের মেসে কিকিরা আসেন। দেখে-দেখে চিনে ফেলেছে। চন্দনের মুখে শুনেছে, কিকিরা ম্যাজিশিয়ান। শাঁটুলের ভক্তি বেড়ে গিয়েছে কিকিরার ওপর।
চা এগিয়ে দিয়ে দু’একটা কথা বলল শাঁটুল কিকিরার সঙ্গে। এঁটো কাপ-ডিশ উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল।
চা খেতে খেতে কিকিরা বললেন, “মোতিয়াকে আজ তিন-চার দিন আর তার আস্তানায় পাওয়া যাচ্ছে না।”
“মানে?” তারাপদ বলল, “বেপাত্তা হয়ে গেছে?”
“কী হয়েছে, কেমন করে বলব! সাত তারিখে ফুলকুমার খুন হয়েছে। আট-ন’ তারিখ পর্যন্ত সে ছিল। থানা থেকে ফুলকুমারের দলের লোকজনের, সেদিন যারা ছিল, সকলকেই জেরা করা হয়েছিল। মোতিয়াকেও।”
“মোতিয়া সেদিন তা হলে ছিল?” চন্দন বলল, “ফুলকুমারের খুনের দিন?”
মাথা হেলিয়ে কিকিরা বললেন, “ছিল। মোতিয়াও একটা খেলা দেখায়।”
তারাপদ আর চন্দন অবাক হয়ে চোখ চাওয়াচাওয়ি করল, “কী খেলা?”
“চেঞ্জ অব কফিন।”
মুখে যেন কথা আসছিল না তারাপদদের। চন্দন ঢোক গিলে বলল, “স্যার, আপনি আমাদের মাথা গোলমাল করে দিচ্ছেন। চেঞ্জ অব কফিনটা কী?”
কিকিরা বললেন, “কফিনের বাক্স তো দেখেছ? ওই রকম একই মাপের, একই রঙের, একই রকম দুটো বাক্সর একটাতে মোতিয়াকে শুইয়ে দেওয়া হত। সেই বাক্সটা থাকত স্টেজের মাঝখানে। আর-একটা কফিন বাক্স এনে রাখা হত পাশে, সেটা থাকত ফাঁকা। দুটো বাক্স, এরপর একটার ওপর অন্যটা চাপিয়ে দেওয়া হত। কিছুক্ষণ একটা কাপড় ঢেকে দেওয়া থাকত বাক্স দুটোর ওপর। তারপর কাপড় সরিয়ে কফিন খুললে দেখা যেত, মোতিয়া ছিল এক কফিনে, বেরিয়ে এল অন্য কফিন থেকে।”
চন্দন একবার তারাপদর দিকে তাকাল। তারপর গাল চুলকে বলল, “এরকম খেলা হয় নাকি কিকিরা-স্যার?”
“কেন হবে না? অনেক হয়। এক-একজন এক-একভাবে দেখায়। নিজের সুবিধেমতন করে নিয়েছে। কেউ বড় ডাইস বক্সের নকশা করে দেখায়, কেউ আবার বাস্কেট করে দেখায়।”
তারাপদ বলল, “এই খেলা সেদিন মোতিয়া দেখিয়েছে?”
“হ্যাঁ।” কিকিরা বললেন, “ইন্টারভ্যালের আগে এই খেলাটা হয়ে যায়।”
“তা হলে তো মোতিয়া…”
তারাপদকে কথা শেষ করতে না দিয়ে কিকিরা বললেন, “তা হলে মোতিয়া গেল কোথায়? বা মোতিয়া হঠাৎ গা-ঢাকাই বা দেবে কেন?
“থানা থেকে কি ওদের ওপর চোখ রাখছিল না?
“হয়ত রাখছিল, জানি না। এমনও হতে পারে, আমি যেমন মোতিয়াকে খুঁজছি পুলিশও হয়ত নজর রেখে তাকে খুঁজছে।”
চন্দন ঘরের মধ্যে বার-দুই পায়চারি করে নিল। সিগারেট ধরাল। বলল, “আপনি মোতিয়াকে সন্দেহ করছেন?”
কিকিরা ঘাড় নেড়ে বললেন, “মোতিয়াকে সন্দেহ করার কতকগুলো কারণ থেকে যাচ্ছে। প্রথম কারণ, তার চেহারার মধ্যে একটা রা ভাব আছে। দেখলেই মনে হয়, খুন-জখম করতে পারে। দ্বিতীয় কারণ, কাউকে কিছু না বলে তার বেপাত্তা হওয়া। আর তৃতীয় কারণ..” কিকিরা কথা শেষ না করে থেমে গেলেন। তাঁর চোখের তলায় যেন কেমন রহস্য।
