“কপাল খারাপ, চন্দন নিজের কপাল দেখাল, “আমি যে কী রকম হাঁ করে তোদের জন্যে বসে ছিলাম। কোনো খবর পাচ্ছি না। কিকিরাকে একটা টেলিফোন নিতে বল।”
“বল না তুই!”
“যাক গে, আমায় বল তো, ডেভালাপমেন্ট কতদূর?”
তারাপদ গত দু’তিন দিনের ঘটনা শোনাতে লাগল চন্দনকে। রাজকুমারের কথা, কিকিরার নকশা-করা স্টেজের কথা, সেদিনের সমস্ত কথাবার্তা একে একে বলে যেতে লাগল।
শাঁটুল খাবার এনেছিল। চা টোস্ট পুডিং দিল তারাপদকে। চন্দন বসল এক বাটি মুড়ি বাদাম নিয়ে।
চন্দন বলল, “কিকিরা কাল তোর সঙ্গে ছিলেন?”
“না। আমি একলাই কমলের খোঁজ করতে গিয়েছিলাম।”
“দেখা পেলি?”
“পেলাম। তিন জায়গায় ঘুরে দেখা পেলাম। আমায় পাত্তা দিতে চায়নি প্রথমটা। সন্দেহ করছিল। পরে রাজকুমারবাবুর কথা বলতে খানিকটা কান দিল।”
“কী বলল কমল?”
“বলল, ফুলকুমারের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব থাকলেও, সে অনেক দিন হল দল ছেড়ে দিয়েছে। এখন সময় হয় না। হোটেলের চাকরি।”
“হোটেলের চাকরি? কী চাকরি?”
“বিল ক্লার্ক।“
“কোন হোটেল?”
“স্টার হোটেল। মাঝারি হোটেল,” তারাপদ পুডিং খেতে খেতে বলল, “চন্দনদের মেডিক্যাল মেসে পুডিংটা চমৎকার করে।
“কীরকম দেখলি কমলকে?” চন্দন জিজ্ঞেস করল।
“খারাপ লাগল না। ফুলকুমারের দাদা রাজকুমারবাবু সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন কমলকে। আমারও মনে হল, কমল সিল্প টাইপের।”
তারাপদর কথা ফুরোবার মুখেই কিকিরা এসে ঘরে ঢুকলেন। দেখলেন চন্দনকে, তারপর বললেন, “আগে আমায় জল খাওয়াও।” উনি পাচ্ছিলেন।
ঘরের একপাশে ছোট কুঁজোয় জল ছিল। চন্দন উঠে গিয়ে জল গড়িয়ে আনল। “দৌড়চ্ছিলেন নাকি? এমন হাঁপাচ্ছেন?”
কিকিরা কোনো জবাব দিলেন না। আগে জল খেলেন। হাঁফ ছাড়লেন স্বস্তির। বললেন, “কী ফ্যাসাদ! ওই যে বড় রাস্তায় ছানার দোকান আছে, ওখানে একপাল কুকুর খ্যাপার মতন কামড়াকামড়ি করছে। তাড়ানো যাচ্ছে না। রাস্তার লোককেও তেড়ে আসছে। আমি বাপু, কুকুরকে বড় ভয় পাই।”
চন্দন ঠাট্টা করে বলল, “করবেন গোয়েন্দাগিরি, আবার কুকুর দেখলে ভয় পাবেন, আপনি কেমন গোয়েন্দা?”
“কে চায় গোয়েন্দাগিরি করতে!’ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা আমার। যাক গে, তোমার খবর শুনি আগে। হয়েছে কী তোমার?”
চন্দন চশমা-আঁটা চোখ দেখাল। “দেখছেন না, গগলস্ এঁটে বসে আছি। ইনফেকশান হয়েছিল। “
কিকিরা হাত উঠিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি করলেন। “তোমাদের একটু কিছু হলেই গালভরা কথা! ইনফেকশান। সোজা কথাটা কী! চোখ উঠেছিল, না আঞ্জনি বড় হয়ে ফেটে গিয়েছিল!”
চন্দন হাসল, “আইরাইটিস্।” এমন ভাবে গালভরা একটা কথা বলল, যেন কিকিরা একটু ঘাবড়ে যান।
“বোগাফাইটিস্– যত্ত সব! রোজ ওয়াটার দাও; না হয় লোটাস হনি,” কিকিরা মজা করে বললেন। তাকালেন তারাপদর দিকে, “তোমার খবর কী? গিয়েছিলে?”
“গিয়েছিলাম,” তারাপদ বলল, “চাঁদুকে সেই কথাই বলছিলাম। কমল এখন এন্টালিতে থাকে না। থাকে তার জ্যাঠতুতো দিদির কাছে, গুলাম আলি লেনে।”
“কেমন দেখলে?”
“আমার তো মনে হল, এই গোলমালের মধ্যে ও নেই। কমল বলল, ফুলকুমার তার স্কুলের বন্ধু। কলেজে পড়ার সময় দুজনে আলাদা কলেজে পড়লেও আগের মতনই ভাবসাব ছিল। ফুলকুমার কাশী চলে যাবার পর দু’জনে ছাড়াছাড়ি হয়। আবার যখন ফুলকুমার ফিরে এল কাশী থেকে, এসে ম্যাজিক নিয়ে পড়ল, তখন কমলের সঙ্গে পুরনো বন্ধুত্ব আগের মতনই গড়ে উঠল। তবে কমল তখন চাকরিবাকরি শুরু করেছে, বন্ধুর সঙ্গে রোজ তার দেখা-সাক্ষাৎ হত না।”
“ফুলকুমারের ম্যাজিকের দলে কমল ছিল,” কিকিরা বললেন।
“আমি জিজ্ঞেস করেছি।” কমল বলল, “গোড়ার দিকে দু-এক বছর সে ফুলকুমারের দলের সঙ্গে ছিল। ছিল মানে, কমল একরকম ম্যানেজারি করত ফুলকুমারের ম্যাজিক-পার্টির। যারা ওর ম্যাজিকের অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল, খেলা দেখানোয় সাহায্য করত, কমল তাদের মধ্যে ছিল না।”
কিকিরা ইশারায় আসতে বললেন তারাপদকে। চোখ বুজে কিছু ভাবলেন। বললেন, “ফুলকুমারদের যে গ্রুপ-ফোটো দেখেছি, তাতে কমল ছিল?”
“আমার মনে পড়ছে না।”
“আচ্ছা! তারপর?”
তারাপদ বলল, “আজ প্রায় দেড় বছর কমল আর ফুলকুমারের ম্যাজিক-পার্টির দেখাশোনা করে না। সে ম্যানেজারি ছেড়ে দিয়েছে। সময় হয় না। তবে ফুলকুমারের সঙ্গে দেখাশোনা, আসা-যাওয়া তার ছিল। মাঝে-মাঝে গল্পগুজব করতে যেত নিউ মার্কেটের দোকানে।”
“ফুলকুমারের খুন সম্পর্কে কিছু বলল?”
“বলল, খবর শুনে সে রাজকুমারবাবুর কাছে ছুটে গিয়েছিল। তার ভীষণ লেগেছে। ছেলেবেলার বন্ধু।“
কিকিরা কিছুক্ষণ তারাপদর মুখের দিকে অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে থাকলেন। চন্দন মুড়ি শেষ করে চা খাচ্ছিল। উঠে গিয়ে বাতি জ্বালাল ঘরের। বাইরে গেল একবার। হাঁক মারল শাঁটুলকে। চা আনতে বলল আবার। ঘরে ফিরে এল।
তারাপদ বলল, “আমার মনে হল, ফুলকুমারের সঙ্গে হালে বোধহয় কমলের বন্ধুত্ব আগের মতন ছিল না। কোনো কারণে বন্ধুর ওপর বিরক্ত হয়েছিল। “
“কারণটা কী?”
“তা বলল না।…শুধু বলল, ফুলকুমার কতকগুলো বাজে লোকের পাল্লায় পড়েছিল। ববি বলে একটা লোকের কথা বলল কমল।”
“কে ববি?”
“ববি নাকি একজন বক্সার। লাইট ওয়েট, ফেদার ওয়েট–কিসের চ্যাম্পিয়ান হয়েছিল এককালে। এখন তার বাস-লরির ব্যবসা।”
