“স্টেজ অন্ধকার থাকে তখন?” কিকিরা জিজ্ঞেস করলেন।
“জি, তাই থাকে। স্টেজ বিলকুল ডার্ক। অডিটোরিয়াম ডার্ক।”
“কুমারবাবু, আমি যদি আপনার দোকানে যাই লালাজিকে পাব?”
“কেন পাবেন না?”
“আমি লালাজির সঙ্গে একটু কথা বলব!” বলে কিকিরা খাম থেকে বাকি ছবিগুলো বার করে দেখতে লাগলেন। বেশির ভাগ ছবিই হল ম্যাজিক শো-এর। ফুলকুমারের নানান সাজ, কোনোটায় রাজপুত্র গোছের এপাশাক, কোনোটায় আরব দেশের সাজপোশাক। জাপানি পোশাকও দেখা গেল। কোনো-কোনো ফোটো গ্রুপ ফোটো; ফুলকুমারের সঙ্গে তার দলের ছেলেমেয়েরা রয়েছে।
কিকিরা ছবিগুলো দেখতে দেখতে বললেন, “দুটো ছবি দেখছি, ফুলকুমারের দলের ছবি নয়, তার সঙ্গীর ছবি। আপনি এদের চেনেন?”
“একজনকে চিনি। অন্য ছোকরাকে চিনি না।”
“যাকে চেনেন তার নাম কী? কোথায় থাকে?”
“লম্বা মুখের ছেলেটা, নাক ঘোড়া বেঁকা, ওর নাম হল কমল। কমল ফুলকুমারের পুরানা দোস্ত। স্কুল ফ্রেন্ড। ও এন্টালি বাজারের কাছে থাকে। ভাল ছেলে, রায়বাবু। কমল হোটেলে কাজ করে। ক্লার্ক।”
“আর অন্যটা?”
“আমি চিনি না। নাম জানি না। কমল জানতে পারে।”
“এটাকে তো বডি বিল্ডারের মতন দেখতে।..যাক গে, আপনি একটা কথা খোলাখুলি বলুন তো কুমারবাবু?” কিকিরা বললেন, “ফুলকুমারকে খুন করার কী কারণ থাকতে পারে?”
রাজকুমার কিকিরার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। মনে হল, তাঁর বলার কিছু নেই। মুখে ঘাম জমছিল তাঁর। বললেন, “আমি জানি না, রায়বাবু। ফুলকুমারের কোনো বদ দোষ ছিল না। তার কোনো দুশমন ছিল বলেও জানি না।..ও আমাদের ছোট ভাই। আমরা সেই শয়তানকে চাই, ভাইকে যে মেরেছে।” রাজকুমারের গলা বুজে এল।
কিকিরা কিছু বললেন না।
.
খোঁজ-খবর :কমল আর মোতিয়া
দু তিন দিন চন্দনের কোনো খবর নেই। তারাপদ বুঝতে পারছিল না, কী হয়েছে চন্দনের? বাড়ি গিয়েছে নাকি? কোনোরকম খবর না দিয়ে চন্দন অবশ্য কলকাতা ছেড়ে পালায় না। আগে মাঝে-মাঝে ডুব দিত। এখন হাসপাতালের চাকরি, ডুব দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে কখনোকখনো চন্দনের মাথা গরম হয়ে গেলে ও গা ঢাকা দেয়। সে-অভ্যেস তার আছে।
বন্ধুর খোঁজ নিতে তারাপদ গেল চন্দনের মেডিক্যাল মেসে। গিয়ে দেখল, চোখে রঙিন গগলস্ এঁটে চন্দন বসে-বসে তাস খেলছে, পেসেন্স। আর রেডিও খুলে গান শুনছে।
সময়টা বিকেল। খানিকটা আগে ঝোড়ো হাওয়া উঠেছিল। এখনও যেন রাস্তাঘাটের ধুলোটে ভাব কাটেনি।
তারাপদ এসে বলল, “কী রে, তুই চোখে ঠুলি পরে বসে আছিস? কী হয়েছে?”
রেডিও বন্ধ করে দিল চন্দন। বলল, “বলিস না, কী করে একটা ইনফেকশান হয়ে গিয়েছিল। চোখ ফুলে, লাল হয়ে দুদিন যা কষ্ট দিয়েছে। আজ বেটার।”
“আমি ভাবলাম বাড়িটাড়ি চলে গিয়েছিস!”
“না। আসছে মাসে যাব,” বলে চন্দন তাসগুলো গুটিয়ে ফেলল, “আমি ভাবছিলাম আজ তুই আসবি।”
“তোর পাত্তা নেই, ভাবছিলাম কী হল?”
“কিকিরার খবর কী?”
“বলছি।”
চন্দনদের মেডিক্যাল মেসটাকে কোয়ার্টারও বলা যায়। প্রত্যেকের একটা করে ঘর, লাগোয়া ঘোট বাথরুম। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা মেসের মতনই। তবে চা-জলখাবার এটা-ওটা ঘরেই দিয়ে যায়।
তারাপদ গায়ের জামা খুলে ফেলল। ঝড়ের ধুলোয় চোখ-মুখ-মাথা কিরকির করছে। আগে বাথরুমে যাবে।
“আমি একটু ভদ্দরলোক হয়ে নিই। পাঁচ মিনিট। কিকিরা আসতে পারেন।” তারাপদ বাথরুমে চলে গেল।
চন্দন তাস রেখে বিছানাটা একটু ঝেড়ে নিল। জানলার একটা পাট কখন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, খুলে দিল। বাইরে করিডোর। শাঁটুল যাচ্ছিল নাচতে নাচতে। ছেলেটার হাঁটার ধরনই ওই রকম। ডাকল শাঁটুলকে। চা-টোস্ট আনতে বলল তারাপদর জন্যে। বলেই আবার কী মনে হল, “এই, আমাকে মুড়ি বাদাম খাওয়াতে পারবি? আচ্ছাসে তেল দিয়ে মাখবি। ভেজাল তেল। পিয়াজ দিবি, পচা পিঁয়াজ। আর লঙ্কা। পারবি না?”
শাঁটুল মাথা হেলিয়ে হাসল, “ওর সঙ্গে দুটো ফুলুরি?”
চন্দন বুঝল, ফাজলামি করছে শাঁটুল। তাড়া মারল শাঁটুলকে।
চোখের জন্যে গত দু’দিন মাথা ধরে ছিল বেশ। আজ অবশ্য মাথা ধরা নেই। কিন্তু জিভের স্বাদ আসছে না কেন? আসলে মাঝে-মাঝে বাড়ি গিয়ে মায়ের হাতের রান্না খেয়ে জিভের স্বাদ না পালটে এলে আর ভাল লাগে না।
বাড়ির জন্যে চন্দনের মন-কেমন করে উঠল হঠাৎ।
তারাপদ বেরিয়ে এল বাথরুম থেকে। বলল, “চাঁদু, আমার বোধহয় বাত হয়েছে। মাঝে-মাঝে বাঁ পায়ের হাঁটুটা কনকন করে ওঠে।”
“করুক। বেশি করে হাঁটবি, সেরে যাবে।”
চুল আঁচড়াতে লাগল তারাপদ। বলল, “আর কত হাঁটব রে! হেঁটেই অফিস যাই; ফিরি। কাল কম-সেকম পাঁচ-সাত মাইল হেঁটেছি।”
“কেন? কোথায় গিয়েছিলি?”
“কিকিরার চেলাগিরি করছিলাম। গিয়েছিলাম এন্টালির দিকে। সেখানে গিয়ে শুনলাম, লাইন পেরিয়ে শিবতলায় যেতে হবে সেখানে গিয়ে আবার খোঁজ পেলাম…।”
তারাপদকে কথা শেষ করতে দিল না চন্দন, “এন্টালির দিকে কেন?”
“কমলের খোঁজ করতে।”
“কে কমল?”
“কমল ব্যানার্জি।”
“কে সে?”
“ফুলকুমারের বন্ধু। ফুলকুমারের ম্যাজিকের দলেও ছিল।”
চন্দন টেবিল হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেট তুলে নিল, “আমি তো একেবারে ইগনোরান্ট হয়ে আছি রে তারা, মানে কিকিরার ভাষায়..” বলে হো-হো করে হেসে উঠল।
তারাপদ বলল, “তুই সেদিন গেলি না, গেলে জানতে পারতিস। রাজকুমারের সঙ্গে তোর আলাপটাও হয়ে যেত।”
