কিকিরা বললেন, “হল্টার যিনি কেয়ারটেকার, সরখেলবাবু, তাঁকে বাগ মানাতে তেমন অসুবিধে হয়নি। তবে হল্ এখন বন্ধ।”
“জায়গাটা কেমন দেখলেন?” রাজকুমার বললেন।
“খুনখারাপি করে গা-ঢাকা দেবার মতন জায়গা। ফাঁকা, চুপচাপ; একদিকে রেললাইনের সাইডিং, অন্যদিকে খাঁখাঁ,” কিকিরা হাসলেন।
রাজকুমার বললেন, “আপনার কথামতন আমি জিনিসগুলো এনেছি।” বলে খামটা দেখালেন।
কিকিরা হাত বাড়ালেন। “ফুলকুমার কবে থেকে ম্যাজিক দেখাচ্ছে রাজকুমারবাবু?”
“পাঁচ-ছ’ সাল। আপনাকে সেদিন বলেছি, রায়বাবু।”
তারাপদ বুঝতে পারল কিকিরাকে রাজকুমার রায়বাবু বলেন। দু’একটা চলতি হিন্দি শব্দ বেরিয়ে আসে।
“বলেছেন। সব কথা খেয়াল রাখতে পারি না,” হাসির মুখ করলেন কিকিরা, “তা ছাড়া বারবার শুনলে ফাঁকগুলো ধরা পড়ে।” কিকিরা তারাপদর দিকে তাকালেন। “কাগজ কলম নেবে নাকি? দু’চারটে নোর্ট থাকা ভাল। পাঁচরকম ভাবতে ভাবতে এটা ওটা মিস করে যায়।”
তারাপদ উঠল। সামনের টেবিলেই সাতসতেরো জিনিস পড়ে আছে; কাগজ, কলম, ডায়েরি, পাঁজি, সেলোটেপ, কাঁচি, হজমিবড়ির শিশি, কিছুই বাদ যায়নি।
কাগজ আর ডটপেন নিয়ে ফিরে এসে নিজের জায়গায় বসল তারাপদ।
কিকিরা রাজকুমারকে বললেন, “আমি কী জিজ্ঞেস করছি তা নিয়ে আপনি মাথা ঘামাবেন না। যা জানেন, যতটা জানেন বলবেন। না জানলে বলবেন না।…আপনি বলছেন, ফুলকুমার ম্যাজিক দেখাচ্ছে মাত্র পাঁচ-ছ বছর?”
রাজকুমার ঘাড় নাড়লেন।
“তারাপদ, তুমি শর্টে নোট্ করে নিয়ো। জাস্ট পয়েন্টগুলো।…কুমারবাবু, আপনার ভাই, ফুলকুমার অন্য কী কাজ করত? শুধুই ম্যাজিক দেখাত, তা তো হতে পারে না।”
রাজকুমার বললেন, “আমার ভাইয়ের মাথা খারাপ ছিল রায়বাৰু? ওকে আমরা কমার্স পড়াতে পারলাম না, ওকাইলতি পড়াব ভেবেছিলাম, ও কিছু পড়ল না। কালেজে যেত, ঘুরত-ফিরত, ইয়ার-দোস্ত নিয়ে মজা করত, সিনেমা দেখত। কালেজ ছেড়ে দিল। ভাইকে বললাম, কারবারে এসে বসতে। দু’চার মাস মরজি মতন এল। আর এল না। কলকাত্তা ছেড়ে চলে গেল বেনারস। আমার বোন থাকে। বোনের কাছে, ফ্যামিলিতে দেড় সাল ছিল, কলকাত্তা ফিরে এল। সেই থেকে ওর নেশা চাপল–ম্যাজিশিয়ান হবে।”
“বয়স কত ছিল ফুলকুমারের?”
“আঠাইশ।“
“দেখতে কেমন ছিল? ফোটো এনেছেন?”
“খামের মধ্যে আছে।”
কিকিরা খাম থেকে ছবি বার করলেন। ফোটো। দেখলেন, “আপনার ভাই দেখতে সুন্দর ছিল কুমারবাবু!” বলে গোটাচারেক ফোটো তারাপদর দিকে এগিয়ে দিলেন।
তারাপদ ফোটো নিল। দেখল। ফুলকুমারের সাধারণ একটা ফোটো ছাড়া, অন্যগুলো জাদুকরের পোশাক-আশাক পরা ছবি। ফুলকুমার দেখতে সুন্দর ছিল যে, বোঝাই যায়।
“আপনি বলছেন ফুলকুমার শুধু ম্যাজিকই দেখাত?” কিকিরা বললেন।
“না, রায়বাবু। দো সাল হল ও একটা দোকান খুলেছিল, “টয় শপ। নিউ মার্কেটে ওর স্টল ছিল। বালবাচ্চার খেলাওনা বিক্রি করত। ম্যাজিক ওর নেশা ছিল।”
“খেলনার দোকানটির মালিক কে? ফুলকুমার একলা?”
“ওর একলারই দোকান ছিল। আমরাও নামে মালিক ছিলাম।”
“মানে, আপনি আর আপনার মেজো ভাই, মোহনভাই?”
“জি।…আপনি মোহনকে দেখেছেন রায়বাবু, ও বেচারির…”
“জানি।” কিকিরা তারাপদর দিকে তাকালেন, “কুমারবাবুর মেজো ভাইকে আমি চিনি। ট্রাম অ্যাকসিডেন্টে একটা হাত নষ্ট হয়ে গেছে। খুব ভাল লোক। মোহন চমৎকার হারমোনিয়াম বাজাত। তবলা। না, কুমারবাবু?”
রাজকুমার ঘাড় নাড়লেন। “আপনি জানেন রায়বাবু, আগে আমাদের যখন মিউজিক্যাল ইনস্ট্রমেন্টসের দোকান ছিল, তখন কারখানাটা মোহন দেখত। ওর হাত চলে যাবার পর কারখানা তুলে দিলাম।”
কিকিরা অন্য কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন, বগলা এল। রাজকুমারের জন্যে চা এনেছে।
বগলা চলে গেলে কিকিরা বললেন, “ফুলকুমারের খেলনার দোকান এখন বন্ধ?”
“জি।”
“আচ্ছা কুমারবাবু, বেনারস থেকে ফিরে আসার পরই কি আপনার ভাইয়ের মাথায় ম্যাজিকের নেশা বা শখ যাই বলুন, সেটা চেপে ধরে
“আমার তাই মালুম।”
“বেনারসে ও কার কাছে খেলা শিখত, আপনি জানেন?”
“না।”
কিকিরা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে কিছু ভাবলেন। শেষে বললেন, “আপনারা ফুলকুমারের খেলা দেখেছেন?”
রাজকুমার কেমন বিষণ্ণ মুখে হাসলেন। “দো-একবার দেখেছি। বাতচিত ভাল বলত। খেলা খারাপ ছিল না, রায়বাবু। ঘোড়া হোড়া কাঁচা ছিল। ইমপ্রুভ করছিল। চার-পাঁচ সালে কে আর পাকা ম্যাজিশিয়ান হয়?”
কিকিরা মশলার কৌটোটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন। “সেদিন আপনি বা আপনার বাড়ির কেউ খেলা দেখতে যাননি বলছিলেন?”
“না।”
“ফুলকুমারের হারমোনিয়ামের খেলা আপনারা দেখেননি?”
“না। খেলাটা নতুন ছিল। ওই দিন ও সেকেন্ড টাইম খেলাটা দেখাচ্ছিল।”
“খেলাটা কে দেখেছে?”
“বাড়ির কেউ দেখেনি।…আমাদের দোকানের লালাজি দেখেছে। পয়লা বার যখন খেলা দেখায় ফুলকুমার, তখন দেখেছে।”
“আপনি জানেন খেলাটা কেমন ভাবে দেখানো হত?”
রাজকুমার মাথা নাড়লেন। “আমি ঠিক জানি না, রায়বাবু। লালাজি দেখেছে, ও জানে।…আমি শুনেছি, স্টেজের ওপর, মাঝখানে টেবিলে হারমোনিয়াম থাকে। হারমোনিয়াম থেকে দো-তিন হাত দূরে ফুলকুমার। ফুলকুমারের হাতে হ্যান্ড কা থাকে, চোখ বাঁধা থাকে পট্টিতে।”
তারাপদ অবাক হয়ে রাজকুমারের কথা শুনছিল।
কিকিরা এর আগেও রাজকুমারের কাছ থেকে কথাটা শুনে নিয়েছেন। আবার শুনলেন। রাজকুমার ঠিক-ঠিক বলছেন, না, ভুলচুক করছেন, বা কিকিরাই কোনো কথা ভুলে গিয়েছেন কি না, পরখ করে নিচ্ছিলেন।
