“এখন কিসের ব্যবসা?”
“কাপড়ের। বড়বাজারে কাপড়ের ব্যবসা করে।”
“বাদ্যযন্ত্র থেকে বস্ত্র ব্যবসায়ী?” তারাপদ হাসল।
কিকিরাও মুচকি হাসলেন। বললেন, “রাজকুমার আজ আসবে। সময়ও হয়ে এসেছে। তাকে দেখলে তুমি খানিকটা আঁচ করতে পারবে।”
তারাপদ আর কিছু বলল না। আসুক রাজকুমার, দেখা যাবে ভদ্রলোককে।
কিকিরাও সামান্য সময় চুপচাপ। মাথার চুল ঘাঁটছিলেন অলস ভাবে। শেষে উঠে দাঁড়ালেন। “আমি একটা পিচার এঁকেছি! দেখবে?”
কিকিরার গলার স্বরে মজা। চোখ দুটিও হাসি-হাসি।
তারাপদ বলল, “ছবি? আপনার ওটাও জানা আছে?” বলে জোরে হেসে উঠল।
কিকিরা এগিয়ে গিয়ে র্যাকের মাথা থেকে একটা চওড়া মাপের বই তুলে নিলেন। তার মধ্যে থেকে মোটা ড্রয়িং-পেপারের মতন এক কাগজ বার করলেন। নিজে দেখলেন একবার। কাগজটা এনে তারাপদকে দিলেন।
কাগজটা হাতে নিয়ে তারাপদ অবাক। এ আবার কেমন ছবি? দেখতে দেখতে তারাপদ বলল, “কিকিরা-স্যার, এটা কিসের ছবি?”
“কী মনে হচ্ছে তোমার?”
“স্টেজের মতন লাগছে।”
“ওটা স্টেজ। ঠিকই ধরেছ। যে-স্টেজ আমরা গত পরশু দেখে এলাম।”
“আচ্ছা! এ ছবির মধ্যে এখানে-ওখানে নানা চিহ্ন কেন?”
“ওগুলো সংকেত-চিহ্ন বলতে পারো। খানিকটা আবার নকশা।”
“ছবিটা থেকে আপনি কিছু ধরবার চেষ্টা করছেন মনে হচ্ছে।”
“না, একটা আন্দাজ করছিলাম,” কিকিরা বললেন, “আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় স্টেজটা ঠিকঠাক আছে? কিছু বাদ যায়নি তো?”
তারাপদ খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করল। সরখেল যেভাবে স্টেজ দেখিয়েছেন ওভাবে দেখলে কিছুই বোঝা যায় না। দুটো টিমটিমে বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে বড়জোর মিনিট দশেক দেখিয়েছিলেন স্টেজের ভেতর আর বাইরেটা। তারাপদ মন দিয়ে লক্ষ করতেও পারেনি সব।
তারাপদ বলল, “স্টেজের সামনের দিক আর পিছনের দিক ঠিকই আছে মনে হচ্ছে। একটা জিনিস আমি দেখতে পাচ্ছি না। কাঠের একটা সিঁড়ি দেখেছিলাম স্টেজের বাঁ..না, বাঁ নয়, ডান ধারে। সেই সিঁড়িটা কই?”
কিকিরা কী ভেবে হাসলেন। “নেই? তা হলে বোধহয় ভুলে গিয়েছি। আঁকতে। বাকি সব ঠিক আছে?”
“মনে হচ্ছে আছে, তারাপদ নকশা দেখতে দেখতে বলল।
সাজঘরের জায়গায় দুটো ক্রস দেওয়া আছে, দেখছ। একটা ঘর ছেলেদের, অন্যটা মেয়েদের। তার পাশ দিয়ে একটা প্যাসেজ গেছে। লক্ষ করেছ?”
“ডট-ডট দিয়ে রেখেছেন যেটা?”
“হ্যাঁ। ওই প্যাসেজটা সোজা ব্যাক স্টেজের বাইরে গিয়ে পড়েছে। যেখানে পড়েছে সেখানে একটা গুদোম মতন। কাঠকুটো, ভেঁড়াখোঁড়া সিনসিনারি, লোহালক্কড় ডাঁই হয়ে পড়ে আছে ওখানটায়। তার পাশেই একটা কল। খানিকটা ঝোপ মতন।”
তারাপদ নকশা দেখছিল। নকশায় কয়েকটা গোল চৌকো দাগ দেওয়া রয়েছে। কিকিরার নজরকে তারিফ করতে হয়। কত অল্প সময়ের মধ্যে তিনি এ-সব নজর করেছেন! তারাপদ বলল, “এই নকশা থেকে আপনি কী প্রমাণ করতে চাইছেন?”
“প্রমাণ করতে চাইছি না কিছু। এখন অন্তত নয়। তবে ভাবছি।”
“কী ভাবছেন?”
“ভাবছি, এই রাস্তাটা দিয়ে একটা লোকের আসা, চলে যাওয়া, চুরি করে কিছু নিয়ে পালিয়ে যাওয়া সহজ। সহজ, কেননা একবার ওই বাতিল জিনিসপত্রের জঞ্জাল আর ঝোপঝাড়ের কাছে পৌঁছতে পারলে তার বাইরে বেরোতে কষ্ট হবে না। ওখানটার পাঁচিল ভাঙা। কম্পাউন্ড-ওয়ালের ওপারেই সরু রাস্তা। রাস্তাটা ঘুরে গিয়ে বড় রাস্তায় পড়েছে।”
তারাপদ কিকিরার দিকে তাকিয়ে থাকল কয়েক পলক। বলল, “আপনি বলতে চাইছেন, এই রাস্তা ধরে কেউ এসেছিল, ফুলকুমারকে খুন করে পালিয়ে গিয়েছে?”
“হতে পারে। আসতেও পারে, আবার শুধু পালাতেও পারে। ভুতুড়ে হারমোনিয়ামটাও এই রাস্তা দিয়ে পাচার হয়ে যেতে পারে। তুমি কী বলল?”
তারাপদ কিছু বলার আগেই বগলা তাকে ডাকল।
নকশা রেখে দিয়ে তারাপদ বলল, “আমি আসছি। চোখে-মুখে জল দিয়ে আসি। বগলাদা খাবার তৈরি করেছে। বড় খিদে পেয়ে গিয়েছে আমার,” বলে উঠে পড়ল। কিকিরার ঘরবাড়িকে ওরা আর অন্যের বলে মনে করে না।
কিকিরা নকশাটা তুলে নিয়ে দেখতে লাগলেন।
.
ঘরে আলো জ্বালাবার মুখেই রাজকুমার এসে হাজির।
কিকিরা আর তারাপদ কথা বলছে, রাজকুমার এলেন। তারাপদকে দেখে রাজকুমার থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মুখ দেখে মনে হল, খুশি হলেন না।
কিকিরা হেসে বললেন, “ঘাবড়াবেন না। এরা আমার চেলা। আমি এদের “সোলজার’ বলি। এর নাম তারাপদ। আর একজন এখনো এসে পৌঁছয়নি। তার নাম চন্দন। সে ডাক্তার।”
তারাপদ নমস্কার করল।
রাজকুমারও নমস্কার করে ঘরের অন্য পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।
ভদ্রলোককে দেখছিল তারাপদ। লম্বা-চওড়া চেহারা। শক্ত গড়ন। গায়ের রঙ ফরসাই ছিল, বয়েসে খানিকটা যেন তামাটে হয়ে গিয়েছেন। মুখের গড়ন দেখে বোঝা যায় ঠিক বাঙালি নন। তবে সাজে-পোশাকে একেবারে বাঙালি। পরনে ধুতি, গায়ে পাঞ্জাবি। মাথার চুল সিঁথি করে আঁচড়ানো। চোখে চশমা। কপালের একপাশে কাটা দাগ। চোখ দুটিতে দুশ্চিন্তা আর উদ্বেগের ছাপ রয়েছে। জামাকাপড়গুলোও ধোপদুরস্ত নয়। কেমন বিষণ্ণ লাগে।
রাজকুমারের হাতে একটা বড় মতন খাম ছিল। উনি বসলেন একপাশে।
কিকিরা বললেন, “আমরা পরশুদিন জায়গাটা দেখে এসেছি, কুমারবাবু।”
রাজকুমার খুশি হলেন। “আপনি যাবেন বলেছিলেন।”
তারাপদ লক্ষ করল, রাজকুমারের বাংলা উচ্চারণে দোষ প্রায় নেই। বোঝাই যায় না উনি বাঙালি নন। কলকাতায় থাকতে থাকতে জিভ রপ্ত হয়ে গিয়েছে।
