“বেশ। তবে তাই,” রুমালটা আরও একটু সরিয়ে দিলেন কিকিরা সরখেলের দিকে, “আমরা দিন চার-পাঁচ পরেই আসব।”
“আসুন।”
“একটা অনুরোধ,” কিকিরা রুমালের ওপর চোখ রেখে হাসলেন, “হলটা যদি একবার দেখতে দেন। মানে আমাদের ছেলেরা একটা ঐতিহাসিক নাটক করবে। স্টেজটা দেখে গেলে ভাল হত। নিজেরাই সেটেট তৈরি করছে। বেশ করেছে। কোথায় কেমন মানাবে দেখে নিলে ভাল হত। তা ছাড়া হলটাও দেখে নেওয়া দরকার। পাঁচ-ছ’শো লোক হবে আমাদের। পাড়ার লোকই বেশি। …আপনাদের হলে কত লোক ধরে?”
“শ’পাঁচেক। চারশো বাহাত্তর।
“একটু কম হয়ে গেল,” কিকিরা তারাপদর দিকে তাকালেন, “টেনেটুনে ম্যানেজ করতে হবে, কী বললো!…যাকগে, তোমার স্টেজের ব্যাপার–একবার দেখে নাও,” কিকিরা এমনভাবে বললেন, যেন সরখেল স্টেজ দেখাতে রাজি হয়ে গেছেন।
সরখেল চেয়ার ছেড়ে উঠলেন না।
কিকিরা ইশারা করলেন তারাপদদের। ঘর ছেড়ে চলে যেতে বললেন।
চন্দন আর তারাপদ একে-একে ঘরের বাইরে চলে গেল।
সরখেল প্রথমটায় কোনো কথাই বললেন না। পরে বললেন, “আপনাদের আমি স্টেজ দেখাতে পারি না।”
“কেন! একটিবার শুধু দেখব।”
“আপনাকে আমি বলছি কী? পুলিশ থেকে বারণ!”
“ভাড়া দেওয়া বারণ বলেছেন। ভাড়ার কথা পরে এসে ঠিক করে যাব। এখন শুধু একটি বার স্টেজ আর হল্টা…”
“না। হবে না। আপনি মশাই বেআইনি কাজ করিয়ে নিতে চাইছেন। থানা থেকে লিখিয়ে আনুন, আপনাদের হ দেখিয়ে দেব।”
কিকিরা হাসি-হাসি মুখ করে বললেন, “আমি স্যার থানা-পুলিশ জানি না। আপনাকে জানি। আপনি যদি দেখাতে না চান দেখাবেন না। কিন্তু, আমি বলছিলাম, আপনি যদি দেখাতেন ক্ষতিটা কী হত! আমরা একবার চোখের দেখা দেখে চলে যেতাম। কোনো জিনিসে হাত ছোঁয়াতাম না।..অ-আপনার যখন অসুবিধে, তখন না হয় না-দেখালেন। পরে এসে দেখে যাব।”
কিকিরা নমস্কার জানিয়ে উঠে পড়লেন।
সরখেলের বোধহয় খেয়াল হল। “আপনার রুমাল?”
“ও”
কিকিরা রুমালটা তুলে নিলেন হাত বাড়িয়ে। রুমালের তলায় এমন কিছু ছিল, যা দেখার পর সরখেল খানিকটা ইতস্তত করলেন। হঠাৎ তাঁর মত পালটে গেল। বললেন, “আপনি আমাকে দিয়ে বেআইনি কাজ করিয়ে নিচ্ছেন মশাই। কী আছে, চলুন। তাড়াতাড়ি সেরে নিন।”
সরখেল টেবিলের ড্রয়ার থেকে চাবির গোছা বার করে উঠে দাঁড়ালেন।
.
রাজকুমার
তারাপদ এসে দেখল, কিকিরা চোখ বুজে গান শুনছেন। এমনভাবে শুয়ে আছেন তাঁর গদিঅলা আর্ম চেয়ারে হাত-পা ছড়িয়ে, মাথার তলায় কুশন খুঁজে, যেন ঘুমিয়ে পড়েছেন।
দুমুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকল তারাপদ। পুরনো আমলের গ্রামোফোন, রেকর্ডও পুরনো; গান দূরের কথা, গলাই শোনা যায় না; ঘ্যাসঘেসে একটা শব্দ, না-কথা, না-সুর। এই গান শুনে মানুষ আবার ঘুমিয়ে পড়ে নাকি? কিকিরার সবই অদ্ভুত। যেমন মানুষ, তেমন তাঁর পছন্দ। এই ঘরটা দেখলেই বোঝা যায়, ছোটখাটো একটি মিউজিয়াম আগলে কিকিরা দিব্যি তাঁর দিনগুলো কাটিয়ে যাচ্ছেন।
তারাপদ ডাকতে যাচ্ছিল কিকিরাকে, তার আগেই কিকিরা বললেন, “সোজা আসছ?”
“আপনি জেগে আছেন? আমি ভেবেছিলুম, গান শুনে ঘুমিয়ে পড়েছেন!”
কিকিরা চোখ খুললেন, নড়েচড়ে বসলেন। বললেন, “এ গান তোমার খগেন দস্তিদারের। রেকর্ডটা হবে ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ সালের। আমার পুরনো রেকর্ডের স্টকের মধ্যে পেয়ে গেলাম।”
“ওটা গান, না, গদাযুদ্ধ?”
হেসে ফেললেন কিকিরা। “সেকালের গানটান তোমাদের পছন্দ নয়। বন্ধ করে দাও। শেষ হয়ে এসেছে।”
গান শেষ হল। তারাপদ রেকর্ডটা তুলে রেখে দিল একপাশে। গ্রামোফোনের ঢাকনা বন্ধ করল।
“তুমি মেসে যাওনি?”
“না। চন্দনের আসতে আসতে সাতটা বেজে যাবে। ওর হাসপাতাল থেকে ছুটিই হবে ছ’টার সময়। “
“তাই বলছিল, নতুন ডিউটি শুরু হয়েছে?”
“কিকিরা-স্যার,” তারাপদ বলল, “কাল রাত্তিরে আমার একটা কথা মাথায় এল।” কাছাকাছি একটা চেয়ারে বসল সে। ঘরে পাখা চলছে। জানলা খোলা। বিকেল মরে গিয়েছে অনেকক্ষণ, আলো ঝাপসা। ঘরের মধ্যে এখন তেমনভাবে ছায়া নামেনি। সব কিছুই চোখে দেখা যায়।
কিকিরা বললেন, “কী কথা?”
“ফুলকুমার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। তার দাদা রাজকুমার আপনাকে যা বলছে, আপনি সেটাই মেনে নিচ্ছেন।”
“মেনে নিচ্ছি মানে শুনছি। না শুনে উপায় কী! রাজকুমার যদি আমার কাছে এসে তার ভাইয়ের কথা না বলত, কিছুই জানতে পারতাম না।”
“রাজকুমারকে আপনি বিশ্বাস করেন?”
“এ-কথা কেন বলছ?”
“না, ধরুন, এর মধ্যে যদি রাজকুমারের কোনো হাত থাকে?”
“আমার মনে হয় না,” কিকিরা বললেন, “রাজকুমারের হাত থাকলে সে আমার কাছে আসত না। আর সে না এলে আমি ফুলকুমারের কথা কিছুই জানতে পারতাম না।”
তারাপদ সামান্য চুপ করে থাকল। “রাজকুমারকে আপনি অনেকদিন চেনেন?”
“তা চিনি। দশ বারো বছর আগে ওর সঙ্গে আমার দেখাশোনা খুবই হত। আমি তখন বিডন স্কোয়ারের দিকে থাকতাম। রাজকুমার আমাদের পাড়ায় একটা ছোট বাড়ি ভাড়া করে কারখানা খুলেছিল।”
“কিসের কারখানা?”
“বাজনা তৈরির। মিউজিক্যাল ইনমেন্ট-এর। মানে বাদ্যযন্ত্র তৈরির। সেখানে হারমোনিয়াম, বাঁশি, ফুট, তবলা, তারপর কী বলে তোমার তারের যন্ত্র–সেতার, এস্রাজ তৈরি হত।”
তারাপদ অবাক হয়ে বলল, “ভদ্রলোকের কি বাজনা-তৈরির কারবার?”
“আগে তাই ছিল। একরকম পৈতৃক ব্যবসাই ছিল। চিতপুরে দোকান ছিল ওদের। এখন আর নেই।”
