কিকিরা মাথা নাড়লেন।
দশ-পনেরো হাতের একটা ঘর। বাতি জ্বলছিল। সমস্ত ঘরটা অগোছালো, নোংরা। কয়েকটা পুরনো র্যাক, গোটা-দুই ভাঙা আলমারি আর গোটা কয়েক লোহার চেয়ার ছাড়া অন্য কিছু নেই।
সরখেল টেবিলে বসে কাজ করছিলেন। বিড়ির গন্ধে ঘর ভরা।
কিকিরা দরজার বাইরে থেকে কাশলেন।
“কে?” সরখেল দরজার দিকে তাকালেন।
“আমরা একবার আসব, স্যার?”
“কী দরকার?”
“জরুরি দরকারেই এসেছি, স্যার। আপনি তো সরখেলবাবু?”
“আসুন।”
ভেতরে এলেন কিকিরা। চন্দন আর তারাপদ পিছনে।
“নমস্কার স্যার,” কিকিরা বিনয় করে নমস্কার সারলেন। “আপনার নাম শুনেই এলাম।”
সরখেল বোধহয় কোনো হিসেবপত্র দেখছিলেন। খাতাটা সেই রকম। মানুষটিকে দেখলে মায়া হয়। গায়ে যেন মাংস নেই, শুধু হাড়; মাথার চুল কাঁচা-পাকা, তোবড়ানো গাল, চোখের চশমাটা ডাঁটি-ভাঙা। গায়ে ময়লা পাঞ্জাবি।
কিকিরা বললেন, “আমরা একটু বসি?” বলে চেয়ার সরিয়ে বসে পড়লেন। ইশারায় বসতে বললেন তারাপদদের।
“কী দরকার আপনাদের?” সরখেল জিজ্ঞেস করলেন।
“আমাদের একটা বুকিং দিতে হবে, স্যার,” কিকিরা বললেন।
“বুকিং? কিসের বুকিং?”
“এই হলটা আমাদের একদিন চাই।”
“হল ভাড়া!” সরখেল চশমাটা কপালের ওপর তুলে নিলেন। “হ এখন ভাড়া দেওয়া হচ্ছে না।”
“ভাড়া দেওয়া হচ্ছে না! কেন? এই তো সেদিন হরিপদ চাটুজ্যেরা ভাড়া নিয়ে ওদের থিয়েটার করল। আমি কার্ড দেখেছি ওদের।”
“আগে কী হয়েছে সেকথা বাদ দিন,” সরখেল বললেন, “হল আমরা ভাড়া দিই। ভাড়া দেবার জন্যেই হল। ভাড়ার টাকায় খরচ-খরচা চলে। কিন্তু মশাই, হল এখন বন্ধ। ভাড়া দেওয়া হচ্ছে না।”
“সে কী! কেন?” কিকিরা ইশারায় চন্দনের কাছে সিগারেটের প্যাকেটটা চাইলেন। চন্দন প্যাকেট দিল।
সরখেল বললেন, “থানা থেকে বারণ করে দিয়েছে।”
“থানা?” কিকিরা যেন কতই না অবাক হয়েছেন, অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। ততক্ষণে সিগারেটের প্যাকেট তাঁর হাতে। প্যাকেটের মধ্যে কী যেন খুঁজলেন। সরখেলের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। রেখেই দিলেন সামনে। “থানা কেন বারণ করবে? মারদাঙ্গা হয়েছিল, স্যার?”
“না। খুন। “
“খুন?” চোখের পাতা পড়ছিল না কিকিরার, হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন, “এই হলে খুন! বলেন কী?”
সরখেল সিগারেটের প্যাকেট তুলে নিলেন, “কী বলব, মশাই! এমন ঘটনা এই হলে কোনোদিন ঘটেনি। আজ বিশ বছর আমি এখানকার কেয়ারটেকার। খুনখারাপি হয়নি কখনও। লোকে হল ভাড়া নেয়; নাচে, গায়, থিয়েটার করে; টাকা মিটিয়ে যে-যার বাড়ি চলে যায়।”
সিগারেটের প্যাকেট খুলতেই সরখেল কী যেন দেখলেন। দেখে অবাক হলেন। একবার কিকিরার দিকে তাকালেন। তারপর প্যাকেট থেকে আলগোছে সিগারেট বার করলেন। “কোত্থেকে আসছেন আপনারা?”
“বেলেঘাটা। আমাদের এই ছেলেদের ক্লাবের সিলভার জুবিলির একটা ফাংশান আছে,” বলে তারাপদ আর চন্দনকে দেখালেন। “হল না হলে বিপদে পড়ে যাব, দাদা?”
সরখেল বললেন, “কোন ক্লাব?”
চন্দন বলল, “নব যুবক সংঘ,” নামটা তার চট করে মুখে এসে গিয়েছিল।
কিকিরা বললেন, “বুঝতেই তো পারছেন। পাড়ার লোকের সুবিধে দেখে আমাদের ব্যবস্থা করতে হয়। এই হল্টা কাছে। আসা-যাওয়ার সুবিধে।”
সরখেল সিগারেট ধরিয়ে নিলেন। বললেন, “হল এখন আমার হাতে নেই। খুন হবার পরের দিন থেকেই থানার হুকুমে সব বন্ধ রাখতে হয়েছে। এমনকী, যাদের বুকিং করা ছিল, তাদের ডেট ক্যানসেল করে দিতে হল। কী যে ঝামেলা, মশাই। লোকে এসে গালাগাল দিচ্ছে। আমি থানা দেখিয়ে দিচ্ছি। কী করব!”
“সত্যি সত্যি খুন হয়েছে?” কিকিরা বললেন।
“মানে! আপনি বলছেন কী! আমি কি ফক্কুড়ি করছি?”
“না না, তা করবেন কেন! কবে হয়েছে খুন?”
“ওই তো, সাত তারিখে।”
“হলের মধ্যে?”
“স্টেজে। একেবারে স্টেজের ওপর। তখন কে একজন ম্যাজিক দেখাচ্ছিল।”
“ম্যাজিক! আপনি দেখেছেন খুন হতে?”।
“না,” মাথা নাড়লেন সরখেল, “আমি কি মশাই সারা রাত এখানে বসে পাহারা দেব? সাড়ে সাতটা-আটটা নাগাদ আমি বাড়ি চলে যাই।” বলে সরখেল যেন বিরক্ত হয়েই সামনের খাতাটা বন্ধ করে ফেললেন।
“তা তো ঠিকই। আপনি এই ঘরে কতক্ষণ আর বসে থাকবেন!”
“থাকি না। পার্টির কাছ থেকে বকেয়া টাকা নিয়ে রসিদ দিয়ে এক-আধ ঘণ্টা থাকি, তারপর বাড়ি। দরকার পড়লে আমায় বাড়ি থেকে ডেকে নেয়। বাড়ি কাছেই।”
কিকিরা তারাপদদের দিকে তাকালেন, “তোমরা খুব মুশকিলে পড়ে গেলে। সরখেলবাবু যা বলছেন, তাতে আর আশা দেখছি না,” কিকিরা পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখ মুছলেন। রুমালটা তুললেন না। টেবিলের ওপর ফেলে রাখলেন। সরখেলকে দেখলেন কিকিরা, হাসলেন, “বড় নিরাশ হলাম স্যার। বিপদেও পড়ে গেলাম।”
সরখেল কী মনে করে বললেন, “আপনাদের ফাংশান কবে?”
“তা…তা দেরি আছে ক’দিন। এ-মাসের শেষাশেষি…। হ যবে পাব।”
“এ-মাসের শেষাশেষি! তাই বলুন। তা হলে হয়ে যেতে পারে।”
“পারে?”
“পারে। থানা বোধহয় দু’চার দিনের মধ্যেই হুকুম উঠিয়ে নেবে। সে রকম শুনেছি। আমাদের বড় লোকসান হচ্ছে, বুঝলেন না!”
কিকিরা এমন করে নিশ্বাস ফেললেন, যেন নিশ্চিন্ত হয়েছেন এতক্ষণে। বললেন, “তা হলে স্যার, আমাদের একটা দিন দিয়ে দেন যদি…।”
“এখনই! না না, এখন কিছুই হবে না। পরে আসুন। থানা থেকে ছাড় আসুক।”
