“যার দরকার সে আসবে,” কিকিরা বললেন, “কলকাতা শহরে রোজ কত ফাংশান হয় জানো? পাড়ার ক্লাব, অফিস-ক্লাব, স্কুলের প্রাইজ, কলেজের থিয়েটার এ তো বারো মাস তিনশো পঁয়ষট্টি দিন লেগে আছে। অত হল লোকে পাবে কোথায়? দরকারে পড়লে এখানেও আসে।”
“আপনি জানেন?”
“অল্পস্বল্প জানি বইকি। তা ছাড়া খবর নিয়েছি। রাজকুমার বলেছে।” বলে কিকিরা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে আকাশের দিকে তাকালেন। আলোর অবস্থাটা দেখে নিলেন বোধহয়। তারাপদকে বললেন, “একটা কথা আগে থাকতে শিখিয়ে দিই। তোমরা এমন ভাব করবে যেন এই হল্টা ভাড়া নেবার কথা বলতে এসেছ। পাড়ার ক্লাব থেকে আসছ। আমি তোমাদের সেক্রেটারি।”
চন্দন হেসে ফেলে বলল, “কোন্ ক্লাব? নাম কী?”
“কোন্ ক্লাব? ও একটা বলে দিও যা মুখে আসে। তবে পাড়ার কথা বললে কাছাকাছি একটা জায়গার নাম করবে। কাছাকাছি পাড়া থেকেই এখানে ভাড়া নিতে আসে বেশি। তাদের সুবিধে হয়। পাড়ার লোকেরও সুবিধে। “
তারাপদ চন্দনের দিকে তাকিয়ে রগড়ের গলায় বলল, “চাঁদু, কিকিরা একেবারে ছকে এসেছেন সব।”
কিকিরা বললেন, “তা ছকতে হবে না! এসেছি গোয়েন্দাগিরি করতে, পা বাড়াবার আগে না ভাবলে চলে?”
চন্দন বলল, “কিকিরা-স্যার, কাছাকাছি কোন্ পাড়া আছে আমি জানি না। তবে এদিক দিয়ে বোধহয় বেলেঘাটা যাওয়া যায়। তাই না?”
“বেলেঘাটাই বোলো। মস্ত এলাকা। বুঝতে পারবে না।”
শিকঅলা লোহার ফটক খোলাই ছিল। অবশ্য ফটকটা পুরো বন্ধ হবার কোনো উপায় নেই। একদিকের পাল্লার তলার দিকটা হেলে পড়ে মাটির মধ্যে গেঁথে রয়েছে।
ফটক পেরিয়ে ভেতরে পা দিতেই তারাপদ আর চন্দন খানিকটা অবাক হয়ে গেল। তাদের ডান দিকে ছোট-মতন একটা শেড়। ঢাকা বারান্দার মতন দেখতে লাগে। সেখানে কয়েকটা ছেলে দাঁড়িয়ে। একটা বেঞ্চি পাতা রয়েছে বাইরে। ছেলেগুলো গাঁট্টাগোট্টা। চেহারা আর পোশাক দেখলেই বোঝা যায়, ওরা এতক্ষণ ব্যায়াম করছিল। এখন বিশ্রাম নিচ্ছে। প্যারালাল বার, রিং, ওজন–আরও কত কী চোখে পড়ছে শেডের তলায়। দুটো বাতি জ্বলছিল।
তারাপদ বলল নিচু গলায়, “চাঁদু, ফিজিকাল কালচার নাকি রে?”
চন্দন বলল, “তাই মনে হচ্ছে। ব্যায়াম সমিতি।
কিকিরা বললেন, “হাঁ করে দাঁড়িয়ে থেকো না। দাঁড়াও, আমি জেনে আসছি।”
কিকিরা যে কী জানতে গেলেন, চন্দনা বুঝল না। তারা দেখল, উনি ছেলেগুলোর কাছে এগিয়ে গেলেন।
তারাপদ চারদিক দেখছিল। বাইরে থেকে একেবারেই বোঝা যায় না, ভেতরে এসে দাঁড়ালে অন্য রকম লাগে। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা জায়গাটা কম নয়। বাঁ দিকে কয়েকটা খুপরি ঘর, লোকজন থাকে। ঘরের সামনে দড়ির খাটিয়া, গামছা শুকোচ্ছে। দেখে মনে হল, দরোয়ান জমাদার, এদের থাকার জায়গা ওগুলো। ফটকের পাশে দু’চারটে টিনের ছাউনি। চা-পান-বিড়ির দোকান বসে শো থাকলে। মাঝ-মধ্যিখানে হল। সামনের দিকে কোনো দরজা নেই। হলে ঢোকার দরজা বোধহয় দু’পাশে, ডাইনে বাঁয়ে। সামনে শুধু কাঠের এক চৌখুপি। টিকিট বিক্রির ঘর।
চন্দন বলল, “তারা, ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াচ্ছে বল তো?”
“কোন ব্যাপার?”
“এই গোয়েন্দাগিরির। আমার ভাই মাথায় কিছু ঢুকছে না। কিকিরা যে কেন এই ঝামেলা ঘাড় পেতে নিলেন কে জানে! পুলিশের কাজ পুলিশকেই ছেড়ে দেওয়া ভাল।”
তারাপদ কিছু বলল না। কিকিরা আসছিলেন।
কাছে এসে কিকিরা বললেন, “সরখেলবাবুর সঙ্গে দেখা করতে হবে।”
“সরখেল? সে কে?”
“এই হলের চার্জে আছেন। কেয়ারটেকার। সরখেলবাবুর অফিস পিছন দিকে। স্টেজের দিকটায়। চলো, যাই।”
কিকিরা পা বাড়ালেন।
তারাপদ আর চন্দন এগোতে লাগল। চন্দন বলল, “আপনি ওদের কী বললেন?”
“বললাম, আমরা এই হল্টা বু করতে চাই। কার সঙ্গে কথা বলতে হবে, ভাই! ওরা সরখেলবাবুর কথা বলল। আর কী বলল, জানো!”
“কী?”
“বলল, হল্ ভাড়া দেওয়া এখন বন্ধ। এই হলে ক’দিন আগে একজন খুন হয়েছে। ওদের কথা শুনে আমি এমন ভাব করলাম যেন ফ ফ্রম স্কাই। তারপর বললাম, সে কী, আমরা যে তা হলে মারা পড়ে যাব। তখন ওরা সরখেলবাবুর সঙ্গে দেখা করে যেতে বলল।” কিকিরা হাসলেন একটু, মুখ-টেপা হাসি।
চন্দন বলল, “এতক্ষণে বুঝতে পারছি, কিকিরা। আজ রবিবার; তবু হল ফাঁকা। তার মানে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে না।…আপনি আর তা হলে কষ্ট করে যাচ্ছেন কেন সরখেলবাবুর কাছে?”
“আমি কি ভাড়া নিতে যাচ্ছি?”
“বাঃ! ভাড়ার কথাই বলতে যাচ্ছেন। আপনি তো সেই রকম “শো’ দেবেন?” চন্দন মজা করে বলল।
“তা দেব; দিতে হবে। আসলে, সরখেল কী বলে শুনব, তাকে বাগিয়ে একবার স্টেজ আর হল্টা দেখব।”
“সরখেল যদি আপনাকে হল দেখাতে না চায়?”
“চাইবে না, কেন চাইবে–” কিকিরা মুচকি হাসলেন, তারপর চোখ ছোট করে বললেন, “সরখেল চাইবে না, কিন্তু ওকে দিয়ে কাজটা হাসিল করিয়ে নিতে হবে। সেটাই তো কেরামতি।”
হলের পাশ দিয়ে রাস্তা। দরজাগুলো বন্ধ রয়েছে হলের। একটা মাত্র বাতি জ্বলছে এপাশে। দু’চারটে সাধারণ গাছপালা কম্পাউন্ডওয়ালের দিকে। সাইকেল রাখা কাঠের ভাঙা খাঁচা।
তারাপদ বলল, “কিকিরা, হল্টার পিছন দিকে বোধহয় ঝোপঝাড় আছে।”
“গাছ দেখে বলছ?”
মস্ত একটা নিমগাছের মাথা দেখা যাচ্ছিল পিছন দিকে। অন্ধকার মতন দেখাচ্ছে ওপাশটায়। আলো মরে এসেছে। ছায়া নেমে গিয়েছে গাঢ় হয়ে। তারাপদ বলল, “গন্ধ পাচ্ছেন না? ঝোপজঙ্গলের গন্ধ?”
