কিকিরা মাথার চুল ঘাঁটলেন সামান্য। বললেন, “কোনো ম্যাজিশিয়ানের খেলা দেখাবার জিনিসের জন্যে তাকে খুন করা হয়েছে বলে আমি শুনিনি। কেনই বা করবে? ফুলকুমারের ম্যাজিক-দেখানো হারমোনিয়ামের জন্যে তাকে খুন করা হবে কেন? আবার এটাও ঠিক, হারমোনিয়ামটা চুরিই বা যাবে কেন?…আমার মাথায় কিছু আসছে না।”
চন্দন আর তারাপদ সিগারেট ধরাল। চন্দন বলল, “আপনি কি ফুলকুমারের মৃত্যু রহস্য উদ্ধারের চেষ্টা করবেন ঠিক করেছেন?”
“ঠিক করিনি। কিন্তু রাজকুমার আমায় বড় ধরেছে। বলছে, পুলিশ তার কাজ যা করছে করুক। আমি যেন অন্তত চোর এবং চুরি, এই দুটো নিয়ে কিছু করি।”
তারাপদ একমুখ ধোঁয়া গিলে বলল, “কিকিরাস্যার, ব্যাপারটা যখন খুন-জখমের, তখন কি আপনার নাক গলানো উচিত হবে?”
“কেন?”
“ওটা তো পুলিশের হাতে চলে গেছে। আপনি নাক গলাতে গেলে উলটো না হয়ে যায়!”
কিকিরা মাথা দোলালেন। বললেন, “উলটো না হোক, পুলিশ ভাল চোখে দেখবে না। তবে কী জানো তারাপদ, আমি এমন একটা মানুষ, নিরীহ গোবেচারি যে, পুলিশ অন্তত আমায় খুনি ভাববে না। তা ছাড়া আমি বাপু, সাত তারিখে কলকাতায় ছিলাম না, ছিলাম কাশীতে। ঠিক কিনা?” বলে কিকিরা একটু মজা করে হাসলেন। বললেন, “মামলা লড়ার জন্যে তুমি যেমন যে-কোনো উকিলব্যারিস্টার নিতে পারো, রাজকুমার তার ভাইয়ের রহস্যময় মৃত্যুর কারণ জানার জন্যে যে-কোনো লোকের সাহায্য নিতে পারে। আইন তাকে আটকাতে পারে না।”
চন্দন বলল, “তার মানে, আপনি রাজকুমারের কথায় রাজি হয়ে গেছেন?”
“হ্যাঁ।.আরও হয়েছি এই জন্যে যে, ফুলকুমার একজন ম্যাজিশিয়ান ছিল। আমি নিজে ম্যাজিশিয়ান। ফুলকুমারের ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামানো আমার কর্তব্য। ঠিক কিনা, বলো?”
তারাপদ আর চন্দন চোখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারাপদ বলল, “আপনার কাজ কি শুরু হয়ে গেছে?”
“সবে শুরু করছি। এখন ভাবনা-চিন্তা যা খেলছে সব মাথার মধ্যে। সকালের দিকে একবার ওদিকের থানায় গিয়েছিলাম। রাজকুমার সঙ্গে ছিল। থানার বড়বাবু ছোটবাবুর সঙ্গে আলাপ করে এসেছি। বড়বাবু আমার দেশের লোক হে! গলাধাক্কা দেননি।” বলে কিকিরা হাসলেন। “পনেরো তারিখ থেকে কাজ শুরু করব। যাকে বলে কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হওয়া। তোমরাও আমার সঙ্গে লেগে পড়ো। পরশু থেকে। বুঝলে?”
তারাপদ বলল, “আমরা তো আপনার সঙ্গে লেগেই আছি। বলুন কী করতে হবে?”
“কাল বিকেলে আমার এখানে চলে আসবে। কাল রবিবার। কাল তোমাদের ওই জায়গাটায় নিয়ে যাব–যাকে বলে ঘটনাস্থল। বুঝলে? পরশু থেকে কাজ।”
.
ঘটনাস্থল
কিকিরা যাকে ঘটনাস্থল বলেছিলেন, সেই জায়গাটাকে দেখলে মনে হয় এ যেন ঠিক কলকাতা শহর নয়; পুরনো কোনো রেল কলোনি। কলকাতার ঘরবাড়ি, পাড়ার সঙ্গে এখানকার মিল কম, অমিলই বেশি দুচারটে সেকেলে বাড়ি, লোহার নকশা করা রেলিং, খড়খড়ি-দেওয়া জা-জানলা, ইট বারকরা ঝুলবারান্দা, এ-সব চোখে না পড়বে তা নয়, তবে বেশি করে যেটা চোখে পড়বে সেটা হল এক ছাঁদের, একই ধাঁচের সার-সার বাড়ি। মেটে লাল রং। একতলা। দোতলার সংখ্যা কম। বাড়িগুলো থেকে খানিকটা তফাতে বড় একটা মাঠ, মাঠের ওপারে বুঝি রেললাইন। উঁচু পাঁচিলের জন্যে লাইন চোখে পড়ছিল না।
তারাপদ আর চন্দন এলাকাটা ভাল করে দেখছিল। এদিকে তাদের আসা হয়ে ওঠেনি। রাস্তাঘাট সাধারণ, মাঝে-মাঝে ইট-বাঁধানো সেকেলে গলিখুঁজিও চোখে পড়ে। এক-আধটা ছোট কারখানা। দূরে বোধহয় রেলব্রিজ। খাল।
কিকিরা বললেন, “ওই বটগাছের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা, ওদিকে…।”
চন্দন বলল, “জায়গাটা চুপচাপ বলে মনে হচ্ছে?”
“কলকাতার তুলনায়। নয়ত চুপচাপ আর কোথায়?”
তারাপদরও সেইরকম মনে হল। লোকজনের আসা-যাওয়া, ছেলেছোকরার হইচই, রেডিওর গান, কোনো কিছুই বাদ যায় না, তবে কলকাতা শহরের পাড়াগুলো যেমন গমগম করছে, সে রকম গমগমে নয়। তার একটা কারণ বোধহয়, ঠিক এই জায়গাটা দিয়ে বাস-মিনিবাস যায় না, দোকান-পসার কম। ট্যাক্সি-রিকশার অবশ্য চলাচল রয়েছে।
তারাপদ বলল, “জায়গাটার নাম কী? কী বলে?”
কিকিরা জায়গাটার নাম বললেন। বলে চন্দনকে ইশারায় ঘড়ি দেখতে বললেন।
চন্দন তার হাতঘড়ি দেখল, “সাড়ে পাঁচ বেজে গিয়েছে।”
“এখনও ঘণ্টাখানেক আলো থাকবে, কী বলো? আজকাল বেলা বেড়ে গেছে।”
চন্দন অত খেয়াল করে কথাটা শুনল না, মাথা নাড়ল।
বটতলার পাশ দিয়ে সরু রাস্তা। পিচবাঁধানো। ট্যাক্সি টেম্পো অনায়াসেই চলে যেতে পারে। ডান দিকে এক শহিদ-স্তম্ভ। হাতকয়েক তফাতে খানিকটা জায়গার মাটি কোপানো। কুস্তির আখড়া নাকি? সাইকেল চড়ে দু’তিনটে ছেলে পাশ দিয়ে চলে গেল।
কিকিরা হাত তুলে সামনের দিকটা দেখালেন, “ওই বাড়িটা। সামনে গেট।”
তারাপদ আর চন্দন বাড়িটার দিকে তাকাল। ভাঙা পাঁচিলের ওপারে একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। বাড়ি না বলে শেড় বলাই ভাল। ঢেউ-খেলানো ছাদ। সিনেমা-থিয়েটারের হল সাধারণত যেমন দেখতে হয় সেই রকম দেখাচ্ছিল। লোহার শিক্-দেওয়া ফটক। ফটকের গা ঘেঁষে কৃষ্ণচূড়ার গাছ একটা।
কিকিরা বললেন, “আজ যেন ফাঁকা ফাঁকা!”
চন্দন তাকাল। “ফাঁকা মানে?”
“হল ফাঁকা। নো ফাংশান,” কিকিরা হাসলেন, “নাচ-গান-থিয়েটার কিছু নেই।”
তারাপদ বলল, “এই ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুরে কে ফাংশান করতে আসবে?”
