“আসলগুলো পড়ে নিই; ভেজাল পড়ি না,” হাসতে হাসতে বলল চন্দন।
কিকিরা বললেন, “তা হলে তোমরা খবরটা পড়োনি?”
“কোন খবর?”
“ডেথ অব এ ম্যাজিশিয়ান, জাদুকর ফুলকুমারের রহস্যময় মৃত্যু?”
চন্দন তারাপদ দু’জনেই অবাক। ফুলকুমার আবার কে? জীবনে এমন নাম তারা শোনেনি। তা ছাড়া ম্যাজিক সম্পর্কে তাদের আগ্রহ তেমন কিছু নেই। নিতান্ত কিকিরার সঙ্গে ওদের একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তাই মাঝে-মাঝে দু’দশটা গল্প শোনে ম্যাজিশিয়ানদের। ফুলকুমারের নাম চন্দনরা শোনেনি।
চন্দন বলল, “কিকিরা-স্যার, ফুলকুমারের নাম আমরা শুনিনি। খবরের কাগজেও কিছু পড়িনি। হেঁয়ালি না করে ব্যাপারটা যদি আমাদের বলেন, খুশি হব।”
কিকিরা মাথার ওপর হাত তুলে আলস্য ভাঙার ভঙ্গিতে বসে থাকলেন কিছুক্ষণ। যেন ফুলকুমারের কথা ভাবছিলেন।
বগলা চা নিয়ে এল। তার কাজকর্ম বেশ গোছানো। ট্রে করে চা এনেছে। বড় প্লেট গোটা দুই। প্লেটে কাশীর প্যাঁড়া, বরফি ধরনের এক মিষ্টি আর মচমচে সেউ গাঁঠিয়া।
চা রেখে বগলা চলে গেল।
চন্দন বরাবরই পেটুক গোছের। হাত বাড়িয়ে গোটা-দুই প্যাঁড়া তুলে নিল, নাকের কাছে এনে কল শব্দ করে; মজার গলায় বলল, “দারুণ, গন্ধতেই জিবে জল আসে।”
“দেওঘরের প্যাঁড়ার চেয়ে খারাপ নয় স্যান্ডেল উড়, বরং বেটার’ বলেই আমার মনে হয়। নাও, খাও। তারাপদ হাত বাড়াও, নয়ত ঠকবে,” বলে কিকিরা নিজের চায়ের কাপ তুলে নিলেন।
তারাপদ বলল, “প্যাঁড়ার চেয়েও জাদুকর ফুলকুমার আমার কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে কিকিরা।”
কিকিরা বললেন, “বলছি ফুলকুমারের কথা। তুমি শুরু করে দাও,” বলে বার কয়েক চুমুক দিলেন চায়ে। পরে বললেন, “ফুলকুমাকে আমি বাপু চিনি না। তার দাদা রাজকুমারকে চিনি। রাজকুমারের মুখেই আমি গতকাল সব শুনলাম।”
“আপনি যে বললেন কাগজে বেরিয়েছে?”
“বেরিয়েছে। ছোট করে। রাজকুমারই আমাকে বলেছে। আমি তো তখন কলকাতায় ছিলাম না। আজ সকালে পুরনো কাগজ জোগাড় করে দেখলাম।”
চন্দন বলল, “কবে ঘটেছে ঘটনাটা?”
“সাত তারিখে।” বলে কিকিরা বিষম খাওয়ার মতন করে কাশলেন। সামলে নিলেন। বললেন, “ফুলকুমারের মৃত্যুটা বড় অদ্ভুত। শিয়ালদার কাছে একটা হল-এ ম্যাজিক দেখাবার প্রোগ্রাম ছিল ফুলকুমারের। প্রায় অর্ধেকটা সময় সে তার ম্যাজিক দেখিয়েছে। মাঝে মিনিট পনেরো-বিশের জন্যে খানিকটা হাসি-তামাশার ব্যবস্থা ছিল। ওই প্রোগ্রামের পর ছিল ফুলকুমারের আসল খেলা, ভৌতিক হারমোনিয়াম।”
তারাপদর যেন গলা আটকে গেল, “ভৌতিক হারমোনিয়াম? সেটা আবার কী?”
“এক ধরনের খেলা। ম্যাজিক শো। স্টেজের ওপর একটা হারমোনিয়াম রাখা হবে। কাছাকাছি থাকবে ম্যাজিশিয়ান। চোখ বাঁধা, হাত বাঁধা। অথচ হারমোনিয়ামটা নিজেই বাজবে।”
চন্দন অবাক গলায় বলল, “বলেন কী? নিজে নিজেই হারমোনিয়াম বাজবে! ভুতুড়ে ব্যাপার নাকি?”
“বললাম তো ভৌতিক হারমোনিয়াম,” কিকিরা বললেন, “ফুলকুমারের এইটেই ছিল সেরা খেলা আর নতুন খেলা।”
চন্দন বলল, “দেখুন স্যার কিকিরা, আমরা এত রকম ম্যাজিকের খেলার কথা শুনেছি, নিজেরাও দু চারটে দেখেছি যে, হারমোনিয়াম বাজনায় কোনো থ্রিল পাচ্ছি না। ম্যাজিকে গলাকাটা, পেট কাটা, ভূত-নাচানো, মোটরগাড়ি ওড়ানো, কত কী হয়। এসব যদি হতে পারে, তবে সামান্য হারমোনিয়াম বাজানো হবে না কেন?”
“না-হবার কারণ সত্যি নেই। কিন্তু, তুমি কি এমন কথা শুনেছ চন্দন, খেলা দেখাবার সময় কোনো ম্যাজিশিয়ান স্টেজের মধ্যে খুন হয়?”
“খুন!” চন্দন আর তারাপদ একসঙ্গে যেন আঁতকে উঠল।
কিকিরা বললেন, “হ্যাঁ, খুন। রাজকুমার তাই বলল। বলল, তার ভাইকে স্টেজের মধ্যে কেউ খুন করেছে।”
“খুন করার প্রমাণ?”
“হাসপাতালে নিয়ে যাবার আগেই ফুলকুমার মারা যায়। ওরা সন্দেহ করেছে মাথার পিছন দিকে মারাত্মক চোট।”
“আপনি কী বলছেন, কিকিরা?”
“যা শুনেছি তাই বলছি। ফুলকুমারকে এমন একটা জিনিস দিয়ে মারা হয়েছিল যে, ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই যে-কোনো সবল সুস্থ মানুষ মারা যেতে পারে।”
“কী দিয়ে মারা হয়েছিল?”
“তা আমি জানি না। রাজকুমারের মুখে যা শুনেছি তাই বলেছি।”
“ফুলকুমারকে খুন করার কারণ?” তারাপদ জিজ্ঞেস করল।
“আমি কেমন করে বলব! আপাতদৃষ্টিতে কোনো কারণ থাকতে পারে না। ওর দাদা রাজকুমারও বলছিল, ফুলকুমারকে খুন করার মতন কেউ আছে বলে সেও জানে না। তবে তার জানার বাইরে অনেক কিছুই তো ঘটতে পারে।”
চন্দন বলল, “তবু একটা সন্দেহ? কিংবা ধরুন অনুমান…”
“না,” মাথা নাড়লেন কিকিরা, “রাজকুমার কাউকে সন্দেহ করতে পারছে না। তবে একটা ব্যাপার যা ঘটেছে সেটা অদ্ভুত।…স্টেজের মধ্যে ফুলকুমার মারা যাবার পর সেই হারমোনিয়ামটাও বেপাত্তা হয়ে গেছে।”
“বেপাত্তা? মানে হাপিস?”
“হ্যাঁ।”
“কেমন করে?”
“তা তো বলতে পারব না এখন। হারমোনিয়াম নেই; কিন্তু তার বাক্সটা আছে।”
তারাপদ চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। জানলা দিয়ে হাওয়া এল এক ঝলক। কিকিরার এই ঘরে এত রকম জিনিসপত্র যে ভাল করে বাতাস বইতে পারে না। চন্দনের কাছে একটা সিগারেট চাইল তারাপদ। তারপর কিকিরাকে বলল, “আপনি কি মনে করছেন ওই ভুতুড়ে হারমোনিয়ামটার জন্যে ফুলকুমারকে খুন করা হয়েছে?”
