কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে তারাপদ বলল, “আলো দেখছি রে, কিকিরা আছেন।”
দরজায় টোকা মারতেই বগলা দরজা খুলে দিল। প্যাসেজে লণ্ঠন জ্বলছে।
চন্দন বলল, “কী বগলাদা? কাশী বেড়ানো হল?”
ও “হল দাদা! এই নিয়ে দু’রার হল। একবার গিয়েছি ছেলেবেলায়, আর এবার গেলাম বুড়োবেলায়।”
“ভাল ছিলে?”
“তা ছিলাম। কোনো কষ্ট হয়নি।”
কিকিরার গলা পাওয়া গেল। ঘর থেকে সাড়া দিচ্ছেন।
তারাপদ ঘরের দিকে পা বাড়াল।
চন্দন বগলাকে বলল, “চা লাগাও, বগলাদা। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।”
কিকিরার ঘরে এসে তারাপদ বলল, “আপনি অন্ধকারে বসে আছেন?”
কিকিরা ঠিক অন্ধকারে বসে ছিলেন না। ঘরের এক কোণে এক খেলনা বাতি জ্বলছিল। দেখতে অনেকটা ফানুসের মতন। বাহারি। ছোট। তার মধ্যে বোধহয় মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন কিকিরা। বাটি-মোমবাতি।
কিকিরা বললেন, “এসো। তোমাদের কথাই ভাবছিলাম।…এসো গো, স্যান্ডেল উড়। তোমার হাসপাতাল কেমন চলছে?”
চন্দন হাসল, “যেমন চলে। আপনি ফিরলেন কবে?”
“বুধবার। দশ তারিখেই। ভদ্দরলোকের এক কথা।”
“শুনলাম, খুব আরামে ছিলেন? বগলাদা বলছিল।”
“তা ছিলাম। এককালের রাজরাজড়ার বাড়ি। এখন ভূতের বাড়ি। একপাশে পড়ে ছিলাম।”
“ভূতের বাড়ি মানে?” তারাপদ জিজ্ঞেস করল।
“আগে বোসো, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করবে নাকি?”
চন্দন আর তারাপদ কাছাকাছি বসল কিকিরার।
ঘরের আলো এতই কম যে, কিকিরাকে ভাল করে দেখা যাচ্ছিল না। পরনে পাজামা, গায়ে কামিজ ধরনের এক জামা। জামার রঙ সাদা না ফিকে বাদামি বোঝা যাচ্ছে না। মাথার চুল উস্কোখুস্কো। কিকিরার রোগা হাড়-হাড় চেহারায় কেমন যেন রুক্ষ ভাব। শরীর খারাপ হয়েছিল নাকি ওঁর।
চন্দন বলল, “কিকিরা-স্যার, আপনাকে কাহিল দেখাচ্ছে কেন? বগলাদা বলছিল, আরামে ছিলেন কাশীতে; তা হলে শুকিয়ে গেলেন কেমন করে?”
কিকিরা কিছু বলার আগে হাত বাড়ালেন। বললেন, “একটা মিঠে সিগারেট দাও! চুরুট খেতে পারছি না। গলায় লাগছে।”
চুরুট সিগারেট কোনোটারই পাকা নেশা নেই কিকিরার। শখ করে খান। চিন্তা-ভাবনার সময় মগজে ধোঁয়া দেন।
চন্দন সিগারেট-দেশলাই এগিয়ে দিল কিকিরাকে।
সিগারেট ধরিয়ে দুচারটে টান দিলেন কিকিরা। তারপর হালকা গলায় বললেন, “চন্দন, আমাকে বোধহয় এবার একটা ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলতে হবে।”
চন্দন কিছু বুঝল না। তারাপদর দিকে তাকাল। তামাশা করছেন কিকিরার, না, অন্য কিছু ঘটেছে? কিকিরাকেই আবার নজর করে দেখতে লাগল চন্দন। লম্বা নাক, উঁচু চোয়াল। চোখ দুটি গর্তে ঢোকানো। দেখলে মনে হয়, টর্চলাইটের বাদ্ধ যেমন কাচের তলায় গর্তে ঢোকানো থাকে, সেই ভাবে ডোবানো আছে কিকিরার চোখ দুটি। অজীর্ণ রোগীর মতন রোগা রুক্ষ চেহারা। এই মানুষকে কি গোয়েন্দা মানায়? গোয়েন্দাদের কাঠামোই আলাদা।
চন্দন হেসে বলল, “আপনি তো হাফ-গোয়েন্দা।”
“না বাপু,” কিকিরা মাথা নেড়ে বললেন, “আমি ম্যাজিশিয়ান। কিকিরা দি গ্রেট,” বলে ছেলেমানুষের মতন হাসলেন। পরে বললেন, “সত্যি কথা বলতে কী, ম্যাজিকটাই বা হল কোথায়? শুরু করেছিলাম, মাঝপথে সেটা গেল। কপাল খারাপ হলে যা হয়। তারপর দেখো, কবে থেকে বসে আছি ম্যাজিকের ওপর বড় বড় দুটো বই লিখব বলে, জোগাড়যন্তর করি, আর কাজ নিয়ে বসলেই আটকে যায়। হবে না যে, আমার দ্বারা হবে না।”
এক সময় তারাপদদের ধারণা ছিল, ম্যাজিক নিয়ে আবার বই লেখা হয় নাকি? হলে সেটা বটতলার বইয়ের মতন হয়। কিকিরার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পর বুঝেছে, তাদের ধারণা ভুল। বিরাট-বিরাট বই আছে ম্যাজিকের। আর সেসব কি আজকের বই? কত পুরনো-পুরনো বই! কিকিরার মুখে নাম শোনা যায় : রোলো, বাটলার, কিং ফ্রান্সিস, সেলিগম্যান, হুডিনি, আরও কত কে! নামগুলো মনে থাকে না তাদের। তবে কিকিরার ঘর হাতড়ালে দশ-বিশটা বই পাওয়াও যাবে।
তারাপদ বলল, “ব্যাপারটা কী বলুন তো? আপনি যেন কাশী ঘুরে এসে মনমরা হয়ে গিয়েছেন। আপনার হাসিঠাট্টা নেই, মজা নেই, আপনার ইংলিশ নেই।”
কিকিরা একটু চুপ করে থেকে বললেন, “গিয়ে ভুল হয়েছে। আমার এক পুরনো বন্ধু এসেছিল কলকাতায়। তার ভাগ্নের বিয়েতে। সে একদিন খোঁজ করে দেখা করতে এল। পুরনো বন্ধুবান্ধবের ব্যাপার তো বোঝে। এমন করে মন গলিয়ে দেয় যে, তাদের আর না বলা যায় না। ওর পাল্লায় পড়ে কাশী চলে গেলাম। ভাবলাম, যাই, দু’দিন বেড়িয়ে আসি। এক সময় দশাশ্বমেধ ঘাট আমায় খুব টানত। গরমের দিন নৌকো করে গঙ্গায় ঘুরে বেড়াতে বড় আরাম হে। আমার একটা নেশাই ছিল, নৌকো করে ঘোরা। দশাশ্বমেধ, কেদার, ঘঘাড়াঘাট, এস্তার ঘুরে বেড়াতাম।”
“কাশীতে গরম পড়ে গিয়েছে?” চন্দন বলল।
“পড়ছে। কলকাতায় যা দেখছি তার চেয়ে বেশি।”
“এখানেও তো গরম পড়ে এল।…দেখুন না, আলো নেই, পাখী গরম-গরম লাগছে আমার।”
কিকিরা সিগারেটের টুকরোটা ছাইদানে ফেলে দিলেন।
তারাপদ বলল, “কাশী বেড়াতে গিয়েছিলেন, ভোল করেছিলেন। কিন্তু ভুলটা কী করলেন যে আফসোস করছেন?”
কিকিরা সামান্য চুপ করে থাকলেন, তারপর বললেন, “তোমরা কাগজ-টাগজ পড়ো না?”
প্রশ্নটা যেন বুঝতে পারল না তারাপদ। চন্দনের দিকে তাকাল। বলল, “পড়ি বইকি! অনেকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে কাগজ পড়ে। আমি অত পড়ি না,” বলে চন্দনের দিকে তাকাল, “তুই পড়িস?”
