রঘুপতি নীরব হলেন। তাঁর দুটি চোখ যেন জলে ভরে এসেছে।
কিকিরা প্রথমে কিছু বললেন না, পরে বললেন, “রঘুপতিবাবু, আমরা একটা লোকের খবর পেয়েছিলুম। দু’নম্বরটা এল কোথা থেকে? মানে কমলাপতির বন্ধু-বা ভাড়া করা লোক।”
“একসঙ্গেই এসেছিল বোধ হয়। তবে ঘোরাফেরা করেনি একসঙ্গে পাছে লোকে সন্দেহ করে, দেখতে পায়। বা মুখ চিনে রাখে।” রঘুপতি মাথা নাড়লেন–নিজের মনেই, “এখানে কোনো হোটেল নেই।পিনুর গেস্ট হাউস বলে একটা বাড়ি আছে। হঠাৎ কেউ এসে পড়লে থাকতে পারে দু-দশ দিন। খাওয়া-দাওয়া বাইরে। আপনি সেখানে খোঁজ নিলে দেখতে পাবেন “খইনি-খাওয়া একটা লোক ওই সময় ওখানে এসে কিছুদিন ছিল। লোকটাকে দেখতে ষণ্ডার মতন। বলত, সে জি আর পি-তে কাজ করে মোগলসরাইয়ে। নাম বলত, কেদার।…এসব খবর আমাকে জোগাড় করতে হয়েছে। পুজনই জোগাড় করেছে।”
“সেই লোক আর নেই?”
“না। কমলাপতি মারা যাওয়ার পরের দিনই সে চলে গেছে। মানে খবরটা জানাজানি হওয়ার পরের দিন।”
কিকিরা কিছুক্ষণ বসে থাকার পর উঠে পড়লেন ধীরে-ধীরে। বললেন, “মূর্তিটা তা হলে আপনার কাছেই থেকে গেল।”
“থাকল। ওটা আবার ঠিক জায়গায় রেখে দেব। বলে রঘুপতিও উঠে দাঁড়ালেন। “আমি জানতাম আপনারা কেন এসেছেন। গোপ আমায় জানিয়েছিল। কী করছেন তাও জানতাম। ছবিঘর যে আপনারা দেখতে চাইবেন–তাও বুঝতে পেরেছিলাম। মূর্তিটা তাই তুলে রাখিনি। এবার রেখে দেব।”
“ওটা বিদায় করা যায় না?”
“কোথায় আর গেল!…আপনারা বিশ্বাস করুন, কমলাপতি আমার ভাই। সম্পর্ক থাক না থাক–সে যতবড় বদমাইশ হোক–এমন করে সে মারা যাবে আমি কল্পনাও করিনি। বংশের আরও একজন গেল। এর পর হয়ত আমার পালা।“
তারাপদরাও উঠে দাঁড়িয়েছিল।
রঘুপতি বললেন, “অনেক রাত হয়ে গেল।”
কিকিরা বললেন, “রঘুপতিবাবু আপনি সব বলেও একটা কথা বললেন না। মূর্তিটা আপনি বোধ হয় কমলাপতিকে দিতে চাননি। আপনি চেয়েছিলেন সে ওই মূর্তি নিতে আসুক কিন্তু নিয়ে যেতে যেন না পারে।”
রঘুপতি অপলকে চেয়ে থাকলেন।
কিকিরা বললেন, “আপনার রুগ্ন পঙ্গু ছেলেকে যে ভয় দেখায় সে নিশ্চয় অমানুষ পশু। কাকা হয়েও সে এমন কাজ করতে পারে! আমার মনে হয় আপনি ঠিক করেছিলেন কমলাপতি মূর্তিটা নিতে এলে আপনি তাকে গুলি করে মারবেন। আপনার সৌভাগ্য এই কাজটা আপনাকে আর করতে হল না। কমলাপতির সঙ্গী সেই গুণ্ডাটাই করে গেল।”
রঘুপতি নির্বাক। তাঁর সমস্ত মুখ যেন আবেগে থরথর করে কেঁপে উঠছিল। তিনি কিছু বলতে পারছিলেন না।
২.২ জাদুকরের রহস্যময় মৃত্যু
ট্রাম থেকে নেমেই তারাপদ বলল, “নে, হয়ে গেল!” হয়ে গেল মানে চোখের পলকে সব অন্ধকার; আলো চলে গেল। লোডশেডিং।
ভর সন্ধেবেলায় এমন ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেলে কারই বা ভাল লাগে! চন্দন বলল, “কলকাতায় আর থাকা যায় না, বুঝলি! এর চেয়ে গ্রামে গিয়ে থাকা ভাল।”
হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় তারাপদ পাশের লোকটিকে খেয়াল করতে পারেনি। হুমড়ি খেয়ে তার গায়ে পড়ছিল। সামলে নিল কোনোরকমে। লোকটি কিছু বলল। তারাপদ ভাল করে শুনতে পায়নি।
চন্দন বলল, “তোকে কী বলল শুনলি?”
“কী?”
“অন্ধ বলল। চীনে ভাষায়।”
“তুই চীনে ভাষা বুঝিস?”
“একটু একটু বুঝতে পারি। আমাদের হাসপাতালে চীনে রোগী দু’দশটা রোজই আসে। আন্দাজ করে নিতে পারি,” বলে চন্দন হেসে উঠল।
তারাপদ বুঝতে পারল, চন্দন ঠাট্টা করছে। ঠাট্টাই করুক আর যাই করুক, এই পাড়াটায় চীনেদের অভাব নেই। তবে পাড়াটা চীনেদের নয়। অ্যাংলো ইন্ডিয়ানই বেশি। কিছু চীনে। দুদশ ঘর পার্সি বোম্বাইঅলা। বেশ কিছু মুসলমান। পাঁচমেশালি পাড়া। এদের কার কী পেশা বোঝা যায় না। তবে চেহারা দেখলে মনে হয়, গতরে-খাটা মানুষ। ব্যবসাপত্রও করে।
চন্দন বলল, “হ্যাঁ রে তারা, কিকিরা ফিরেছেন তো? না, গিয়ে দেখব, দরজায় তালা ঝুলছে?”
তারাপদ বলল, “ফেরারই কথা। চিঠিতে লিখেছেন, দশ তারিখে ফিরছেন। আজ তেরো তারিখ।“
“চল, দেখি।…আচ্ছা, এত জায়গা থাকতে কিকিরার কাশীতে বেড়াতে যাবার কী দরকার ছিল বলতে পারিস?”
“বেড়াবার আবার দরকার থাকে নাকি! এমনি গিয়েছিলেন।”
ট্রাম রাস্তা থেকে কিকিরার বাড়ি দুর নয়। তবে গলিতে ঢুকতে হয়। বার তিনেক ডাইনে-বাঁয়ে পাক খেয়ে পৌঁছতে হয় কিকিরার বাড়িতে। চন্দনরা গলিতে ঢোকার আগেই আলো দেখতে পাচ্ছিল; নানা ধরনের বাতি জ্বলে উঠছে। কেউ জ্বালিয়েছে লণ্ঠন, কেউ মোমবাতি। কোথাও বা কাবাইডের লক্ষ জ্বলতে শুরু করেছে। ইভাটারের আলোও চোখে পড়ছিল দু’এক জায়গায়।
গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চন্দন বলল, “কিকিরা এই পাড়াটা পালটে নিতে পারেন। এখানে এলেই আমার ভাই গুমঘর লেনের কথা মনে পড়ে।”
“গুমঘর লেন! কোথায় সেটা?”
“চাঁদনির দিকে। অদ্ভুত নাম। তাই না?”
“এরকম নাম হবার কারণ?”
“কে জানে! আমার মনে হয়, পুরনো কলকাতায় ওখানে একটা মর্গ ছিল। লাশকাটা ঘর। বোধহয় সেই থেকে ওরকম নাম হয়েছে। কে জানে!”
তারাপদ মজার গলায় বলল, “কলকাতায় অদ্ভুত অদ্ভুত নামের গলি আছে। কিকিরার নামেও একটা গলি করে দেওয়া যেতে পারে, কী বলিস, চাঁদু?” বলে হেসে উঠল।
সামান্য এগিয়েই কিকিরার বাড়ি। নিচের তলায় মুসলমান কারিগররা দরজিগিরি করছে। লণ্ঠন ঝুলছে এখানে-ওখানে। সেলাইমেশিনের শব্দ। কেউ-কেউ গোছগাছ সেরে নিচ্ছে; বোধহয় দোকান বন্ধ করবে। ডান দিকে চাতাল। চাতালের শেষ প্রান্তে দোতলার সিঁড়ি।
