রঘুপতি বললেন, “কে বলল? আপনারা কি দেখেছেন ওই জায়গাটা?”
কিকিরা বললেন, “আমরা ওখানে গিয়ে সব দেখেছি। তারাপদ-চন্দনকে জিজ্ঞেস করুন। আমরা যতটা পেরেছি দেখেছি সামনে গিয়ে, খুঁজেছি সমস্ত।” বলে কিকিরা তাঁদের ঘোরাফেরা, খোঁজখবর করার কথা বললেন সবিস্তারে। কী কী পেয়েছেন সেখানে হাঁড়ি, দাড়ি, খইনির ছেঁড়া প্যাকেট, চাবির রিংয়ের চাকতি।
রঘুপতি যেন কোনো গল্পকথা শুনছেন, এমনভাবে তাকিয়ে থাকলেন।
খানিকক্ষণ চুপচাপ থাকার কিকিরা বললেন, “শুধু দুটো ব্যাপার ধরতে পারছি না।”
“কী?”
“যে-লোকটা মারা গেল সে কে?” বলে কিকিরা রঘুপতির চোখে-চোখে তাকিয়ে থাকলেন সামান্য সময়, যেন জবাবটা অন্য পক্ষই দেবেন, “কমলাপতি?”
রঘুপতি চুপ করে আছেন দেখে তারাপদ বলল, “কমলাপতি বলেই মনে হয়।”
কিকিরা বললেন, “লোকটা যেখানে মারা যায়–চুনিয়া নদীতে, পাথরের ওপর–তার বিশ-পঁচিশ গজ দূরে আমি একটা ক্যাম্বিসের ব্যাগ কুড়িয়ে পেয়েছিলুম। ব্যাগের মধ্যে ভারী এই হাতুড়ি ছিল। এটা কোথা থেকে এল?”
রঘুপতি এবারও কোনো কথা বললেন না।
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে কিকিরা রঘুপতিকে বললেন, “আপনি সব জানেন। আমাদের বলছেন না। রঘুপতিবাবু, আমরা পুলিশের লোক নই। গোপবাবু আমাকে ধরে বেঁধে এখানে পাঠিয়েছেন। আপনাকে সাহায্য করতেই আমি এসেছিলুম।”
রঘুপতি যেন খানিকটা চঞ্চল হলেন। তাকালেন। মুখ নিচু করলেন আবার। চুপচাপ। নিজের মনে মাথা নাড়লেন। মুখ তুললেন। বললেন, “যে মারা গিয়েছে সে কমলাপতি।” বলে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে ভারী গলায় আবার বললেন, “আমি তাকে দেখিনি। তবু বলছি সে কমলাপতি। আর সে কমলাপতিকে মেরেছে সে তার লোক।”
কিকিরা রঘুপতিকে দেখছিলেন। “আপনি কমলাপতিকে দেখেননি। তবু একথা বলছেন কেমন করে?”
“পুজনকে আপনারা দেখেছেন। আমি তাকে খবর করতে পাঠিয়েছিলাম। সে খোঁজখবর করে এসে আমায় বলেছে।”
“কমলাপতির বন্ধুটি কে?”
“জানি না। বেনারস থেকে নিয়ে এসেছিল। ভাড়াটে গুণ্ডা হয়ত।”
“সে কেন কমলাপতিকে খুন করবে?”
“কেন করতে তার জবাব আমি দিতে পারব না। তবে ওই মূর্তির জন্যই। মনে হয়। কমলাপতি বোধ হয় তাকে বলেছিল–মূর্তিটা খুব দামি। লাখ-লাখ টাকা হাতে আসবে মূর্তিটা পেলে। এলে ভাগাভাগি করা যাবে।”
“কিন্তু মূর্তি তো আপনার কাছে। চুরি না করা পর্যন্ত মূর্তি পাবে কোথায়?”
“চুরি করতে আসবে জেনেই আমি মূর্তিটা ছবির ঘরে এনে রেখেছিলাম।..ওটা তো পাশের ঘরে চোরা সিন্দুকের মধ্যে থাকার কথা।”
“আপনি কি চোর ধরতে চাইছিলেন?”
“না। আমি চাইছিলাম চোর ওটা নিয়ে যাক।”
কিকিরা অবাক। তারাপদ আর চন্দনও কিছু বুঝতে না পেরে রঘুপতির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল।
রঘুপতি নিজেই বললেন, “কমলাপতিকে যেদিন মরে পড়ে থাকতে দেখা যায়, তার আগের দিন রাত্তিরে চোর এসেছিল এবাড়িতে। আমার কুকুরটাকে বিষ খাইয়ে দিয়েছিল রুটির টুকরোর সঙ্গে। কুকুরটা মারা যায় পরের পরের দিন। বুনো কুকুর বলে লড়েছিল দুদিন, নয়ত আগেই মারা যেত।”
চন্দন বলল, “আপনি কি বলতে চাইছেন কমলাপতিকে খুন করে সেদিন রাত্তিরেই তার বন্ধু এ বাড়িতে মূর্তি চুরি করতে এসেছিল?”
“হ্যাঁ।”
“এর কোনো প্রমাণ আছে?”
“কুকুর ছাড়াও প্রমাণ আছে। বাড়ির কাজের লোকরা জেগে উঠেছিল…। তারা একটা লোককে পালিয়ে যেতে দেখেছে।”
কিকিরা বললেন, “একটা কথা, রঘুপতিবাবু। যে-মূর্তি চোরাই সিন্দুকের মধ্যে ছিল সেই মূর্তি আপনি ছবিঘরে এনে রাখলেন কেন? তা ছাড়া আপনার ছবিঘরের দরজার তালা ভেঙে ভেতরে মূর্তি চুরি করবে–এ প্রায় দুঃসাধ্য কর্ম।“
রঘুপতি বললেন, “আপনাদের কাছে দুঃসাধ্য কর্ম। এ বাড়ির খোঁজখবর যারা ভাল রাখে তাদের কাছে নয়। ছবিঘরে যাওয়ার একটা অন্য পথও আছে। পেছনদিক থেকে। ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে ওঠা যায়। উঠে একটা মামুলি দরজা পাবে। পাকা চোরের পক্ষে সে-দরজা ভাঙা সহজ।…কমলাপতি এ-সব জানত। তার বাবার কাছে শুনেছে। সে এ বাড়ির নাড়িনক্ষত্র জেনে নিয়েছিল।”
“কিন্তু আপনি কি তাকে মূর্তিটা দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন?”
রঘুপতি কিছু বললেন না প্রথমে। তারপর দ্বিধার সঙ্গে বললেন, “আমি একটা কথা আপনাদের ঠিক বলিনি। আমি বলেছিলাম কমলাপতি আমাকে জানায়নি সে এখানে আসছে। না না।…। সে জানিয়েছিল। আমিও তাকে মূর্তিটা দিতে চেয়েছিলাম।”
“কিন্তু কেন?”
রঘুপতি আর কথা বলেন না। তাঁর গলার কাছটা ফুলে উঠল, মুখের মাংসগুলো কাঁপছিল। নিজেকে যেন প্রাণপণে সংযত করার চেষ্টা করছিলেন। শেষে বললেন, “আমি আপনাদের সব কথা বলিনি, বলতে চাইনি। এখন আর না বলে উপায় নেই।…ওই কমলাপতি আমাকে কলকাতায় চিঠি লিখে লিখে বিরক্ত করছিল। ভয় দেখাচ্ছিল। শেষে ও আমার ছোট ছেলেকে চিঠি লিখল। সে বেচারি পঙ্গু। পোলিও ভিকটিম। কমলাপতি তাকে জীবনের ভয় দেখাল। নিজের রুগ্ন ছেলেটাকে প্রাচে বাঁচাতে আমি শেষ পর্যন্ত তার কথায় রাজি হলাম। আমার লোক তাকে জানিয়ে দিল শীতকালে যখন আমি ময়ূরগঞ্জে আসব–তখন সে যোগাযোগ করতে পারে। তবে লুকিয়ে। সরাসরি আমি তার মুখ দেখতে চাই না, তার হাতে ওই মূর্তিও তুলে দিতে পারব না। সে ক্ষমতা আমার নেই। শচীভাইয়ের তৈরি মূর্তি বাড়ির জিনিস–যতই তা অমঙ্গলের হোক–আমি চোরবদমাশ নচ্ছারের হাতে তুলে দিতে পারব না বাড়ির জিনিস। সে নিজে এসে নিয়ে যেতে পারে নিয়ে যাক। আমি অন্তত বাধা দেব না।”
