“জানি না। হয় না হয়ত। আমার মনে হয়, হয়েছে।”
“তারপর?”
“আমার আর-এক কাকা বিশ্বপতি আমাদের সঙ্গে ঝগড়াঝাটি করে বাড়ি ছেড়ে চলে যান।”
“কেন?”
“ওই মূর্তির জন্য।…সে মূর্তিটি নিজের জন্য চেয়েছিল।”
“আপনারা দেননি?”
“না।”
“মৃর্তিটি অমঙ্গলের বলছেন–তা হলে দিলেন না কেন?”
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে রঘুপতি বললেন, “ওই মূর্তির মধ্যে আগুনের যে সাতটি শিখা আছে–সেই শিখার তলায় সাতটি রত্ন লুকানো রয়েছে–গালার মধ্যে। এই সাতটি রত্ন আমাদের পূর্বপুরুষদের সঞ্চয়। প্রতিটি শিখার যেমন রং, রত্নগুলিরও রং সেইরকম। এক-একটি রত্নের দাম আজকের দিনে অনেক। …বিশ্বপতি মূর্তিটা গলিয়ে নষ্ট করে রত্নগুলি নিয়ে নিত।’
কিকিরা বললেন, “শচীপতিকে এইসব রত্ন কে দিয়েছিল?”
“বাবা।”
“কেন?”
“আমি জানি না। বেধ হয় লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। কিংবা শচীভাই নিজেই চেয়ে নিয়েছিল। অসুস্থ ভাইকে বাবা কষ্ট দিতে চাননি। শচীভাইয়ের বড় জেদ ছিল। তা ছাড়া সে হয়ত নতুন করে আমাদের উপাস্য কুল-দেবতার মূর্তি তৈরি করতে চেয়েছিল বলেই।”
“আপনি এ-সব জানতেন না?”
“আগে জানতাম না। বাবা যখন পাগল হয়ে যান তখন বলেছিলেন।”
কিকিরা কী ভেবে বললেন, “ওগুলো কি এখনো আছে?”
রঘুপতি যেন বিষণ্ণ মুখে হাসলেন। “আছে।”
তারাপদ আর চন্দন একসঙ্গে হঠাৎ বলে বসল, “বিশ্বপতি কোথায় আছেন?”
“মারা গিয়েছেন। কাশীর গঙ্গায় ডুবে গিয়েছিলেন।”
“কতদিন আগে?”
“বছর দশেক। “
কিকিরা হঠাৎ বললেন, “কমলাপতি রাঠোর কে?”
“আমার ভাই। বিশ্বপতির ছেলে।”
“যে-সাধু আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটার খেলা দেখাত, সে কি কমলাপতি?”
“হ্যাঁ। আমার তাই মনে হয়। …আমি শুনেছিলাম কমলাপতি অনেক অসাধ্য কাজ করতে শিখেছে। তন্ত্রমন্ত্র জানে। আগুনের মাঝখানে সে দাঁড়িয়ে থাকত-হাঁটত। আমার মনে হয়েছিল, কমলাপতিই আমাকে ভয় দেখিয়ে মূর্তিটি নিতে এসেছে।”
“এরকম মনে হত কেন?”
“হত। দূর থেকে যখন ওকে আগুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম–তখন ওই মূর্তির কথাই মনে হত।”
কিকিরা এবার হাসলেন। বললেন, “রঘুপতিবাবু, আপনি ভুল করেছেন। আগুনের মাঝখানে দাঁড়ানো, তার ওপর দিয়ে হাঁটা-সাধারণ একটা চালাকির খেলা। তন্ত্রমন্ত্র ওতে নেই।”
“খেলা! কী বলছেন?”
“খেলা–ছেলেমানুষি খেলা। আপনাকে আমি কালই দেখাব কেমন করে এই খেলা খেলতে হয়। …আচ্ছা আজই একটু দেখাই,” বলে কিকিরা উঠে পড়লেন। “আমি আসছি, দু-পাঁচ মিনিট।”
কিকিরা চলে গেলেন।
তারাপদ বলল, “কমলাপতি আপনাকে কিছু জানায়নি? এখানে আসবে?”
“না।”
“আপনি তার খোঁজখবর করতেন।”
“না। সম্পর্ক ওরা রাখেনি। আমিও নয়। তবে মাস কয়েক আগে কে একজন খবর দিল, কমলাপতিদের ব্যবসা ডুবে গিয়েছে। অজস্র দেনা। পুলিশ নাকি তাকে ধরেও নিয়ে গিয়েছিল বার কয়েক, জাল-জালিয়াতির জন্য।”
চন্দন বলল, “কমলাপতির টাকার খুব দরকার পড়েছিল মনে হচ্ছে।”
“বোধ হয়।”
কিকিরা ফিরে এলেন। দু’হাতে দুটি হাঁড়ি। পায়ে চটি।
হাঁড়ি দুটো চন্দনকে রাখতে দিলেন। দিয়ে একটা হাঁড়ি থেকে কিছু সাদা গুঁড়ো নিয়ে ডান পায়ের পাতার চেটোয় ছড়িয়ে নিলেন ভাল করে। বললেন, “আমি আগেই প্রিপেয়ার হয়ে এসেছি। তবু পায়ে চটিটা ছিল। আবার একবার লাগিয়ে নিলাম।” বলে কাঠকয়লার চুল্লির কাছে এগিয়ে গেলেন। চুল্লির আগুন নিভে আসার মতন। তাত আছে সামান্য।
কিকিরা চুল্লির ওপর পা রাখলেন, তুললেন। আবার রাখলেন, তুললেন। তারপর আরও একটু রাখলেন।
রঘুপতি অবাক হয়ে বললেন, “আগুন নেই?”
“দেখুন।”
উঠে গিয়ে দেখলেন রঘুপতি। হাত বাড়িয়ে তাত অনুভব করলেন।
কিকিরা বললেন, “আগুনের আঁচ মরে গিয়েছে। তবু যতটুকু আছে–আপনি হাত চেপে রাখতে পারবেন না। আমি পারব।”।
“কেমন করে?”
কিকিরা হাঁড়ি দুটো দেখালেন। বললেন, “এই দুটো হাঁড়িতে কী আছে জানেন? এটাতে রয়েছে ফটকিরি আর নুনের গুঁড়ো। পাউডার করে মিশিয়ে রাখা আছে। আর এই হাঁড়িটায় আছে নুন। আগুনের খেলা দেখাবার সহজ সস্তা দুটো জিনিস। তবে এ দুটো ছাড়া অন্য একটা জিনিস এখানে ছিল রঘুপতিবাবু–যেটা আপনি ধরতে পারেননি।” বলে কিকিরা ঘরের অন্যপাশে সরে গেলেন।
সামান্য দাঁড়িয়ে থেকে কিকিরা হাত দিয়ে সোফা সেটি দেখালেন তাঁর সামনের। বললেন, “ধরে নিন–এই যে সোফাগুলো–এগুলো এক-একটা বড় পাথরের চাঁই। পাহাড়ে নদীর পাড়ে যেমন দেখেন। এই বড় বড় পাথরগুলো যদি আমার সামনে থাকে, আশেপাশেও থাকে আর আমি তার আড়ালে বা মাঝখানে থাকি-”আপনি আমার পা থেকে হাঁটু পর্যন্ত দেখতে পাবেন না। এখন এই ধরনের পাথরগুলোর ওপর আগুন জ্বালানো হল। পাশাপশি, সামান্য ছাড়াছাড়া ভাবে আগুন জ্বালানে পাথরের মাথায়। আগুন জ্বলতে লাগল। আমি থাকলাম পাথরের আড়ালে। সামনে থেকে সামান্য দূর থেকে অবশ্য কেউ যদি আমাকে দেখে–তার মনে হবে আমি আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি।”
রঘুপতি তাকিয়ে থাকলেন। তাঁর মাথায় যেন কিছুই ঢুকছিল না।
কিকিরা হেসে বললেন, “কলকাতার স্টেজে সীতার অগ্নিপরীক্ষা দেখেননি? এটাও হল অগ্নিলীলা।”
“কিন্তু আমি হাঁটতে দেখেছি।”
“আপনি দেখেননি। ওটা আপনার চোখের ভুল। যদি দেখেও থাকেন–তা হলেও ক্ষতি নেই। ধরুন আপনি রয়েছেন পাথরগুলোর আড়ালে। সামনের পাথরগুলোর মাথায় আগুন জ্বলছে জ্বলুক। আপনি যেখানে আছেন সেখানে কিছু কাঠকুটো পাতা সাজিয়ে নিন। সামনের দিকে উঁচু করে পেছনের দিকে নিচু করে। মাঝখানে কাঠকুটো কম রাখবেন। এবার আগুন জ্বালিয়ে দিন। সামনের দিকের কাঠকুটোয় আগুন জোর জ্বলতে থাকবে-পেছনের দিকের কাঠকুঠো ঘাসপাতা টিমটিম করে জ্বলবে। তফাত ওই টিমটিমে আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটুন, একটু তাড়াতাড়ি–কি হবে না আপনার প্র্যাকটিসের ব্যাপার। আর সেইসঙ্গে নুনের গুঁড়ো ছড়াতে থাকুন আগুনে। দেখবেন আগুন নিস্তেজ হয়ে আসছে। এই খেলাটা খুব সাধারণ।…আপনি যা দেখেছেন সেটা খেলা।”
