কিকিরাররা কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকলেন। বিরজু একপাশ দিয়ে এগিয়ে গেল আলো হাতে। রঘুপতি তাকে বলে দিলেন–আলোটা কোথায় রাখতে হবে। “তুমি যাও।”
বিরজু চলে গেল।
তারাপদও এক জায়গায় আলো রাখল।
রঘুপতি বললেন, “এই ঘর দুটো আমার কাকার ছিল। শচীপতির। কাকাকে আমরা শচীভাই বলতাম। ছেলেবেলা থেকেই। বাবা শচীভাই বলে ডাকতেন। আমরাও বলতাম। কাকার ছবি-টবি শেষ পর্যন্ত যা ছিল–এখানে রেখে দিয়েছি। দু-একটা এ বাড়িতে টাঙানো আছে। আমার বসার ঘরেও আছে। কলকাতার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছি কয়েকটা।”
কিকিরা ঘরের চারদিক দেখছিলেন। ঘর বেশ বড়। দক্ষিণের দিকটা বোধ হয় আধখানা চাঁদের মতন গোল বাঁকানো। বড়বড় দরজা-জানলা। জানলার খড়খড়ি আর শার্সি বন্ধ। পাশের ঘরে যাওয়ার দরজাও বন্ধ ছিল।
এতবড় ঘরে যত ছবি থাকার কথা ছিল, তা নেই সাজানো-গোছানোও নয় ছবিগুলো। পড়ে আছে এখানে ওখানে। দু চারটে দেওয়ালে ঝোলানো। কোনো কোনো ছবি একটা লম্বা টেবিলের ওপর দাঁড় করানো, দেওয়ালে হেলান দিয়ে।
কিকিরা বললেন, “ওঁর ছবি তো খুব বেশি নেই!”
“নষ্ট হয়ে গিয়েছে, ও নিজেই কত বিলিয়ে দিয়েছে…। আর এসব কে দেখাশোনা করবে, যত্ন করবে। আমি তো বছরে দু-একবার আসি মাত্র।”
তারাপদ আর চন্দন ছবি দেখছিল। দাঁড়াচ্ছিল কোথাও, আবার দু-পা এগিয়ে যাচ্ছিল। ঘরে এখন যা আলো তাতে বাস্তবিকই কোনো ছবি ভাল করে দেখা যায় না। সাজানো-গোছানোও নেই। তবে একটা মস্ত সুবিধে এই যে, শচীপতি বেশিরভাগই নিসর্গচিত্র এঁকেছেন, আর স্টিল লাইফ। নিসর্গচিত্রগুলো বড়বড়। বিরাট অশ্বত্থাগাছের ওপাধের ধুধু মাঠ, একটা হয়ত গোরুর গাড়ি। বেশ লাগে। জঙ্গলের ছবিই বেশি। পাহাড়, গাছপালা, নদী, পুকুর, সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত।
তারাপদ ছবি দেখতে-দেখতে বলল, “স্টিল লাইফ বলে ওকে–ওই যে ফুল…!”
“হ্যাঁ।”
“ভালই। ভদ্রলোকের হাত ছিল।”
কিকিরাও ছবি দেখতে-দেখতে কথা বলছিলেন রঘুপতির সঙ্গে।
হঠাৎ চন্দন কেমন শব্দ করে উঠল।
কিকিরা ঘুরে দাঁড়ালেন।
কিছু বলতে গিয়ে চন্দন নিজেকে সামলে নিল।
তারাপদও দাঁড়িয়ে পড়েছিল।
কিকিরাও ঘুরে এলেন। তাকালেন। তাকিয়ে কেমন অপলক চোখে দাঁড়িয়ে থাকলেন।
কাচের একটা চৌখুপি বা বাক্স। হাত দেড়েক লম্বায়, চওড়ায় হয়ত হাতখানেকের মতন। তার মধ্যে এক অদ্ভুত মূর্তি।
“ওই মুর্তিটা…!”
রঘুপতি তাঁর হাতের টর্চের উজ্জ্বল আলো কাচের ওপর ফেললেন। ভেতরের মূর্তিটা যেন কেঁপে গেল।
কিকিরা অবাক হয়ে মূর্তিটা দেখছিলেন।
রঘুপতি বললেন, “অগ্নিমূর্তি!”
“অগ্নিমূর্তি?”
“হ্যাঁ। ওই তো দেখছেন। পরনে কৃষ্ণ বস্ত্র। হাতে ধুম্রপতাকা, জ্বলন্ত বর্শা। “
“চারটে হাত?”
“হ্যাঁ। হরিবংশের বর্ণনা মতে অগ্নির ওই রূপ। কৃষ্ণবস্ত্রাবৃত, ধুম্রপতাকা, জ্বলন্ত বর্শা হাতে দেবতা অগ্নি। ওঁর চারপাশে আগুনের সাতটি শিখা।”
“একটা ছাগলের মুণ্ডু রয়েছে নিচে।”
“অগ্নির বাহন ছাগ।”
কিকিরা বুঝতে পারছিলেন না এই মূর্তিটিকে তিনি কী বলবেন! অসামান্য, সুন্দর, না ভীতিপদ। আগুনের সাতটি শিখার রং এক নয়, কোনোটা ঘন লাল, কোনোটা আগুনে লাল, কোনোটা তামাটে, কোনোটা সাদা-মেশানো। অগ্নিমূর্তির বেশ একেবারে কালো। চার হাতের এক হাতে পতাকা! ধোঁয়া উঠছে যেন পতাকার মাথায়, বর্শা লাল, অন্য দুই হাতের একটিতে শাঁখ, অন্যটিতে কমণ্ডলু।
তারাপদ আর চন্দন কোনো কথা বলছি না।
শেষ পর্যন্ত কিকিরাই কথা বললেন, “এই মূর্তি কিসের তৈরি?”
“তা আমি ঠিক বলতে পারব না। শচীভাই নানারকম জিনিস মিশিয়ে করেছিল। তবে গালাই বেশি।”
“গালা?”
“কালো লাল গালা। সবুজ নীল গালাও আছে। কেমন করে এসমস্ত গালা সে জুটিয়েছিল, বা নিজেই রং বানিয়েছিল আমি জানি না।”
“এই মূর্তি কি এখানেই আছে বরাবর?”
“না।”
“কোথায় ছিল?”
রঘুপতি ইতস্তত করে বললেন, “পাশের ঘরের এক চোরা সিন্দুকে।”
“আপনি এখানে নিয়ে এসে রেখেছেন।”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
রঘুপতি হঠাৎ যেন কেমন হয়ে গেলেন। স্তব্ধ, গম্ভীর, বিষণ্ণ। নির্বাক মানুষটি যেন ভীষণ অন্যমনস্ক।
অনেকক্ষণ পরে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, “চলুন বাইরে যাই।”
কিকিরা কিছু বলার আগেই রঘুপতি ঘুরে দাঁড়ালেন।
উনি চলে যাচ্ছেন দেখে কিকিরা তারাপদদের ইশারা করলেন বাতি দুটো তুলে নিতে।
বাইরে এসে দাঁড়ালেন কিকিরারা।
রঘুপতি দরজা বন্ধ করতে লাগলেন সাবধানে।
.
১০.
বসার ঘরে এসে আবার বসলেন চারজনে।
চুপচাপ। রঘুপতিকে বিমর্ষ, ভারাক্রান্ত দেখাচ্ছিল।
কিকিরাই শেষ পর্যন্ত কথা বললেন, “রঘুপতিবাবু, ওই মূর্তি কি আপনাদের…”।
রঘুপতি বললেন, “আমরা অগ্নি-উপাসক। আমাদের কুলদেবতা অগ্নি। যে-মূর্তি আমরা পুজো করি সেই মূর্তি আমার কলকাতার বাড়িতে আছে। সেই মূর্তি এক ঋষিপুরুষের। তাঁর দুটি হাত। এক হাতে বজ্র, অন্য হাতে ঘৃতপাত্র। পরনে তাঁর সন্ন্যাসীর বেশভূষা। তাঁর পায়ের তলায় আগুনের শিখা।” বলে রঘুপতি চুপ করে থাকলেন সময়। আবার বললেন, “এখানে যে মূর্তিটি দেখলেন–এটা শচীভাই নিজের খেয়ালে গড়েছিল। তার মনের মতন করে। এই মূর্তি ভয়ঙ্কর, অভিশপ্ত। এতে আমাদের অমঙ্গল হয়েছে। শচীভাই মারা গেল, আমার ছোটছেলে হল পঙ্গু। বাবা শেষ বয়সে উন্মাদ হয়ে আত্মহত্যা করলেন।
কিকিরা বললেন, “মূর্তির জন্য কি এমন হয়!”
