“আমরা জিজ্ঞেসই করলাম না, তিনি বলবেন?”
“বলতে পারতেন। এত কথা যখন বলেছেন–হয়ত নিজের থেকেই বলে ফেলতেন।”
খানিকটা চুপচাপ থাকার পর তারাপদ বলল, “কিকিরা, আমার মনে হচ্ছে, পাহাড়ের মাথায় আগুন জ্বালিয়ে হেঁটে বেড়ানোর ব্যাপারটার উদ্দেশ্যই ছিল রঘুপতি। রঘুপতিকে ওটা দেখানো হত।”
“কী উদ্দেশ্য?” চন্দন বলল।
“রঘুপতিকে কিছু মনে করিয়ে দেওয়া।”
“সেটা কী?”
কিকিরা কী ভাবছিলেন, হঠাৎ বললেন, “স্যালে উড, ওই যে রাজার ছেলেকী নাম–অগ্নিজিহু–যার যক্ষ্মা হয়েছিল, তাকে তার মন্ত্রীরা বনের মধ্যে নির্জনে নিয়ে গিয়ে আগুনের মধ্যে ফেলে দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিল, তাই না বললেন মাস্টারমশাই?”
“হ্যাঁ।”
“ শচীপতিরও যক্ষ্মা হয়েছিল। তাকে ষড়যন্ত্র করে কেউ পুড়িয়ে মারেনি তো?”
“বলেন কী! একজন টিবি পেশেন্টকে পুড়িয়ে মারা! এত বড় নৃশংস কাজ কে করবে!”
কিকিরা কোনো জবাব দিতে পারলেন না। পরে নিচু গলায় বললেন, “সংসারে আগুন তো অনেক রকম আছে। শিখাও। শোক, তাপর, রুগ্নতা, ব্যর্থতাকত কী? তারও হয়ত সাতটি শিখটা।”
অনেকক্ষণ পরে চন্দন বলল, “কিকিরা, সেই মূর্তিটি কোথায়? আমরা যদি দেখতে পেতাম।”
কিকিরা বললেন, “পারো!..দেখি আজ একবার চেষ্টা করব।”
.
দুপুর বেলায় তারাপদ ধরল বিরজুকে। পাঁচটা এলোমেলো কথা, খোশ গল্পের পর তারাপদ বলল, “বিরজু, তোমাদের এখানে যে তসবির ঘরটা আছে–সেটা কোথায়?” বলেই চালাকি করে আবার বলল, “রঘুপতিবাবু তসবির ঘরের গল্প করছিলেন।”
বিরজু বলল, “ওধারে আছে, ডাইনে। দক্ষিণ পাশে। বাবুর ঘরের গা দিয়ে বারান্দা আছে বারান্দার শেষ ঘরে।”
“আমি তসবির দেখতে ভালবাসি। বাবুকে বলব!”
“ঘর বনধ। তালা লাগানো আছে। বাবুকে বলবেন।”
“তুমি ও-ঘরে গিয়েছ?”
“বাবুর সাথ গিয়েছি।”
“বাবু বুঝি প্রায়ই তসবির ঘরে যান?”
“না। কলকাতা থেকে এলে একদিন-দুদিন যান?”
“ঘর সাফ হয় না?”
“চাবি বাবুর কাছে থাকে। দোতলার ইধারকার সব ঘরের চাবি বাবুর কাছে। তিনি কলকাতা থেকে এলে আমরা ঘর সাফা করি।”
তারাপদ আর কিছু বলল না। বুঝতে পারল, রঘুপতি তাঁর দিককার ঘরদোরের চাবি এখানে ফেলে রেখে যান না। ছবি রাখা ঘরের চাবিও থাকে তাঁর কাছে। এতে অবশ্য দোষের কিছু নেই। ভাইয়ের আঁকা ছবি তো তিনি বাগানে ফেলে রাখতে পারেন না। একটা ঘরে রেখে দিয়েছেন। যত্ন করেই হোক বা অযত্নে।
যদিও তারাপদ দেখেনি, তবু তার মনে হল ছবি-ঘরের তালাটা নিশ্চয় মামুলি নয়। রঘুপতি বৈষয়িক লোক, তিনি নিশ্চয় সস্তা বাজে তালা তাঁর নিজের মহলের দরজায় ঝুলিয়ে কলকাতায় গিয়ে বসে থাকেন না।
কিকিরা যদি কোনো ভেলকি দেখিয়ে তালাটা খুলতে পারতেন!
তবে তা সম্ভব নয়। গৃহস্বামীর ঘরের সামনে দিয়ে না গেলে ছবিঘরে যাওয়া যায় না। আর রঘুপতি তো এখন সারাদিন বাড়িতে। হয় তাঁর ঘরে না হয় বসার ঘরে। নিচেও বড় একটা নামেন না।
কিকিরার কাছে ফিরে এসে তারাপদ বলল, “কিকিরা, শচীপতিবাবুর ছবিঘরে একবার যাওয়া দরকার।”
“’হুঁ”
“আপনি কিছু ভেবেছেন?”
“তুমি ভাবলে কিছু?”
তারাপদ বিরজুর কথা বলল। বিরজুর কাছ থেকে সে যা শুনেছে।
কিকিরা সব শুনলেন। তারপর বললেন, “আজ সন্ধেবেলায় রঘুপতিবাবুকে দিয়েই ছবিঘর খুলিয়ে নেব।”
.
০৯.
বছরের শেষ দিনে শীতও পড়েছিল প্রচণ্ড। বইরের উত্তরে বাতাস এই সন্ধেতে মাঝে-মাঝে এমন করে বয়ে ঝড় উঠেছে। রঘুপতির বসার ঘরে কাঠ-চুল্লি জ্বলছিল অনেকক্ষণ ধরেই। ঘরটা মোেটামুটি আরামদায়ক হয়ে উঠেছে।
চা খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল।
চুরুট ধরাতে ধরাতে রঘুপতি বললেন, “ছবি দেখতে চান, দেখতে পারেন। তবে এই সন্ধেবেলায় কি ছবি দেখতে ভাল লাগবে! আলো নেই।”
কিকিরা বললেন, “এমনি আলোতেই দেখি। আপনার যদি কোনো অসুবিধে না থাকে…”
“না না, আমার আর কিসের অসুবিধে,” বলে সোফা থেকে উঠলেন, “দাঁড়ান–বিরজুকে আলো আনতে বলি। চাবিটাও নিয়ে আসি।”
রঘুপতি চলে গেলেন।
সামান্য অপেক্ষা করে কিকিরা নিচু গলায় বললেন, “তারাপদ, বোধ হয় ওঁর সুবিধেই হল।”
“কেন?”
“দিনের বেলার চেয়ে এই সন্ধেবেলায় টিমটিমে আলোয় ছবিঘর দেখালে সব তো আর চোখে পড়বে না। হয়ত এটাই ওঁর পক্ষে ভাল হল।”
চন্দন বলল, “আমরা দিনে দেখলেও পারতাম। রঘুপতিবাবুর কথা শুনে মনে হল, উনি ছবি দেখাতে অরাজি ছিলেন না।”
কিকিরা বললেন, “চলো, দেখা তো যাক কী আছে। একটু চোখ চেয়ে দেখো তোমরা। আমার একার নজরে…”
কথাটা শেষ হল না কিকিরার, রঘুপতির গলা শোনা গেল। কী যেন বলছিলেন তিনি বিরজুকে।
সামান্য পরে ঘরে এলেন রঘুপতি। “আসুন।”
কিকিরারা উঠলেন।
বসার ঘর, বারান্দা, বারান্দার পাশ দিয়ে ডাইনের গলি। শীতের হাওয়া এসে হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।
রঘুপতির হাতে চৌকো টর্চ। বেশ জোরালো আলো হয় টর্চটার। বিরজুর হাতে বড় বাতি, টেবিলে রাখার বাতি। তারাপদকেও একটা বাতি নিতে হয়েছে।
ছবিঘরের সামনে এসে রঘুপতি বললেন, “কদিন আগেই ঘর পরিষ্কার করিয়েছি, ভেতরের দরজা-জানলা বন্ধ থাকলেও নোংরা লাগবে না।”
কিকিরা নজর করে দেখলেন, তালাটা মামুলি নয়। ভাল তালা। সাধারণ তালা ছাড়াও ডোরলক রয়েছে।
দরজা খুলে রঘুপতি ডাকলেন, “আসুন।”
যে-কোনো বন্ধ ঘরের তালা খুলে ভেতরে ঢুকলেই কেমন লাগে। চাপা একটা গন্ধ যেন নিশ্বাস-প্রশ্বাস ভারী করে তোলে।
