“আর কোনো ভাই ছিল না?” তারাপদ বুদ্ধি করে জিজ্ঞেস করল।
“ছিল।…ব্যাপার কী জানো, ভাই আমি এখানে তিন-চার বছর করে থাকি–তারপর ট্রান্সফার হই। আবার দু-তিন জায়গার জল বদলে এখানেই ফিরে আসি। চারবার এই স্টেশনে পোস্টেড হয়েছি যা তোমাদের বলছিলাম। পুরনো জায়গায় দু-একবার অনেকেই ফিরে আসে। আমি চার-চারবার।”
“উনিও কি পতি ছিলেন?” চন্দন হালকাভাবে বলল, “এঁরা সবাই দেখছি। পতি। উমাপতি, রঘুপতি, শচীপতি..”
“ওটা ওঁদের বংশের নিয়ম বা সংস্কার।”
“তা হলে নৃসিংহ…?”
“নৃসিংহও হয়ত পতি ছিলেন। জানি না।”
কিকিরা বললেন, “উমাপতির ছোট ভাইয়ের নাম কী ছিল জানেন?”
“বিশ্বপতি!”
“বিশ্বপতি! ঠাকুরদেবতা দেবদেবী বাদ দিয়ে..”
“বিশ্বপতিও নারায়ণের নাম।”
“ও!”
ঘোষবাবু হঠাৎ কিকিরার দিকে তাকালেন। “আপনারা এসব কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন! রঘুপতিবাবুর বাড়িতে তো কিছু ঘটেনি। তা হলে?”
কিকিরা বললেন, “সেইটাই তো কথা মাস্টারমশাই! আমরাও ওই কথাটাই ভাবছি। রঘুপতিবাবুকে আমরা বলেছিও সে কথা। বলেছি, আপনি অস্থির হচ্ছেন কেন! যা ঘটার বাইরে ঘটেছে। আপনার সঙ্গে কিসের সম্পর্ক! উনি আমাদের কথায় কান করছেন না।”
“কেন?”
কিকিরা চালাকি করে বললেন, “উনি বলছেন, যে-লোকটা টিলার মাথায় দাঁড়িয়ে আগুনের ওপর হাঁটাচলা করত–সে নাকি ইচ্ছে করেই রঘুপতিবাবুকে সেটা দেখাতে চাইত।”
ঘোষবাবু পকেট থেকে সিগারেটের তামাক আর কাগজ বের করলেন। নিজের মনেই বললেন, “পুলিশকে সেকথা উনি বলেছেন?”
“জানি না। আমাদের বলেন।”
সিগারেট পাকাতে লাগলেন ঘোষবাবু। “আপনাদের বলেন!” বলেই চুপ করে গেলেন।
তারাপদ বলল, “বিশ্বপতিবাবু নাকি আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন?”
মাথা তুললেন ঘোষবাবু। “তাই শুনেছি।”
“কেন?”
“নিজেদের গণ্ডগোল। ফ্যামিলির ব্যাপার।”
“কিসের গণ্ডগোল! সম্পত্তি নিয়ে। সিগারেটটা পাকানো হয়ে গিয়েছিল। ধরিয়ে নিলেন ঘোষবাবু। বললেন, “ভাই, ধনী লোকের সঙ্গে কি আমাদের মেলে! আমরা দু-চার হাজার টাকার জন্য ঝগড়াঝাটি করি, দশ হাত জমি কোনো ভাই ভাগে বেশি পেল–তাই নিয়ে মামলা মোকদ্দমা করি। ওরা করে লাখ-লাখ টাকার জন্য। দু-চার লাখ টাকা ছেড়ে দেওয়া সামান্য কথা নয়। সম্পত্তি নিয়ে ঝগড়াঝাটি তো হতেই পারে।”
কিকিরা বললেন, “এ ছাড়া কি কিছু নেই মাস্টারমশাই?”
“কেন?”
“জিজ্ঞেস করছি।”
“আপনারা কে?”
কিকিরা থতমত খেয়ে গেলেন। বললেন, “আমরা আমরাই। আপনি বিশ্বাস করছেন না?”
ঘোষবাবু কথা বললেন না অনেকক্ষণ। তারপর বললেন, “রঘুপতিবাবু তাঁর বংশের কথা কিছু বলেননি?”
“তেমন কিছু বলেননি?”
“রঘুবংশের কথা?”
“রঘুবংশ…?”
“আপনারা জানেন না। পুরাণে আছে, রঘুবংশের শেষ রাজা ছিলেন অগ্নিবর্ণ। মহারাজ সুদর্শন অনেককাল রাজত্ব করার পর ছেলে অগ্নিবর্ণকে রাজ্যপাটে বসিয়ে স্বর্গে চলে যান। অগ্নিবর্ণ ছিলেন অলস, বিলাসী, আহাম্মক। বিলাসব্যসনেই তাঁর দিন কাটত। তাঁর হল যক্ষ্মা। রাজরোগ। তখন অগ্নিবর্ণের মন্ত্রীরা নিজেরা পরামর্শ করে রাজাকে হত্যা করাই ঠিক করে। একদিন বনের মধ্যে নির্জনে এক অগ্নিকুণ্ডের ওপর ফেলে দেওয়া হল রাজাকে। রানীকে বসানো হল সিংহাসনে। রানী সন্তানসম্ভবা।” ঘোষবাবু থামলেন; তাঁর হাতের পাকানো সিগারেটটা আবার ধরিয়ে নিলেন। বললেন “রঘুপতিবাবুরা মনে করেন–মানে তাঁদের আট পুরুষের ধারণা ছিল রানীর যথাসময়ে যে পুত্রসন্তান হল–তারই গোত্রের তাঁরা। অগ্নিজিহু তাঁদের উপাস্য দেবতা। অগ্নির সাতটি শিখা বা জিভ। সাতটি শিখার নামকরালী, ধামিনী, শ্বেতা, লোহিতা নীললোহিতা, পদ্মরাগ, সুবর্ণা। সপ্তজিহ্ অগ্নির এক নতুন মূর্তি করেছিলেন শচীপতি। পাথরের মূর্তি নয়, মাটিরও নয়। সেই আমি দেখেছি। এমন মূর্তি আর দেখিনি। দেখব না। ওই মূর্তিটি শেষ করার কিছুদিন পরে শচীপতিবাবু মারা যান।…শুনেছিলাম ওই মূর্তি নিয়ে পারিবারিক গণ্ডগোল হয়েছিল।…আমি তো ভাই বলতে পারব না, সেই অগ্নিজিহু মূর্তির সঙ্গে এই আগুনের কী সম্পর্ক রয়েছে। তবে থাকতেও পারে।”
তারাপদ চন্দন কিকিরা যেন স্তব্ধ হয়ে বসে থাকল। অগ্নিজিহু দেবতার সঙ্গে কি এই আগুনের কোনো সম্পর্ক আছে?
ঘোষবাবু বললেন, “আর আমি কিছু জানি না।”
.
০৮.
পরের দিন সকালটা কাছাকাছি ঘুরেফিরে কাটিয়ে দিলেন কিকিরা তারাপদদের নিয়ে। নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করলেন।
তারাপদ বলল, “কিকিরা, আমি কিন্তু এখনো অগাধ জলে।”
চন্দন বলল, “স্যার, আমি একবার ভেবেছিলাম, কমলাপতি রাঠোরের নামটা ঘোষবাবুর কাছে বলি। বললাম না। বললে কি তিনি চিনতে পারতেন?”
তারাপদ বলল, “আমার মনে ছিল। কিন্তু অগ্নিজি-তেই আমার মাথা গোলমাল করে দিল। লাইফে এরকম এক দেবতার কথা শুনিনি। সাতটা জিভ!”
কিকিরা বললেন, “যটাই জিভ হোক, ব্যাপারটা আগুন। আগুনের সঙ্গে রঘুপতিদের একটা সম্পর্ক রয়েছে দেখছি।”
“উপাস্য দেবতা যে!” চন্দন বলল।
“তা ঠিকই। আমাদের দেশের নানা ধরনের মানুষের নানা উপাস্য দেবতা রয়েছে। সূর্য চন্দ্র থেকে সাপ পর্যন্ত। শুনেছি, অগিও বৈদিক দেবতা।”
তারাপদ কতই না অবাক হয়েছে, বলল, “আপনি বেদও জানেন?”
“বিন্দুমাত্র না,” মাথা নাড়লেন কিকিরা। “তোমরা কমলাপতি রাঠোরের কথা বলছিলেন না? আমার মনে হয় ঘোষ-মাস্টারমশাই তাঁকে চেনেন না। চিনলে বলতেন।”
