“নৃসিংহ-সদন।”
“নৃসিংহ-সদন!” ঘোষবাবু যেন দু-মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলেন। তারপর তারাপদদের দিকে তাকালেন। “এঁরা?”
“আমাদের ইয়াং ফ্রেন্ডস। ও হল চন্দন। ডাক্তার। এম বি বি এস। কলকাতার হাসপাতালে আছে। আর ও আমাদের তারাপদ, চাকরি করে অ্যাকাউন্টসে। চন্দন আর তারাপদ বন্ধু। ছেলেবেলার। আমিই বুড়ো।”
“আপনার নাম?”
“কিঙ্করকিশোর রায়। লোকে বলে কিকিরা।”
“ওই শর্টকাট আর কি! কিঙ্করের কি, কিশোরের কি আর রায়ের রা–কিকিরা।”
ঘোষবাবুর মন্দ লাগল না কথাটা। বললেন, “কলকাতা থেকে আসছেন সব?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“আপনার কী করা হয়?”
“বিশেষ কিছু নয়। মানে বড়সড় কাজকর্ম করি না কিছু। দু-একটা কোম্পানির হয়ে কাজ করি।”
“কী কোম্পানি?”
“নাম করার মতন নয়। আজকাল আয়ুর্বেদের পুনর্জন্ম হচ্ছে–দেখেছেন! রিভাইভেল। লোকে আর অ্যালোপাথি খেতে চাইছে না। চন্দনরা যতই বলুক। সিস্টেম খারাপ করে দেয় অ্যালোপাথিতে। আয়ুর্বেদের পুরনো ওষুধগুলো নেড়েচেড়ে নতুন-নতুন ওষুধ বেরুচ্ছে। হজমের, লিভারের, মাথাধরার, বাতের, সর্দি-শ্লেষ্মর, পা মচকানোর কত কী! তা আমাদের কোম্পানি ভাবছিল–হরতুকির এক্সট্রাক্ট দিয়ে একটা কিছু যদি বের করা যায়। কবিরাজী শাস্ত্রে বলেছে হরীতকীর শত গুণ। গুণ শত না হলেও অনেক। মালটিভিটামিন টাইপের একটা ওষুধ বের করতে পারলে বাজারে চলত ভাল। যেমন ধরুন রসুনের রস আজকাল বাজারে দমদম করে চলছে। “
“দমদম করে…!”
তারাপদরাও হেসে ফেলল।
ঘোষবাবু কৌতুক বোধ করছিলেন। বললেন, “তা এলেন যখন–একটু বসবেন নাকি? এক কাপ করে চা?”
কিকিরা সংকুচিত হবার ভান করে বললেন, “না, না, এখন থাক। আপনি দু-পা হাঁটতে বেরিয়েছেন–এখন আর বাড়ির মধ্যে ঢুকব না। বরং কাল-পরশু আসা যাবে। আমরা তো আছি দু-চার দিন।”
“আমার কোনো অসুবিধে হত না।…আসুনই না। আলাপ যখন হয়েই গেল।”
কিকিরাদের নিয়ে বাড়ির মধ্যেই এলেন ঘোষবাবু। বারান্দায় চেয়ার পাতা ছিল। বসতে বললেন তারাপদদের। তারপর কাকে যেন ডাকলেন।
ভেতর থেকে এক মহিলার গলা শোনা গেল।
“জটা নেই?”
“জল তুলছে। ডাকব?”
“তুমিই এসো একবার।”
এক মহিলা এলেন। বয়স্কা। মাথায় কাপড় ছিল না। বাইরে এসে কিকিরাদের দেখে মাথায় কাপড় দিলেন।
ঘোষবাবু বললেন, “এঁরা বেড়াতে এসেছেন। চেঞ্জার। উনি হকিবাবু, হতুকির ব্যবসা ফাঁদবেন। উনি ডাক্তার। আর উনি চাকরি করেন।..” বলে ঘোষবাবু কিকিরার দিকে তাকালেন, মহিলাকে দেখিয়ে বললেন “আমার গিন্নি। নাতিনাতনিরা ছুটিতে এখানেই থাকে। তাদের আসার কথা। এখনো এসে পৌঁছয়নি। উনি দু বেলা গাড়ির শব্দ পেলেই ঘরে বাইরে করছেন।”
কিকিরারা উঠে দাঁড়িয়ে মহিলাকে নমস্কার করলেন।
“আপনারা বসুন। একটু চা করে আনি।” মহিলা চলে গেলেন।
ঘোষবাবু দু-চারটে সাংসারিক কথা বললেন। এখানে ওঁরা দুই বৃদ্ধবৃদ্ধাই থাকেন। কাজের লোক আছে। ছেলেমেয়েরা বাইরে। কাজকর্ম করে। ছুটিছাটায় সব আসে। নাতিনাতনিরা তো আসেই।
তারাপদ বলল, “আপনি এখানে কতদিন আছেন?”
“তা অনেকদিন। এই বাড়ি অবশ্য বেশিদিন নয়। তাও ক’বছর হয়ে গেল। আগে আমি এখানকার স্টেশন মাস্টার ছিলাম। জায়গাটার সঙ্গে আমার কিসের নাড়ির যোগ কে জানে! চার-চারবার ট্রান্সফার হয়ে এখানেই এসেছি। ঘুরেফিরে। আগে এ এস এম ছিলাম–পরে স্টেশন মাস্টার। আমার খুব ভাল লাগে জায়গাটা। শেষ জীবনটা কাটাব বলে মাথা গোঁজার জায়গাও করেছি একটা।”
কথায় কথায় আলাপ জমে গেল। চা এসেছিল।
চা খেতে-খেতে কিকিরা বললেন, “একটা কথা জিজ্ঞেস করব। মাস্টারমশাই?”
“কেন করবেন না?”
“না মানে, আমরা তো নতুন লোক, কলকাতা থেকে আসছি। কলকাতায় আমাদের এক বন্ধু নৃসিংহ-সদনে পাঠিয়ে দিয়েছেন ব্যবস্থা করে। বন্ধুটি রঘুপতিবাবুদের ফার্মে কাজ করেন। তাঁর ব্যবস্থা মতন আগে আমি এসেছি, আর এরা এসেছে মাত্র তিনদিন আগে।”
ঘোষবাবু মাথা দোলালেন। শুনছেন সবই।
কিকিরা বললেন “নৃসিংহ-সদনে আসার পর একটা খবর শুনলুম।”
“একটা লোক মারা যাওয়ার খবর?”
“হ্যাঁ। আরও শুনলাম-কে একজন সাধু নাকি কিছুদিন ধরে আগুনের ওপর হাঁটাচলা করছিল…”।
“আমিও তাই শুনেছি।”
“রঘুপতিবাবু আমাদের হোস্ট। এমনিতে আমাদের কোনো অসুবিধেই হচ্ছে না। কিন্তু ভদ্রলোককে খুবই ডিস্টার্বড় দেখছি, মুষড়ে পড়া চেহারা। শরীরও ওঁর খারাপ হচ্ছে।…আমরা কেমন অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গিয়েছি।”
ঘোষবাবু মাথা নাড়তে-নাড়তে বললেন, “আপনারা আর কী করবেন?”
“করার কিছু নেই ঠিকই, কিন্তু খারাপ লাগছে।”
“আপনার সঙ্গে রঘুপতিবাবুর আলাপ নেই?” তারাপদ বলল হঠাৎ।
“আলাপ! আলাপ থাকবে না কেন! অনেকদিন ধরেই আলাপ। ওঁরা এখানকার পুরনো লোক, আর আমিও কম পুরনো নই।”
“ওঁর বাবা…?”
“বিলক্ষণ চিনতাম রে ভাই! উমাপতিবাবু!…আমি তখন একেবারে ছোকরা, এখানে পোস্টেড, এ এস এম–তখন তাঁকে দেখেছি। বিশাল চেহারা ছিল। ছ’ ফুটের ওপর লম্বা।”
“তবে তো আপনি রঘুপতিবাবুর কাকাকেও চেনেন?”
“শচীপতিবাবু! ছবিটবি আঁকতেন। চিনতাম।”
“তাঁর যক্ষ্মা হয়েছিল। “
“হ্যাঁ, উনিই এখানে থাকতেন বরাবর।”
“এখানেই মারা যান?”
“তাই গেলেন। তখন ওঁর বয়েস বেশি হয়নি। চল্লিশের কাছাকাছি।” বলে ঘোষবাবু একটু চুপ করে থেকে নিজেই বললেন, “ভাল লোক ছিলেন। ছবিও বড় ভাল আঁকতেন। আমি দেখেছি। ছবি ওঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। অবশ্য এখানকার ক্লাইমেটও একটা ফ্যাক্টর।”
