চন্দন বলল, “দারুণ কিকিরা, খাসা! গ্র্যান্ড!”
কিকিরা বললেন, “আরও একটু আছে স্যান্ডাল উড। আগুনের এই খেলা দেখানোর মধ্যে অন্য কলাকৌশলও আছে। ব্যাপারটাকে এমনভাবে সাজাতে হয়–যাতে যে দূর থেকে দেখে তার দৃষ্টিভ্রম হয়। ভিসানারি ইলিউশন। পাহাড়ের যে জায়গায় দাঁড়িয়ে খেলাটা দেখানো হত–সেটা খেলা দেখাবার পক্ষে খুবই ভাল জায়গা। পারফেক্ট প্লেস। ওই বড় বড় পাথরগুলো সামনে থাকায় কাজটা অনেক সোজা ও নিখুঁত হয়ে উঠেছে। …পরে তোমাদের দেখিয়ে দেব।”
তারাপদও সিগারেট খাচ্ছিল।
বেলা অনেকটা বেড়েছে। রোদের রং গাঢ়। তাত জমছে রোদে। পাহাড়তলি যেন নিঝুম। মাঝে-মাঝে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল।
চন্দন বলল, “আপনি তা হলে কাজের কাজ একটা কিছু করেছেন?”
“একটা নয়, তিনটে।”
“তিনটে?”
“হাঁড়ি, দাড়ি বা চুল, আর একটুকরো কাগজ।” বলে কিকিরা তারাপদকে নকল চুলদাড়ির অংশটুকু দেখাতে বললেন।
তারাপদ দেখাল। কিকিরা বললেন, “ফস দাড়ি বা চুল। সাধুবাবার।” বলে নিজের পকেট থেকে কাগজের টুকরোটা বের করলেন। বারান্দার পাশে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন টুকরোটা। বললেন আবার, “এটা একটা কাগজের টুকরো। খইনির প্যাকেটের টুকরো। মুখের দিকটা ছেঁড়া, নিচের দিকটা আছে। এখনো একটু-আধটু গন্ধ পাওয়া যাবে খইনির। প্যাকেটের তলায় লেখা আছে হাজিবাবা খইনি অ্যান্ড বিড়ি মার্চেন্ট, নাগোয়া। বানারস।”
তারাপদ প্রায় লাফিয়ে উঠল। “স্যার, আপনার সেই পানঅলা তা হলে ঠিক লোকই বলেছে। বেনারসের গাড়িতেই এসেছিল লোকটা। কাশীর লোক।
কিকিরা বললেন, “কাশীর লোক কিনা এখনই বলা যায় কেমন করে। তবে হতে পারে।…কিন্তু লোকটা কে?”
চন্দন খুব নিরীহ গলায় বলল, “কমলাপতি…”
কিকিরা কান করলেন না। মস্ত করে ধোঁয়া গিললেন সিগারেটের। নিজের লম্বা লম্বা মাথার চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বললেন, নিজের মনেই, “লোকটা কে? কেন এসেছিল?”
চন্দন আবার বলল, “লোকটার নাম কমলাপতি রাঠোর।”
কিকিরা এবার তাকালেন চন্দনের দিকে।
চন্দন পকেট থেকে একটা লকেটের মতন জিনিস বের করল। গোল চাকতি। কিকিরার দিকে এগিয়ে দিল। বলল, “এই দেখুন। চাবির রিংয়ের চাকতি। এই চাকতিটা খুলে গেছে। এটা মেটালের। এতে ঢালাই অক্ষরে ইংরিজিতে লেখা আছে কমলাপতি রাঠোর অ্যান্ড কোং। গোধুলিয়া। বেনারস। “
কিকিরা কেমন স্তম্ভিত। হাত বাড়িয়ে চাকতিটা নিলেন।
তারাপদ বলল, “চাঁদু-তুই যে কেল্লা ফতে করে দিলি রে।”
.
০৭.
অন্নদা কুটির খুঁজে পেতে কষ্ট হল না।
বাড়িটা প্রায় রেললাইন ঘেঁষে, বালিয়াড়ির তলায়, এক প্রান্তে। সেখানে আরও দু-তিনটে বাড়িও চোখে পড়ে। এদিককার ঘরবাড়িগুলো সাধারণ, বাহার বিশেষ নেই। তবু গাছপালা বাগান দিয়ে মোটামুটি সাজানো।
রোদ মরে আসছিল। শীতের অপরাহ্ন। আকাশ পরিষ্কার। কয়েকটা চিল পাখিটাখি তখনো ভেসে বেড়াচ্ছিল শূন্যে।
কিকিরা তারাপদদের নিয়ে এমনভাবে অন্নদা কুটিরের কাছে এলেন যেন তাঁরা বেড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। চেঞ্জার বাবুবিবিরা এই সময়টাতেই বেড়িয়ে বেড়ান। সন্ধের আগে-আগেই বাড়ি ফিরে যান তাঁরা, যা শীত–তখন আর ঘুরে বেড়ানো সম্ভব নয়।
অন্নদা কুটিরের সামনে একজোড়া ইউক্যালিপটাস গাছ সিধে খাড়া হয়ে রয়েছে, গাছতলায় কিছু শুকনো পাতা জমেছে।
কিকিরা যেন ইউক্যালিপটাস গাছ দেখছেন এমনভাবে দাঁড়িয়ে তারাপদদের কিছু বলছিলেন, এমন সময় এক ভদ্রলোককে দেখা গেল।
বাড়ির ফটক খুলে বেরিয়ে এসেছিলেন ভদ্রলোক। কিকিরাদের দেখে দাঁড়ালেন।
ভদ্রলোকের বয়েস ষাটের ওপারে। পঁয়ষট্টির কাছাকাছি হবে। বয়েস হলেও শরীরস্বাস্থ্য ভাঙা নয়, বরং কর্মক্ষম বলেই মনে হয়। গায়ে জহর কোট, গরম চাদর, পরনে ধুতি। পায়ে জুতোমোজা। হাতে লাঠি। জহর কোটের পাশ পকেট থেকে চশমার খাপ উঁকি দিচ্ছিল।
কিকিরা বুঝতে পারলেন ইনিই ঘোষদাদা।
অচেনা হলেও চেনা-চেনা মুখ করে কিকিরা একটু হাসলেন। সৌজন্য দেখাতে নমস্কারও করলেন হাত জোড় করে।
ভদ্রলোক দেখলেন কিকিরাদের।
কিকিরা হাসি-হাসি মুখে বললেন, “একটু ঘুরতে বেরিয়েছি।…ইউক্যালিপটাস দেখছিলাম। বেশ বড় হয়ে গেছে। এখানে অনেক বাড়িতেই গাছটা দেখছি। আপনারটাই সবচেয়ে বেশি লম্বা মনে হল।”
“আরও পুরনো গাছ আছে ও-দিকে। গেলে দেখতে পাবেন।”
“এই গাছগুলো কত বছরের?”
“বছর বারো।”
“ষোলো হলেই সাবালক” কিকিরা হাসলেন, “ইউক্যলিপটাস পঁচিশ-তিরিশ ফিট পেরোলেই নাকি সাবালক হয়ে যায়। “
“ও!…তা আপনারা?”
“বেড়াতে এসেছি। বড়দিনের ছুটিতে।”
“চেঞ্জার!…এবছর চেঞ্জার একটু কম। এখনো আসার সময় যানি।”
“আপনিই কি ঘোষসাহেব?”
“সাহেব!” ভদ্রলোক দু-চার পলক দেখলেন কিকিরাদের, তারপর বললেন, “না, বাপের জন্মেও নই। আমি হেমচন্দ্র ঘোষ, আদি বাড়ি মেমারি, বর্ধমান। বাপ-ঠাকুরদা জমিজায়গা চাষবাসের কাজকর্ম নিয়ে পড়ে থাকতেন। আমি রেলে চাকরি করতাম। রিটায়ার্ড স্টেশন মাস্টার। লোকে মাস্টারমশাই বলত। সাহেব তো মশাই কেউ বলত না।”
কিকিরা হাসতে-হাসতে বললেন, “তা ঠিক। সাহেবদের বেশ ভিড় এখানে। মশাইদের পাওয়াই যায় না।…আপনার নাম শুনছিলাম।”
“কোথায়?”
“স্টেশনে। রাহাবাবু বলছিলেন…”
“আচ্ছা! আমাদের জীবন রাহা!..তা আপনারা উঠেছেন কোথায়?”
