কিকিরা দেখেশুনে বললেন, “মনে হচ্ছে জঙ্গলের বিট চৌকি।”
“মানে?”
“জঙ্গলের পাহারাদারের চৌকি।”
“এই অবস্থা?”
“আগে হয়ত এটা চৌকি ছিল–এখন নেই। হয় উঠিয়ে দিয়েছেনা হয় অন্য কোথাও করেছে।”
কিকিরা বারান্দায় উঠলেন। পাথর, ইট, কাদা, কোথাও বা সামান্য সুরকি দিয়ে গাঁথা একটা কুঁড়ে ধরনের ঘর। জঙ্গলের কাঠ কেটে তার মাথার ছাউনি হয়েছিল, তার ওপর খাপরা।
ঘরের দরজা বন্ধ ছিল। শেকল তোলা।
তারাপদ বলল, “খুলব?”
“খোলো।”
কিকিরা বারান্দাটা দেখছিলেন। তারাপদ দরজার পাল্লা হাট করে দিল।
খানিকটা অন্ধকার জমে আছে ঘরের মধ্যে। ছোট একটি জানলা দিয়ে রোদ না ঢুকলেও আলো ঢুকছিল।
ঘরের বাতাস ততটা ভারী নয়, বদ্ধও নয়। জানলা খোলা থাকার দরুনই বোধ হয়। দরজার ফাঁক-ফোকরও যথেষ্ট।
কিকিরা বললেন, “লোক ছিল। ওই দেখো!”
এই কুঠরিতে লোক ছিল বোঝা যায়। একপাশে কিছু খড় বিছানো, টাটকা খড়, একটা শতরঞ্জি, কম্বল। গোটা দুয়েক মাটির হাঁড়ি, একটা ছোট লণ্ঠন।
কিকিরা আর তারাপদ নজর করে সব দেখতে লাগল। জলের পাত্র, লোটা। এমনকি সিগারেটের পুরনো প্যাকেট পর্যন্ত চোখে পড়ল।
কিকিরা বললেন, “গাঁঠরি কই, সুটকেস কই?”
তারাপদ বলল, “আপনি কি সেই লোকটার কথা ভাবছেন–পানঅলা বুড়ো যার কথা বলেছিল?”
মাথা নেড়ে কিকিরা বললেন, “সেই লোক ছাড়া আর কে হবে? বিট চৌকিদার এভাবে থাকবে না! তারা টহল মেরে ফিরে যায় দিনে-দিনে।”
“তা হলে এই পোস্ট, মানে চৌকি?”
“গরম আছে, বর্ষা আছে, আপদ-বিপদ আছে। হয়ত কখনো দরকার পড়লে একটা রাতও কাটিয়ে দিতে হয়…”
“আপনি জানেন?”
“বাঃ! জানি বইকি।”
“তা আপনার সেই লোকই যদি হবে–তার অন্য মালপত্র কোথায় গেল?”
“তাই ভাবছি।”
কিকিরা মাটির হাঁড়ি দুটো তুলে নিতে বললেন তারাপদকে। নিয়ে বারান্দায় আসতে বললেন।
বারান্দায় এসে হাঁড়ির ভেতরটা দেখতে-দেখতে তারাপদ বলল, “স্যার, আটা ময়দা নাকি? নুন?”
কিকিরা হাত ডুবিয়ে গুঁড়ো পদার্থ খানকিটা তুলে নিলেন। তারপর কী হাসি তাঁর। হাসতে-হাসতে যেন নাচতে লাগলেন।
তারাপদ অবাক হয়ে বলল, “হল কি কিকিরা? এত হাসছেন!”
“ছেলেমানুষ, একেবারে ছেলেমানুষ।”
“কে?”
“তোমরা! এই যে দুটো হাঁড়ি দেখছ–এই দুটো হল আগুনের ভেলকি দেখাবার জিনিস।”
“মানে?”
“আগুনের খেলা দেখাতে হলে এ-দুটো দরকার।…যাগে, হাঁড়ি দুটো তুলে নাও। নিয়ে যাব।”
কিকিরাকে খুব খুশি দেখাচ্ছিল। এতই খুশি যে, নিজের মনে রামপ্রসাদী ঢঙে গান গেয়ে উঠলেন : আর কত মা ঘুরাবি আমায়।
গান গাইতে-গাইতে কিকিরা বারান্দার আনাচকানাচ খুঁজলেন তন্নতন্ন করে। এক টুকরো কাগজ পাওয়া গেল। পকেটে পুরে নিলেন।
“ওটা কী দেখো তো?”
তারাপদ নিচে নামল বারান্দার। আমলকী ঝোপের পাশে খানিকটা সাদা মতন কী পড়ে আছে। তুলে নিল তারাপদ। দেখল। বলল, “কিকিরা, পাকা চুল-সাদা শণের মতন দেখতে…!”
“সাধুবাবার দাড়ি থেকে খসে পড়েছে!”
“দাড়ি?”
“ফল্স দাড়ি বা চুল। থিয়েটার যাত্রায় যা পরা হয়। বোধ হয়, সাধুবাবার গাল চুলকোচ্ছিল। খুব চুলকেছেন। খসে পড়ে গিয়েছে দু-চার গুচ্ছ। ফেলে দিয়েছেন।”
“তা হলে সাধুবাবা নকল?”
“বলতে?”
“আগুনের ওপর হাঁটাও ভাঁওতা।
“পুরোটাই ভাঁওতা।”
“কিন্তু সাধুবাবা কই?”
“সেটাই বলা মুশকিল। হয় মরে গেছে, না হয় ঘাপটি মেরে বসে আছে কোথাও।”
কিকিরা আরও একবার দেখলেন চারপাশ। ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন। বললেন, “যেখানে যেমনটি আছে থাক। চলো, চন্দনের খোঁজ করি।”
.
চন্দনকে পাওয়া গেল নদীর দিকে। হাঁটতে-হাঁটতে নদী পর্যন্ত চলে এসেছে প্রায়। গাছতলায় বসে বিশ্রাম করছিল।
তারাপদর হাতে একটা মাটির হাঁড়ি, অন্যটা কিকিরার হাতে।
চন্দন অবাক হয়ে বলল, “হাঁড়ি কিসের?”
কিকিরা বললেন, “রসগোল্লার। এর ইংরিজি নাম স মিল্ক পটাটোস উইথ সুগার জুস।”
চন্দন হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারল না। বলল, “এ কি কিকিরা-ইংলিশ?”
“না স্যার”, কিকিরা বললেন, “এইটটি ফিফটি ফাইভে কোম্পানির খাস গিয়ারসন সাহেব তাঁর মেমসাহেবকে খাওয়ানোর জন্য মুনসিকে হুকুম করেছিলেন–এই মুনসি, গো অ্যান্ড ব্রিং দোস স মিল্ক পটাটোস উইথ সুগার জুস…।”
তারাপদ আর চন্দন হোহো করে হেসে উঠল।
কিকিরা এবার গাছতলায় বসলেন। বসে সিগারেট চাইলেন। তারপর মাটির হাঁড়ি দুটো দেখিয়ে বললেন, “স্যান্ডেল উড, এই দুটো হাঁড়ির মধ্যে যা আছে–তা দিয়ে আগুনে হাঁটার খেলা দেখানো যায়।”
চন্দন দেখল। বলল, “কিসের গুঁড়ো?”
“একটায় আছে পেলেন অ্যান্ড সিম্পল নুন। সল্ট। নরমাল সল্ট। অন্যটায় রয়েছে অ্যালাম বা ফটকিরি আর নুন। গুঁড়ো করে মেশানো। …দাও সিগারেট দাও।” কিকিরা সিগারেট নিয়ে আরাম করে বসলেন।
চন্দন বলল, “এই গুঁড়ো নিয়ে আগুনের খেলা দেখানো যায়?”
“যায়। ফটকিরি আর নুনের এই গুঁড়ো পায়ে মাখো হাতে মাখো মেখে আগুনের ওপর পা রাখো, বা হাত রাখো। তিন সেকেন্ডের বেশি রাখবে না। বড় জোর চার সেকেন্ড–তোমার কিস্যুটি হবে না। এ হল প্রিমিটিভ ব্যাপার। আজকাল শুনছি অ্যাক্রোলাইট পলিমার সলুশান আঙুলে লাগিয়ে জ্বলন্ত মোমবাতির শিখার ওপর আঙুল আরও বেশিক্ষণ ধরে রাখা যায়। আমি পরখ করে দেখিনি। তা ছাড়া অ্যাসবেসটাস দিয়ে খড়ম করেও তুমি চাপা আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটে দেখতে পারো।”
