কিকিরা বললেন, “লোকটা যে পা হড়কে পড়ে গিয়েছিল–তা তোমাদের কে বলল! তাকে খুন করাও তো হতে পারে।”
“আপনি এই সন্দেহটা বারবার করছেন স্যার।”
“করছি দুটো কারণে। এক, ওই হাতুড়িরটার জন্য। কোথাও কিছু খুঁজে পাওয়া গেল না, শুধু একটা হাতুড়ি–তাও ক্যাম্বিসের ব্যাগের মধ্যে পাওয়া যাবে কেন? সেটা আবারও এমনভাবে পাওয়া গেল–যেন কেউ ওটা ব্যাগের মধ্যে পুরে নদীতে ফেলে দিতে গিয়েছিল। পারেনি। ঠিক মতন ছুঁড়তে পারেনি।”
“আপনি বলছেন, হাতুড়ি দিয়ে একটা লোককে জখম করা হয়েছিল আগে। “
“হ্যাঁ। মাথার পেছনে মারা হয়েছিল।”
তারাপদ বলল, “আপনার দ্বিতীয় সন্দেহের কারণ?”
“সকালে তোমাদের দেখিয়েছি। হাতুড়ি দিয়ে মারার পর লোকটা যখন পড়ে যায়, অজ্ঞান। তখন তাকে টেনে-হিঁচড়ে টিলার ধারে নিয়ে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তোমাদের সেই দাগও দেখিয়েছি। হেঁচড়ে ঘষটে কাউকে টেনে নিয়ে গেলে যেমন দাগ থাকে–সেইরকম দাগও কিছু ছিল। পাথর বলে দাগ কম। তবে শ্যাওলায় দাগ পড়েছে, ঘাসেও দাগ। ধরেছে।…আমি মনে করছি, এটা খুন!”
তারাপদ চন্দনের দিকে তাকাল। চন্দন কিছু বলল না।
.
০৬.
রোদ যেন আকাশ থেকে গড়িয়ে পড়ছিল টিলার মাথায়। চারপাশের বন-জঙ্গল, বুনো আগাছার গায়ে তখনও রাতের হিমের ভিজে ভিজে ভাব রয়েছে। ঘাসে শিশিরবিন্দু।
কিকিরা তারাপদদের নিয়ে সকাল-সকালই এসেছেন। বেলা বেড়ে গেলেও ক্ষতি নেই। ভাল করে চারপাশ তিনি আজ দেখতে চান কিছু পাওয়া যায় কিনা! তাঁর ধারণা, নিশ্চয় পাওয়া যাবে।
তারাপদকে একটা চড়াইয়ের দিক দেখিয়ে দিয়ে বলেন, “তুমি ওদিকটা দেখো। ভাল করে দেখবে।”
তারাপদ ঠাট্টা করে বলল, “চোখে ম্যাগনিফাইয়িং গ্লাস গোছর কিছু যদি বেঁধে দিতেন, নয়ত এই বুনো ঝোপের আড়ালে কী পড়ে আছে–কেমন করে দেখব, স্যার।”
কিকিরা পালটা রসিকতা করে বললেন, “ম্যাগনিতে কি হবে–যা চোখ। টেলিফায়িং গ্লাস হলে হত!..যাক, ছুঁতো না করে কাজে লেগে পড়ো। নজর রাখলে ঠিকই দেখতে পাবে।”
তারাপদ পা বাড়াল।
কিকিরা এবার চন্দনকে অন্যদিকটা দেখিয়ে দিলেন, “স্যান্ডেল উড, তুমি ও-পাশটা চষে ফেলবে। আমি সামনে দেখছি।”
চন্দন বলল, “সামনে খুব ঢালু সার; পা হড়কে যাবেন না তো?”
“না।”
“পড়লে কিন্তু খোঁড়া…”
“না বাবা, এ পায়ের অনেক প্লে আছে।…ভুজঙ্গ কাপালিকের বেলায় একটা খেলা দেখিয়েছিলুম মনে আছে! ঘণ্টা নাড়ার খেলা।”
চন্দন হাসল। “আছে। দারুণ খেলা।”
“তবে?”
“আচ্ছা কিকিরা, আপনি কি আগুনের ওপর দিয়েও হাঁটতে পারেন?”
কিকিরা একটু হাসলেন, “কেন?”
“না, আপনি বারবার বলছিলেন–ওই সাধু আগুনের ওপর হাঁটার খেলা দেখাত, তাই জিজ্ঞেস করছি।”
কিকিরা বললেন “ওটা খেলাই। তোমরা কি কখনও চড়কপুজোর মেলা দেখোনি? ঝাঁপান, নাক ফুটো কান ফুটো, আগুন নিয়ে খেলা…! দেখোনি?”
“ছেলেবেলায় একবার দেখেছিলাম। দেখা যায় না।”
“আগুনের ওপর হাঁটাটা খেলাই। সস্তা খেলা।”
“আপনি পারেন?”
“তুমিও পারবে।…তা এ-সব পরে হবে, আগে অন্য কাজ। যাও, এগিয়ে যাও। আমি এ-দিকটায় দেখছি।”
চন্দন চলে গেল।
কিকিরা বললেন, “কিছু দেখলে জায়গা ছেড়ো না; চেঁচিয়ে ডাকবে। টারজানের মতন, বুঝলে?” বলে মুখের সামনে হাত আড়াল করে টারজানের ডাক দেখানোর ভঙ্গিটা দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন।
চন্দন বলল, “ডাকব।”
কিকিরা সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। পাহাড়ি জায়গা, পায়ে চলা পথও নেই। গাছপালার ডাল ধরে পাথর ধরে ধরে ঝোপের পাশ দিয়ে এগুতে হয়। পা পিছলে যাওয়ার ভয় আছে। কিকিরা সাবধান হলেন।
ফুট তিরিশ নেমেছেন কিকিরা, চোখে পড়ল তারাপদ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েছে।
কিকিরাও দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারাপদ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রয়েছে–কিকিরাকে দেখছে না। কিকিরা তাকে দেখতে পাচ্ছিলেন। তেমন একটা দূরেও নেই তারাপদ।
কিকিরা ডাকলেন তারাপদকে।
ডাক শুনে তারাপদ এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল। ঠিক ধরতে পারছিল না, কিকিরা কোথায়?
কিকিরা রুমাল বের করলেন পকেট থেকে। নাড়তে লাগলেন।
তারাপদ দেখতে পেল। পেয়ে হাত নেড়ে ডাকতে লাগল।
বাধ্য হয়েই কিকিরাকে আবার উঠে আসতে হল। ঘুরপথে তাঁকে তারাপদর কাছে যেতে হবে।
.
কিকিরা তারাপদর কাছে পৌঁছতে না পৌঁছতেই তারাপদ বলল, “ওই দেখুন!”
শিমগাছের মতন লতানো এক গাছ জড়িয়ে রয়েছে অন্য একটা গাছকে। গাছটির চেহারা করবী গাছের মতন, পাতাগুলো কিন্তু অন্যরকম। ছোট-ছোট হলুদ ফুলে ভরতি তার ডালপালা।
লতানো গাছটার আড়াল থেকে একটা ভাঙাচোরা খাপরা-ছাওয়া ছোট কুঁড়ে দেখা যাচ্ছিল। কুঁড়েটা দু পাশ থেকে এমনভাবে ঢাকা যে, একেবারে কাছে এসে না দাঁড়ালে দেখা যায় না।
কিকিরা বললেন “চলো দেখি।”
ডালপালা, লতানো গাছের ঘন পাতা সরিয়ে কিকিরাকে কুঁড়েটার কাছে এলেন। সামনে আসতেই দেখা গেল, তফাত থেকে যতটা মনে হয়েছিল কুঁডেটা তত ভাঙাচোরা নয়। মাথায় খাপরা ঠিকই, তবে একেবারে নষ্ট হয়ে যায়নি। ছাউনির খাঁচাটা বেরিয়ে এসেছে বারান্দা পর্যন্ত। একটামাত্র কুঠরি, সামনে সরু বারান্দা মতন। দরজাও আছে। আলকাতরা মাখানো রয়েছে পাল্লায়। অবশ্য দরজার কাঠ বেঁকেচুরে গিয়েছে। আলকাতরার গায়ে রং দিয়ে হিন্দিতে কী যেন দু-একটা অক্ষর লেখা। নম্বরও রয়েছে।
