চন্দন বলল, “আপনি মুসাফিরখানায় খোঁজ করেননি?”
“না। মাথায় আসেনি।”
“টিকিট কালেক্টর? তাঁরা তো জানতে পারেন। “
“টিকিটবাবুরাও জানেন না।…আমি সরাসরি জিজ্ঞেস করিনি, তবে ওই রাহাবাবু-টিকিটবাবু যাঁকে দেখলে–উনি বলছিলেন–অত লোকজনের মধ্যে নতুন-পুরনো খেয়াল করা যায় না তখন। তা ছাড়া টিকিটবাবুদের তো ডিউটির ঠিক থাকে না। কার কখন ডিউটি, কোন্ গাড়িতে কে নামল, কার তখন ডিউটি ছিল…, নজর করেছেন কি করেননি–বলা মুশকিল।”
তারাপদ বলল, “সব প্যাসেঞ্জারই কি ওভারব্রিজ ধরে বেরিয়ে আষ্ট্রে? মনে হয় না।”
“হ্যাঁ–এদিক-ওদিক দিয়ে চলে যায়। দেহাতীরা বেশিরভাগ।”
তারাপদ আর কিছু বলল না। তিনজনে হাঁটতে লাগল। বিকেল ফুরিয়ে ঝাপসা অন্ধকার নেমে আসছিল।
কিকিরা হঠাৎ বললেন, “পুলিশগুলো কেমন বলো তো? তারা যদি ভাল করে খোঁজ করত–অন্তত কিছু জানতে পারত।”
“চেষ্টা করেছে নিশ্চয়। জানতে পারেনি।”
“আমার কিন্তু মনে হচ্ছে, পানঅলা যা বলল, তা হলেও হতে পারে। খুব ভোরের ট্রেনে যদি কেউ এসে থাকে, এই প্রচণ্ড শীতে, তাকে নজর করার মতন লোক পাওয়া মুশকিল!”
তারাপদ বলল, “এখন চলুন, মুসাফিরখানায় খোঁজ করে দেখুন–যদি কোনো হদিস পান!”
.
স্টেশনের বাইরে মুসাফিরখানা। একপাশে টিকিট অফিস, অন্যপাশে পার্সেল অফিস। দু-তিনটে ছোট-ছোট দোকান। দুটো মিঠাইঅলার, অন্যটা চায়ের দোকান। মাঝখানে চত্বর। গাঁটরি-গুটরি নিয়ে যাত্রীরা ওখানেই বসে থাকে, শুয়ে থাকে, অপেক্ষা করে গাড়ির।
কিকিরা খোঁজ-খবর নিতে লাগলেন মিঠাইঅলাদের কাছে।
কেউ কিছু বলতে পারে না। বেনারসের গাড়ি আসে একেবারে ভোরবেলায়, এত ভোর যে, শেষরাতও বলা যায়। এই শীতে তখন দোকান খুলে রাখে না কেউ, চাঅলার দোকানই যা একচিলতে খোলা থাকে। তখন যদি কোনও যাত্রী এসে মুসাফিরখানায় অপেক্ষা করে সকাল না হওয়া পর্যন্ত–তবে তাকে কে আর নজর করবে!
চাঅলা অবশ্য বলল, দু-একটা লোকে এসে দেখেছে, কিন্তু ভাল করে লক্ষ করেনি। কত তো যাত্রী আসছে-যাচ্ছে–কে আর খেয়াল করে বাবু! থানা থেকে পুলিশ এসেও তাদের জিজ্ঞেস করেছিল। ওরা কিছু বলতে পারেনি।
মুসাফিরখানা থেকে রেল স্টেশন।
টিকিটবাবু রাহা বললেন, “আর্লি মর্নিংয়েবর ট্রেনটা এত ভোরে আসে মশাই যে, এই শীতে আমরা তখন ঘুমিয়ে কাদা হয়ে থাকি। একে ঘুম চোখ, তায় এই শীত আর কুয়াশাধরে নিন কিছু দেখার অবস্থা থাকে না।…তা ঠিক আছে শর্মার তখন ডিউটি ছিল–জিজ্ঞেস করব।”
কিকিরা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ রাহা বললেন, “যে-লোকটা মারা গিয়েছে তার সম্পর্কে এত খোঁজ করছেন! আপনারা তাকে জানেন নাকি?”
কিকিরা তাড়াতাড়ি বললেন, “না। আমরা কেমন করে জানব! আপনিই তো বলছিলেন..”
“বলছিলুম। এ তো কলকাতা শহর নয় দাদু, রোজই দু-চারটে সেসেসান লেগে আছে। আমাদের কাছে এটাই মস্ত খবর। তার ওপর এই সিজনটাইমে।…তা আপনাদের ইন্টারেস্ট?”
“ইন্টারেস্ট ঠিক নয়, কৌতূহল! যাঁর বাড়িতে গেস্ট হয়ে রয়েছি, তিনি দেখছি খুবই ঘাবড়ে গিয়েছেন।”
“হ্যাঁ, তা ঘাবড়ে যেতে পারেন। কিন্তু তাঁর বাড়ির মধ্যে যখন কিছু হয়নি ঘাবড়ে গিয়ে কী করবেন!…আগুনের ব্যাপারটা কিন্তু দাদু, ভুতুড়ে–তাই নয়। সেই লোকটা কোথায় গেল?”
কিকিরা বললেন, “পালিয়ে গিয়েছে বোধ হয়!” কথাটা হালকাভাবে বলা।
রাহা পান চিবোচ্ছিলেন, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে লোক বাড়ছে। ট্রেন আসার সময় হয়ে এল।
কিকিরারা চলে আসছিলেন, হঠাৎ রাহাবাবু বললেন “দাদু, আপনি একবার ঘোষদার সঙ্গে দেখা করে যান না! উনি অনেক খবর রাখেন। পুরনো লোক।”
“কে ঘোষদা?”
“ঘোষদাকে চেনেন না? নাম শোনেননি এখনো। লোকে বলে এইচ ঘোষ। হেম ঘোষ। তাঁর সঙ্গে দেখা করে যান। অন্নদা কুটির। ঘোষদা এখানকার পুরনো লোক।”
কিকিরা বললেন, “অন্নদা কুটিরটা কোথায়?”
“আপনার যাওয়ার পথেই পড়বে। বড় রাস্তায় নয়। ভেতরে ঢুকে। একটা খাটাল মতন দেখবেন। সামান্য এগিয়ে। বাঁ দিকে। বিরাট তেঁতুলগাছের পাশে ঢালু মাঠ। সেখানে অন্নদাকুটির।”
কিকিরা ব্যস্ততা দেখালেন না। বললেন, “দেখি। যাব একবার।”
.
ফেরার পথে তারাপদ বলল, “কিকিরা, এই কেসটা ছেড়ে দিন।”
“কেন?”
কোনো আশা দেখছি না। ধরার মতন পাচ্ছেন না কিছুই, অকারণ অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে কী লাভ!”
কিকিরা বললেন, “পাচ্ছি না ঠিকই; তবে পেয়ে যেতেও পারি।” বলে চন্দনের দিকে তাকালেন। “স্যান্ডেল উড। কাল আমরা ওই জায়গাটা একবার ডিটেল সার্ভে করব। কোন জায়গা বুঝেছ? আজ সকালে যেখানে গিয়েছিলুম। টিলার মাথা, তার আশপাশ। নদীর দিকটা। বুঝলে?”
“আপনি তো সার্ভে করেছেন স্যার!”
“একা মানুষ কতটুকু সার্ভে করব! ওপর-ওপর একটু দেখে এসেছি?”
“পাবেন কিছু?”
“পাওয়া উচিত। …একটা হোক দুটো হোক-কেউ-না-কেউ তো ওখানে যেত। হয়ত থাকত। মানুষের খিদে-তেষ্টা আছে, মাথা গোঁজার জায়গা দরকার–সে তো বাতাস নয়। মানুষ থাকলে তার ফেলে যাওয়া চিহ্ন থাকবে না–এমন হতে পারে না। নিশ্চয় কিছু পাওয়া যাবে।”
চন্দন বলল, “আমার আপত্তি নেই। তবে একটা কথা আমি বলছি–যে-লোকটা মারা গিয়েছে–আমি তার মতন পা হড়কে ওই বিশ্রী জায়গা থেকে নিচে পড়ে মরতে রাজি নই। তারা যদি রাজি থাকে..”
তারাপদ বলল, “বাঃ! আমি কেন মরব।”
