“ও!”
“আপনি এখানে আসতে-আসতেই ইতিহাস-ভূগোল জেনে নিয়েছেন?” তারাপদ মজার গলায় বলল, “ভ্রমণকাহিনী লিখবেন নাকি?”
কিকিরা বললেন, “একটু-একটু জানতে হয় হে! ময়ূরগঞ্জের পাস্ট হিষ্ট্রি বলছে–এখানে এক মাউন্টেন অ্যান্ড জাঙ্গল কিং–মানে পার্বত্য রাজা মুসলমান এক সেনাপতির মুণ্ডু কেটে গেণ্ডুয়া খেলেছিল।”
“বলেন কী?”
“যুদ্ধ! জঙ্গুলে যুদ্ধ করার টেকনিক আলাদা। সেনাপতি সেটা জানত না।”
চন্দন বলল, “ঝোপে লাঠি মারতে হয়।”
“মানে?”
“মানে ঝোপেঝাড়ে লাঠি মেরে যাও, যদি সাপের মাথায় লাগে। এই যেমন আপনি?”
“আমি? আমি কি বাপু ঝোপেঝাড়ে লাঠি মেরে যাচ্ছি?”
“যাচ্ছেন বইকি! আপনার রঘুপতি, ওই আগুনের খেলা, একটা লোক খুন হওয়া–এর কোনোটারই কোনো সুতো আপনি ধরতে পারছেন না–জানেনও না, বৃথাই ঝোপেঝাড়ে লাঠি ঠুকে যাচ্ছেন?”
কিকিরা বললেন, “দেখো স্যান্ডেল উড, গল্পের গোয়েন্দারা বড়বড় লাফ মারতে পারে, তাদের প্র্যাকটিস আছে। আমি গোয়েন্দা নই–ম্যাজিশিয়ান। আমি হাত সাফাই করি। ভেলকি দেখাই।”
“তাই দেখান।”
বলতে বলতে রেল ফটক। রেল ফটক পেরিয়ে এক পানঅলার দোকান।
কিকিরা বললেন, “চলো, একটু খোঁজখবর করি।”
পানঅলার সঙ্গে কিকিরা আগেই পরিচয় সেরে রেখেছিলেন। পানঅলা কিকিরাকে দেখে নমস্তে করল। কিকিরাও খুব আহ্লাদ-মেশানো গলা করে সিগারেট, দেশলাই, পান চাইলেন।
পানঅলা বুড়ো মতন। ছোট্ট দোকান তার। শুধু পানের দোকান দিয়ে চলে না বলে সঙ্গে চায়ের ব্যবস্থাও রেখেছে। ময়লা কেটলি, ততোধিক ময়লা ক’টা ছোট-ছোট কাচের গ্লাস। অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে চিনি, হরলিকসের শিশিতে দুধ।
কিকিরা চোখ টিপে তারাপদদের বললেন, “চা খাবে নাকি?”
আগেই মাথা নাড়ল চন্দন। “না।”
তারাপদও খাবে না।
কিকিরা কিন্তু এক গ্লাস চা বানাতে বললেন।
তারাপদ কিছু বলতে যাচ্ছিল, ইশারায় বাধা দিয়ে কিকিরা বুড়ো চাঅলার সঙ্গে গল্প করতে লাগলেন।
দু-চার কথার পর কিকিরা বললেন, “বাবুলোক, কালকাত্তাসে আয়া। চায়ে নেহি পিয়ে গা। কফি পিনেঅলা বাবু হ্যায়।”
তারাপদরা কিকিরার হিন্দিবুলির রসিকতা শুনতে-শুনতে হাসছিল।
পানঅলা কিকিরার চা তৈরি করতে লাগল।
কিকিরা অন্য দু-চারটে মজার কথা বলার পর বললেন, “এক খবর তো দেও বুড়া বাবা!”
“জি।”
“রঘুপতিবাবুকো কোঠিমে বহুত ডর লাগতা হ্যায়।” বলে কিকিরা কাঠের বেঞ্চিটায় বসলেন। বললেন, আগে জানলে তিনি ওবাড়িতে এসে উঠতেন না।
“কাহে বাবু?”
কিকিরা বললেন, “যে লোকটা মারা গিয়েছে, তার দাহ কাজ ঠিকভাবে হয়েছে কিনা কে জানে! একটা আত্মা যেন বাড়ির কাছে ঘুরে বেড়ায়।”
বুড়ো বলল, পুলিশের লোক লাশ জ্বালিয়ে দিয়েছে। ব্রাহমন কেউ ছিল না। এরকম অধর্মের কাজ করলে আত্মার কি সদগতি হয়।
কিকিরা বললেন, “লোকটা কে?” বাংলাতেই বললেন।
“নেহি মালুম।”
“তুমি তাকে দেখোনি কোনোদিন?”
“নেহি।”
“লাশ দেখেছ?”
মাথা নাড়ল পানঅলা। দেখেনি।
“কোনো নতুন লোককে তুমি দেখোনি?”
পানঅলা কী ভাবল। তারপর বলল, একটা লোককে সে একদিন দেখেছিল। কিন্তু এখন এখানে চেঞ্জারদের ভিড়। কত লোক আসে, যায়। সবাই যে তার সামনে দিয়ে আসে, যায় তাও নয়। কাজেই যাকে দেখেছিল সে যে কে–কেমন করে বলবে!
কিকিরা বললেন, “কবে দেখেছিলে লোকটাকে?”
পানঅলা ভাবল। আনুমানিক সময় বলল।
কিকিরা মোটামুটি হিসেব করে নিলেন। সময়টা মিলে যাচ্ছে।
“কখন দেখেছিলে? ফজিরে, না সাঁঝে?”
“ফজিরে।” বলে পানঅলা আবার বলল, সে যখন ভোরবেলায় চুলায় আগ লাগাচ্ছিল–তখন একটা লোক তার দোকানের কাছে এসে দাঁড়ায়। বলে, তুরন্থ হলে এক গ্লাস চা খেতে পারে।
“চা খেয়েছিল?”
“জি”
“লোকটা বাঙালি?”
“ওই সেই মালুম।”
“দাড়ি ছিল?”
“না।”
“তোমায় কিছু বলল? কোত্থেকে আসছে?”
“জি না।..কুছ না বলল।”
“সকালে কোন ট্রেন আসে এখানে?”
“বানারসকা গাড়ি আসে। ফজির চার বাজে।”
“আচ্ছা! লোকটার সঙ্গে গাঁঠরি ছিল না?”
“থোড়া বহুত ছিল।”
“কী ছিল?”
“গাঁটরি, বাকাস!”
“বড় বাক্স।”
“জি না। ছোটা।” বলে একটা সুটকেসের চেহারা দেখাল।
“লোকটা কোথায় যাবে কিছু বলল না?”
“নেহি।”
কিকিরা সিগারেট দেশলাই পান নিয়ে পয়সা দিলেন পানঅলাকে।
পানঅলা নিজেই বলল, “আপনি মুসাফিরখানায় গিয়ে খোঁজ করুন বাবু, ওখানে খোঁজ করলে কোনো খবর পেতেও পারেন।”
তারাপদদের ডেকে নিয়ে কিকিরা স্টেশনের দিকে পা বাড়ালেন।
হাঁটতে-হাঁটতে কিকিরা বললেন, “পান খাও।”
তারাপদ একটা পান নিল। বলল, “আপনি তো পান খান না। চাঁদুও খায় না। অকারণ এত পান নিলেন কেন? আর ওই গাঁজা সিগারেট! কে খাবে ওগুলো?
কিকিরা বললেন, “লোকটার সঙ্গে আমি ভাব পাতাবার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কেন যাচ্ছি জানো? স্টেশন থেকে কেউ যদি লালা রোড আসতে চায়–ওই পানঅলার দোকানের সামনে দিয়েই আসতে হবে। অবশ্য বে-টাইমে এলে কে দেখছে! টাইমে এলে–সেই আসুক, পানঅলার নজরে পড়তে পারে। যদি এই রাস্তায় না এসে মাঠ ভেঙে এগিয়ে গিয়ে লালা রোড ধরে তবে আলাদা কথা। তোমাদের নিয়ে পরশু যেভাবে আমি নৃসিংহ সদনের রাস্তা ধরেছিলুম।” বলে পানের মোড়কটা হাতে রেখেই সিগারেটের প্যাকেট দুটো তারাপদকে দিলেন, “রেখে দাও, যা শীত–এগুলো কাজে লেগে যাবে।…আরে, শুধু-শুধু তো ভাব পাতানো যায় না, দু-চার টাকা খরচ করতে হয়। নাও, রাখো।”
