“খেলা?”
“খেলা না বলতে চাও, না বলো। দৃশ্য বলল। দৃশ্যটা সে,দেখাত। আর কাকে দেখাত? রঘুপতিবাবুকে। তার মানে সে রঘুপতি সম্পর্কে সব খবরই জানত।”
“যেমন?”
“যেমন জানত রঘুপতি এখন এখানে আছেন বা এসময় থাকেন সচরাচর। জানত রঘুপতি কোন ঘরে থাকেন, কোনটা তাঁর বসার ঘর। তিনি কোন সময়টায় ঝুল বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে থাকেন। মাঝে-মাঝে বা বসেবসে এই পাহাড় দেখেন, সূর্যাস্ত দেখেন–এসবও তার জানা ছিল।”
চন্দন আর তারাপদ একইসঙ্গে বলল, “রঘুপতিকে কি ভয় দেখাত লোকটা?”
কিকিরা বললেন, “ভয়! হতে পারে! ভয় দেখাত হয়ত। হয়ত কিছু বোঝাতেও চাইত।”
“কে লোকটা?”
“কেমন করে বলব?”
“যে মারা গেল…”
কিকিরা উঠে পড়লেন। বললেন, “চলো, লোকটা কোথায় মারা গিয়েছিল দেখাই তোমাদের!”
বিশ-পঁচিশ গজ ডাইনে সামান্য ঢাল। বড় বড় পাথর। বুনো ঝোপঝাড়। তার পাশেই খাদ। নিচে চুনিয়া নদী। জল না থাকার মতন। পাথরে ভরা। পাথরের ফাঁক দিয়ে শীর্ণ জলস্রোত বয়ে যাচ্ছে।
চন্দন আর তারাপদ দেখল। এখান থেকে চুনিয়া নদী–অন্তত সত্তর-আশি ফুট নিচে। মানে ছ-সাততলা বাড়ির সমান উঁচু। নীচের দিকে তাকালে ভয়ই হয়, পাথরভরা নদী দেখে।
চন্দন বলল, “নদী কেথায় কিকিরা–শুধুই পাথর।”
“পাহাড়ি ঝরনা থেকে নেমে আসা স্রোত। পাহাড়ি ছোট নদী এইরকম হয়।”
“যে মারা গিয়েছিল সে কোথায় পড়ে ছিল?”
কিকিরা হাত বাড়িয়ে জায়গাটা দেখালেন। বললেন, “ওইরকম একটা জায়গায়। ঠিক স্পট বলতে পারব না।’
“জায়গাটা আপনাকে কে দেখিয়েছিল?”
“বিরজুবাবু।”
“একটা লোক ওখানে মরে পড়ে আছে–একথা লোকে জানল কেমন করে? এদিকে তো লোকজন আসে না?” তারাপদ জিজ্ঞেস করল।
মাথা নাড়লেন কিকিরা। বললেন, “এক্কেবারেই যে আসে না–তা নয়। আসে। ওপাশে গাঁ আছে। নদী পেরিয়ে তোক আসে। বিশেষ করে হাটবাজারের দিন। কিছু লোক কাঠকুটো কুড়োত আসে। দু-চারজন বাচ্চাকাচ্চা জোটে নদীর মাছ ধরতে।”
“মাছ? এ-নদীতে মাছ?”
“পাওয়া যায়। ওই তোমার মৌরলা ধরনের মাছ। পুঁটিও থাকে। পাঁচমেশালি। খেতে খুব স্বাদ। “
চন্দন বলল, “কিকিরা, এত উঁচু কেউ যদি পা হড়কে নিচে পড়ে যায়-পাথরের ওপর, সে কিন্তু বাঁচবে না। বাঁচা মুশকিল। মাথা থেঁতলে যাবে। ঘাড় ভেঙে যেতে পারে। হাত-পা ভাঙবে।…কথা হচ্ছে বডিটা কী অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল?”
কিকিরা বললেন, “মাথা চৌচির, হাত-পা ভাঙা।” বলেই একটু থেমে বললেন, “লোকে তাই বলছে।”
“পুলিশ?”
“পুলিশের কাছে আমি যাইনি। যাওয়া অনর্থক।”
“রঘুপতি কিছু বলছেন না?”
“তিনি ডেড বডি দেখেননি। ওঁর পক্ষে এ-ধরনের দৃশ্য দেখা অসম্ভব। সহ্য করতে পারবেন না। বডি না-দেখেই ভদ্রলোক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। দেখলে হার্ট ফেল করতেন।”
তারাপদ চুনিয়া নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল। আচমকা বলল, “আর, আপনি ক্যাম্বিসের ব্যাগটা কোথায় কুড়িয়ে পেয়েছিলেন?”
কিকিরা হাত বাড়িয়ে আঙুল দিয়ে একটা জায়গা দেখালেন। বললেন, “ডেড বড়ি পড়ে ছিল ওখানে–মানে ডান দিকে। আমাদের ডান দিকে। আর ক্যাম্বিসের ব্যাগটা আমি পেয়েছি বাঁ দিকে। পাথরের ফাঁকে আটকে গিয়েছিল। আমার মনে হয় ক্যাম্বিসের ব্যাগটা কেউ জোরে ছুঁড়ে দিতে গিয়েছিল নদীর জলে। ব্যাগটা অতদূর যায়নি। খানিকটা আগে পড়ে যায়, পাথরের ফাঁকে আটকে থাকে।”
চন্দন বলল, “ব্যাগের মধ্যে ভারী হাতুড়ি!”
“বেশ ভারী।”
“বডি ডান দিকে, আর ব্যাগ বাঁ দিকে! উলটো দিকে কেন?”
কিকিরা হাসলেন, “তাই হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। একে বলে কনসিমেন্ট সাইকোলজি। তোমাকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা।”
তারাপদ বলল, “এটা তা হলে খুনের ঘটনা! আশ্চর্য!”
.
০৫.
বিকেলের দিকে কিকিরা তারাপদদের নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন।
নৃসিংহ-সদন থেকে বেরিয়ে শ’খানেক গজ পশ্চিমে এগোলে লালা রোড। দেখলেই বোঝা যায়, মূল রাস্তা থেকে নৃসিংহ-সদন খানিকটা তফাতে। তফাতে হলেও রাস্তা ভালই। মেঠো নুড়ি ছড়ানো পথ। গাড়ি আসা-যাওয়ার কোনও অসুবিধে নেই। এক সময় রঘুপতিরা গাড়ি নিয়েই আসতেন কলকাতা থেকে। তখন বাড়ি গমগম করত। এখন আর গাড়ি আসে না, আনার দরকার করে না।
লালা রোড় মোটামুটি রাস্তা। পাথর, খোয়া আর নুড়ি ছড়ানো। রাস্তাটা সোজা জোড়া বটতলার পাশ দিয়ে ধানিয়া তলাও-এর গা দিয়ে স্টেশনের কাছাকাছি গিয়ে পড়েছে। রেল লাইনের ওপাশে বাজার, দোকান, ডিপো, চৌকি।
কিকিরা জায়গাটার বিবরণ শোনাচ্ছিলেন হাঁটতে-হাঁটতে। তারাপদরা কিছু শুনছিল, কিছু বা কানে যাচ্ছিল না। অন্যমনস্কভাবে মাঠঘাট গাছপালা দেখছিল। শীতের বিকেল প্রায় ফুরিয়ে আসছে। রোদ নিভে আসার মতন।
কিছু ঘরবাড়ি এখানে চোখে পড়ে। সাজানো-গোছানো বাড়ি দু-চারটে, বাকি মামুলি ধরনের। লোকজন মোটামুটি। সাইকেলের চলনটা বেশি বলে মনে হল। বিশ-পঁচিশ পা অন্তর কোনো-না-কোনো সাইকেলঅলাকে দেখা যাচ্ছিল।
বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর, মেঘ সরে যেতেই পৌষের হাওয়া যেন আরও ধারালো কনকনে হয়ে উঠেছে।
চন্দন বলল, “ওগুলো নিশ্চয় বাঙালিদের বাড়ি?”
কিকিরা বললেন, “হ্যাঁ। বেশিরভাগ। শীতের সময় জল-হাওয়া বদলাতে এসেছেন বাবুরা। স্টেশনের ওপারেও কিছু বাড়ি আছে। সেটাকে বলে জজ মহল্লা।”
“জজ মহল্লা? কেন?”
“ওখানে এক বুড়ো জজবাবুর বাড়ি ছিল। তিনি কিছু জজ-উকিলদের এনে বসিয়েছিলেন।”
