চন্দন হঠাৎ বলল, “রঘুপতিবাবুদের বংশে আর কারা আছে কিকিরা?”
“সঠিক জানি না।”
“তবু!”
“কাকা বিয়ে-থা করেননি। তাঁর কোনো বংশ নেই। আরও একজন কাকা ছিলেন। ছোটকাকা। সেই কাকা অনেককাল আগেই আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন।”
“কেন?”
“ওঁদের পরিবারের ব্যাপার। সোজাসুজি কিছু বলেন না। মনে হয়, ঝগড়াঝাটি হয়েছিল।”
চন্দন হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে আকাশের আকাশের দিকে মুখ তুলে কী দেখছিল। তারপর বলল, “প্লেন! শব্দ হচ্ছে…!”
প্লেনের শব্দ ক্রমে জোর হল, দেখাও গেল, কিন্তু অনেক দূর দিয়ে মিলিয়েও গেল একসময়।
ওরা বেশ খানিকটা পথ চলে এসেছিল। চড়াইয়ের প্রায় শেষ। এখানে পাহাড়ের গায়ে জঙ্গল। অনেকটাই ঘন। ঝাউগাছের মতন এক ধরনের গাছপালা যেন পাহাড়ের গা ঢেকে রেখেছে। বুনো লতাপাতা। বাবলা ঝোপের মতন ঝোপ।
নৃসিংহ-সদন আর দেখা যাচ্ছিল না।
তারাপদ বলল, “কিকিরা স্যার, আপনি বোধ হয় রঘুপতিবাবুর সঙ্গে আসর জমিয়ে বসে ওঁদের ফ্যামিলির কথা জেনে নিয়েছেন–তাই না?”
কিকিরা বললেন, “সামথিং সামথিং, নট এভরিথিং। রঘুপতিবাবু, কী বলে তোমার ওই যে, মুখ-আঁটা মানুষ। ঠিক যেটুকু বলার বলেন, বাড়তি বলেন না। উনি একেবারে মেডিসিন বটুল!”
চন্দন অবাক হয়ে বলল, “সেটা আবার কী কিকিরা? মেডিসিন বল।”
“ওষুধের শিশি। ওষুধের শিশির মুখ এঁটে রাখতে বলে না, তেমন আর কী মাউথ টাইট…”।
চন্দন আর তারাপদ হোহো করে করে হেসে উঠল।
গাছের ছায়ায় রোদ আড়াল পড়ে যাচ্ছিল। কখনো কখনো একেবারেই ঘন ছায়া। শীতও বেশি এখানে।
চড়াই উঠতে এবার কষ্ট হচ্ছিল। খাড়া বেশ। পায়ের তলায় পাথর আর নুড়ি। সামান্য লতাপাতা জড়ানো তৃণ, পাথরের কোথাও-কোথাও শ্যাওলা জমে রয়েছে ঘন হয়ে।
কিকিরা এবার একটু দাঁড়ালেন। দু দণ্ড বিশ্রাম নেবেন বুঝি।
তারাপদরা দাঁড়াল। তাদেরও পা ধরে গিয়েছিল। কলকাতা শহরের মানুষ। এ-ধরনের রাস্তা হাঁটায় অভ্যস্ত নয়।
কিকিরা বললেন, “আমি গোপবাবুর কাছে কিছু কিছু শুনে এসেছিলুম। তবে তিনিও যা জানেন ওপর-ওপর। বাকিটা রঘুপতি রায় রাঠোর মশাইয়ের মুখ থেকে জানার চেষ্টা করছি।
চন্দন বলল, “কিকিরা, রাঠোরটা কী?”
“রাজপুত। তারাপদর ছত্রপতি নয়। অনেক রাজপুত ক্ষত্রিয়–এক সময় বিহারে, বাংলাদেশে চলে এসেছিল। রঘুপতিদের চার-পাঁচ পুরুষ বাংলাদেশে। ওঁরা নিজেদের দেশটেশ জানেনও না। বাঙালিই হয়ে গেছেন। খাঁটি বাঙালি।”
চন্দন বলল, “আমাদের এক মাস্টারমশাইও তাই। তাঁরা সিংহ; অরিজিন্যালি রাজপুতানার লোক। এখন সিন্হা হয়ে গেছেন।”
তারাপদ বলল, “রঘুপতিবাবুর মধ্যে সিংহ ব্যাপারটা নেই; তাই না কিকিরা? থাকলে ব্যাঘ্র ব্যাপারটা থাকতে পারে।”
কিকিরা বললেন, “চলো। আর সামান্যই।”
.
তারাপদরা যেখানে এসে দাঁড়াল সেটা একটা অদ্ভুত জায়গা। বড় বড় কিছু পাথর পড়ে আছে চারপাশে। পাথরগুলো কোনোটাই মসৃণ নয়। ভাঙাচোরা হলে যেমন দেখায় সেইকম। কালচে পাথর। পাথরের গায়ে ফাঁক-ফোকরে অল্প ঘাস, তৃণজাতীয় গুল্ম, শ্যাওলা, দু-চারটি শ্যাওড়া ঝোপের মতন ঝোপ, একটি নিম চারা।
কিকিরা হাত তুলে আঙুল দিয়ে দেখালেন “দেখো”
তারাপদরা দেখল। অবাক কাণ্ড। এখান থেকে সত্যি সত্যিই নৃসিংহসনের সামান্য একটা অংশ দেখা যাচ্ছে। রঘুপতির বসার ঘরের সেই ঝুলবারান্দা আর ঘরের অল্প একটু দেওয়াল, একটিমাত্র জানলা।
চন্দন বলল, “এখান থেকে বাড়িটা বেশি দুর মনে হচ্ছে না। সরাসরি বলে। “
তারাপদ বলল, “কিকিরা, গাছপালার আড়াল থেকে যেমন একফালি চাঁদ ভেসে উঠতে দেখা যায়–এ যেন অনেকটা সেইরকম তাই নয়?”
কিকিরা বললেন, “তোমরা হাত পনেরো-বিশ ওপাশে সরে যাও, আর কিছু দেখতে পাবে না। আড়াল পড়ে যাবে গাছপালায়। পাহাড়ি গাছ ছাড়াও নৃসিংহ-সদনের গায়েই অজস্র গাছ।”
তারাপদরা সরে গিয়ে দেখে নিল। কিকিরা ঠিকই বলেছেন।
কিকিরা বললেন, “এইবার এ-দিকটায় দেখো।”
তারাপদরা কাছে এল।
কিকিরা আঙুল দিয়ে কতকগুলো জায়গা দেখালেন। পাথরের ওপর পোড়া পোড়া দাগ। বোঝা যায় ওই পাথরের ওপর কিছু পোড়ানো হয়েছিল। দাগ ধরে রয়েছে।
চন্দন বলল, “এই পাথরের ওপর আগুন জ্বালানো হত, স্যার?”
“হ্যাঁ।”
“কিসের আগুন?”
“শুকনো লতাপাতার বা অন্য কিছুর” বলে তিনি পাথরের পাশে ফাঁকে পোড়া কিছু গুল্ম দেখালেন। বললেন, “ভাল করে দেখলে বুঝতে পারবে, পাথর যেখানে খানিকটা প্লেন মতন–সেখানে আগুন জ্বালানো হত। তার আশেপাশে আরও যেসব পাথর ভাঙা-ভাঙা দেখতে, সেগুলা চারদিক দিয়ে যেন গোল হয়ে আছে। ওখানে দাগ পাবে।”
“মানে?”
“মানে মাঝখানে একটা আগুন জ্বালিয়ে–তার চারপাশে ছোট-ছোট আগুনও জ্বালানো হত। “
“চারদিকে আগুন–মাঝখানে সন্ন্যাসী?”
“হ্যাঁ।…আর এইখানটাও দেখো। পাথরে শ্যাওলা জমে ছিল–সেই শ্যাওলার ওপর ঘষটানো দাগ। ওদিকেও ঘাস রগড়ে গিয়েছে।”
তারাপদরা দেখল।
কিকিরা বললেন, “একটু বসা যাক।”
বসলেন কিকিরা। সিগারেট চাইলেন।
সিগারেট খেতে-খেতে শেষে বললেন, “ব্যাপারটা তা হলে কী দাঁড়াচ্ছে বুঝলে?”
তারাপদরা জবাব দেওয়ার আগেই নিজে থেকেই কিকিরা বললেন, “একটা লোক এখানে আসত। এসে আগুন জ্বালাত। কেন জ্বালাত? জ্বালাত একটা উদ্দেশ্য নিয়ে। উদ্দেশ্যটা কী? না, সে নৃসিংহ-সদনের কাউকে আগুন জ্বালানোর খেলাটা দেখাবে।”
