“দেখেছি। তোমরাও কাল দেখবে।…তবে একথা ঠিক, কেউ যদি অতটা উঁচু থেকে পা হড়কে সরাসরি নিচে পড়ে, পাথরে মাথা থেঁতলে মরতেই পারে।” বলে কিকিরা ঘরের মধ্যে বার কয়েক পায়চারি করে নিলেন।
তারাপদ চাপা গলায় বলল, “আপনি কি রঘুপতিবাৰুকৈ সন্দেহ করছেন?”
কিকিরা দাঁড়িয়ে পড়লেন, “সন্দেহ করার আগের প্রশ্ন, কেন করব?”
“কেন করবেন?”
“করার মতন কারণ দেখছি না বলে করতে পারছি না। রঘুপতিবাবু অকারণে একটা লোককে খুন করতে যাবেন কেন? যদি করে থাকেন–তা হলে নিশ্চয় কোনো কারণ আছে। কারণটা কী? কেন একটা লোক রঘুপতিকে বেছে নিয়েছিল তার আগুনে খেলা দেখাবার জন্য! আগুনের ওই খেলা দেখানোর মধ্যে কোন রহস্য আছে?” কিকিরা দু হাত ডানার মতন ছড়িয়ে যেন সাঁতার কাটার ভঙ্গি করতে-করতে বললেন, “আমি বাপু অগাধ জলে। ডিপ ওয়াটারে পড়ে হাত-পা ছুঁড়ছি। একবার ভাবছি রঘুপতি সাফসুফ মানুষ নন, নিশ্চয় কোনো রহস্য আছে ওঁর মধ্যে। আবার ভাবছি, এই মানুষটি যদি দোষীই হবেন, তবে আমাকে এখানে তোয়াজ করে রাখবেন কেন? আবার মনে হচ্ছে, রঘুপতি তো ডেকে পাঠাতে চাননি, গোপবাবু আগ বাড়িয়ে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। রঘুপতিবাবুর এখন ছুঁচো গেলার অবস্থা। আমাকে গিলতেও পারছেন না, উগরোতেও পারছেন না। মুখে একেবারে ‘ওয়েলকাম’-ভাব নিয়ে বসে আছেন।…সত্যি বলছি স্যান্ডেল উড, আমি কোনো দিশে পাচ্ছি না।”
“তা হলে?”
“পেতে হবে। চেষ্টা তো করি। পরে যা হয় হবে। ভাল কথা, চন্দন, ওই হাতুড়িটার কথা কিন্তু ভুলো না। ওটা আমি আমার হেফাজতে রেখেছি। কেউ জানে না। এমন তো হতে পাতে হাতুড়ি দিয়ে লোকটার মাথায় মারা হয়েছিল। তাতেই সে মারা গেছে। তারপর তাকে ফেলে দেওয়া হয়েছে নিচে। বলে কিকিরা নিজের মাথার পেছনদিকটা দেখালেন।
তারাপদরা কোনো কথা বলল না।
.
০৪.
পরের দিন আর বৃষ্টি নেই। শীতের কুয়াশামাখা রোদ উঠল সকালেই। সামান্য বেলা বাড়তে-না বাড়তেই রোদ ছড়িয়ে গেল সর্বত্র। পৌষের রোদ, তাত ওঠেনি তখনও। কিন্তু বড় আরামের। আর পরিষ্কার।
চায়ের পাট শেষ করেই কিকিরারা বেরিয়ে পড়লেন। শীত যেন আরও প্রখর হয়েছে।
তারাপদরা এসেছিল সন্ধের অন্ধকারে, মেঘ বাদলার মধ্যে, চারদিক লক্ষ করার উপায় ছিল না তখন; গতকাল বৃষ্টির মধ্যে বাড়িতে বসেবসেই সারাদিন কেটেছে বাইরের কিছুই প্রায় দেখতে পায়নি। আজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে তারা আশপাশের দৃশ্যটা দেখতে পাচ্ছিল। ও
একেবারে পাহাড়তলি। সমতল জায়গা কোথাও যেন নেই। কোথাও কোথাও বেশ চড়াই। মাঠের মধ্যে এখানে-ওখানে তাঁবু খাঁটিয়ে রাখলে যেমন দেখায়, অনেকটা সেইভাবে কোথাও মাটি আর পাথরের স্তূপ, কোথাও ঝোপঝাড়। পাথর-নুড়িতে ভরতি হয়েছিল জায়গাটা। শ’গজ বড় জোর–তারপরই গাছপালা, জঙ্গলের মতন। গাছ সম্পর্কে তারাপদদের ধারণা কম, তবু বুঝতে পারছিল বড় বড় তেঁতুলগাছ আর ঘোড়ানিম যেন আড়াল করে রেখেছে ওপাশটা। শালও রয়েছে। কম। কুলগাছের ঝোপ অজস্র। জামগাছও চোখে পড়ছিল। আর বট অশ্বত্থা। বুনো গাছপালাও কত কী!
তারাপদ বুঝতে পারছিল না, জঙ্গলের এত কাছাকাছি ‘নৃহিংহসদন’-এর মতন বাড়ি তৈরির কী দরকার ছিল।
চন্দনই বলল, “কিকিরা, এত জায়গা থাকতে একেবারে জঙ্গল ঘেঁষে বাড়িটা তৈরি হল কেন?”
কিকিরা বললেন, “রঘুপতিবাবুর ঠাকুরদার পছন্দ হয়েছিল জায়গাটা।”
“অদ্ভুত পছন্দ।”
“খানিকটা অদ্ভুত ঠিকই। তবে এবাড়ি তৈরির পেছনে একটু ইতিহাস আছে। বাড়িটা যখন তৈরি হচ্ছিল তখন রঘুপতির কাকা অসুস্থ। তাঁর যক্ষ্মা রোগ হয়েছিল। তখনকার দিনে এই রোগ ছিল যম। চিকিৎসা কিছু ছিল না। ভগবানের নামে ফেলে রাখা। ডাক্তাররা বলতেন, স্বাস্থ্যকর জায়গায়, ফাঁকায়, আলোবাতাসে রোগীকে রাখতে। প্রকৃতি যতদিন টিকিয়ে রাখে।
তারাপদ বলল, “সেইজন্যই এই বাড়ি।”
কিকিরা বললেন, খানিকটা নিশ্চয়ই। ওঁর বাবাই বাড়িটা শেষ করেছিলেন। রঘুপতির কাকা এই বাড়িতেই বছর পনেরো বেঁচেছিলেন। এখানেই তিনি থাকতেন। তাঁর শখ ছিল ছবি আঁকার। ল্যান্ডস্কেপ আঁকতেন, স্টিল লাইফ আঁকতেন। সেসব ছবি নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো একটা ঘরে কিছু ছবি রাখা আছে ভদ্রলোকের আঁকা।”
“আপনি দেখেছেন?”
“না। ইচ্ছে আছে–দেখব।…ঘরটা তালাবন্ধ থাকে।”
তারাপদ ঠাট্টা করে বলল, “কিকিরা, আপনি কি ছবিও বোঝেন?” কিকিরা মজার গলায় জবাব দিলেন, “না বাবু। আমি হলাম ছবিকানা। তবে কলা, শশা, আম আঁকলে বুঝতে পারি। একবার ছেলেবেলায় চায়ের কেটলি এঁকেছিলুম, সবাই বলল–বাঃ, হুঁকোটা বেশ হয়েছে।”
তারাপদরা হোহো করে হেসে উঠল। কিকিরাও হাসছিলেন। এ
হাঁটতে হাঁটতে মনে হল সামনে পাহাড়ের মতন একটা বালিয়াড়ি, গাছপালা, ঝোপঝাড়, পাথরে ভরতি জায়গাটা, তারপর পাহাড়ি টিলা।
কিকিরা বললেন, “ওই উঁচুটার ওপাশে চুনিয়া নদী।“
“নৃসিংহ-সদন কিন্তু দেখা যাচ্ছে, স্যার।”
“এখন যাবে। এর পর যেখানে যাব–সেখান থেকে দেখা যাবে না।”
চন্দন পাখি দেখছিল। গাছপালার মাথা টপকে কয়েকটা টিয়া উড়ে গেল। চিকির-চিকির ডাক শোনা যাচ্ছে কোনো বুনো পাখির।
তারাপদ বলল, “জায়গাটা পাহাড়ি।”
কিকিরা বললেন, “কাছেই পাহাড়। পরেশনাথের ফ্যামিলি। এই যে দেখছ-এটা পাহাড়ের ঢাল। আধ মাইলটাক দূরে ঘন জঙ্গল।”
