চন্দন কোনো কথা বলল না। রঘুপতির হতাশ বিষণ্ণ মুখে যেন কেমন অনুশোচনা। নিজের অক্ষমতার জন্য, না দুর্গের কথা ভেবে, কে জানে!
কিকিরারা উঠে পড়লেন।
.
বৃষ্টি কিন্তু থামল না। সকালে যা মনে হয়েছিল দুপুরে দেখা গেল ঠিক উলটো হয়ে গেল সব। আকাশ আবার কালো হল, জোর হল বৃষ্টি; আর হাড়কাঁপানো বাতাস দিতে লাগল।
বাইরে যাওয়ার আশা-ভরসা ছেড়ে দিতে হল কিকিরাদের।
সারাটা দিন তা হলে করার কী থাকল? কিছুই নয়। তারাপদ আর চন্দন বাড়িটা দেখে নিল ঘুরে-ঘুরে। এবাড়ির ছাঁদছিরি খানিকটা বিহারি জমিদারবাড়ির মতন। বাহুল্য আছে, বাঁধুনিও আছে কিন্তু ছিমছাম ভাব নেই। সামনের দিকটা একরকম, তবে পেছনের দিকটা খাপছাড়া। ঘরদোর বড় কম নয়। অব্যবহারের ফলে পোড়োবাড়ির মতন চেহারা হয়েছে। কোথাও দেওয়াল থেকে পলেস্তরা খসে পড়েছে, কোথাও কড়িকাঠে দরজা-জানলায় ঘুণ ধরেছে। ময়লা জমেছে নানান জায়গায়, রং বিবর্ণ। বন্ধ ঘরের দমচাপা বাতাস।
রঘুপতি যে-ঘরগুলো ব্যবহার করেন–দোতলার মাত্র সেইগুলোই যে বসবাসযোগ্য। বাকিগুলো নয়।
তারাপদ বলল, “এত লোক এ বাড়িতে! তারা করে কী?”
চন্দন বলল, “ঘুমোয়। এবাড়িতে কীই-বা করবে! লোকজন থাকে না।”
“রঘুপতিবাবু যতদিন আছেন–তারপর তো ধসে পড়বে বাড়ি।
“তাই মনে হয়।”
.
সন্ধের মুখে কিকিরা বললেন, “ওহে, দিনটা তো বৃথা গেল। এসো, একটু হোম ওয়ার্ক করে নিই।”
“বলুন, কী করতে হবে?”
“কেমন লাগল রঘুপতিবাবুকে?”
তারাপদ বলল, “খারাপ আর কোথায়?”
চন্দন বলল, “আমারও খারাপ লাগেনি।”
কিকিরা বললেন, “ভাল কথা। বয়স্ক মানুষ। অভিজাত। আচার ব্যবহার ভাল–ওঁকে খারাপ লাগার কথা নয়। কিন্তু..” কিকিরা চুপ করে গেলেন।
“কিসের কিন্তু?”
“কথা হল– যে ঘটনাগুলো ঘটল–সেগুলো রঘুপতিবাবুর বাড়ির কাছেই ঘটল কেন?”
তারাপদ চন্দনের দিকে তাকাল। চন্দন কিছু বলল না।
কিকিরা বললেন, “এমন কী কারণ থাকতে পারে যে, একটা লোক রঘুপতিকে দেখিয়ে-দেখিয়ে আগুনের ওপর হাঁটবে? তার উদ্দেশ্য কী ছিল?”
চন্দন বলল, “আপনি কী বলতে চাইছেন বুঝতে পারছি না। লোকটা যে রঘুপতিবাবুকে দেখাবার জন্য আগুনের ওপর হেঁটে বেড়াত–একথা কে বলল! রঘুপতিবাবুর নজরে পড়ে গিয়েছিল হঠাৎ। অন্যদের নজরেও পড়তেও পারে। আপনি খোঁজ নিয়েছেন?”
মাথা হেলিয়ে কিকিরা বললেন, “নিয়েছি। রঘুপতি ছাড়া এ-দৃশ্য আর মাত্র একজন দেখেছে–সে হল বিরজুবাবা। বিরজুকে দেখিয়েছেন রঘুপতি, ডেকে দেখিয়েছেন। এ বাড়ির আর কেউ দৃশ্যটা দেখেনি।”
তারাপদ বলল, “বিরজুর সঙ্গে আপনি কথা বলেছেন?”
“বলেছি। সে দেখেছে বটে, তবে একদিনই দেখেছে। বাবু তাকে দেখিয়েছেন।”
“এটা কেমন করে হয় স্যার!” তারাপা বলল, “সাধারণ একটা দৃশ্য হলে লোকের চোখে না পড়তে পারে। একটা পাখি উড়ে গেল, কিংবা একটা লোক গাছতলায় দাঁড়িয়ে কাঠকুটো কুড়োচ্ছ, গোরুর গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে কোথায়–এ-সব দৃশ্য না হয় লোকে চোখ চেয়ে দেখে না। তা বলে এক জায়গায় আগুন জ্বলছে-আর-এক গেরুয়াধারী আগুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে–এমন জিনিস চোখে পড়বে না–এমন হতেই পারে না। ইপসি।”
কিকিরা মাথা দুলিয়ে-দুলিয়ে বললেন, “ঠিক তাই। একেবারে সহজ সত্য। অস্বাভাবিক কিছু একটা নজরে পড়লে মানুষ তার দিকে না তাকিয়ে পারে না, অবশ্য যদি সে অন্ধ না হয়! এ বাড়িতে অন্ধ কেউ নেই।”
“তা হলে?” তারাপদ বলল।
“তবে একটা কথা আছে। তোমাদের পক্ষে আজ অনেক কিছু দেখা সম্ভব হয়নি। বৃষ্টি মাটি করে দিয়েছে।”
“কী কী দেখা হয়নি?”
“রঘুপতিবাবুর বসার ঘরের দোতলায় ঝুল বারান্দায় গিয়ে তোমরা দাঁড়াওনি। চন্দন একবার উঁকি মেরে এল শুধু। ওখামে না দাঁড়ালে ওই জায়গাটা দেখা যাবে না।”
“মানে?”
“মানে, আগুন যেখানে জ্বলত, গেরুয়াপরা সন্ন্যাসী এসে দাঁড়াত–সেই জায়গাটা দেখা যাবে না।”
“কেন?”
“আড়ালে পড়ে যায়। গাছপালার আড়াল, পাহাড়ি খাঁজের আড়াল।” বলে কিকিরা রুমাল বের করে নাক মুছলেন। সর্দি হয়ে গিয়েছিল তাঁর। বললেন, “কাল নিশ্চয়ই রোদ উঠবে। রোদ উঠলে তোমাদের ওই জায়গাটায় নিয়ে যাব। নিজের চোখেই সব দেখতে পাবে।”
“রঘুপতিবাবুর বসার ঘরের বারান্দাটাও দেখব।”
“দেখবে।”
“ওঁর বসার ঘরের বারান্দা দিয়ে যা দেখা যায়–অন্য কোনো জায়গা থেকে তা দেখা যায় না?”
কিকিরা বললেন, “পারটিকুলার ওই স্পটটা দেখা যায় না। অবশ্য বসার ঘরের পশ্চিমের জানলা দিয়ে দেখা যায় খানিকটা। শোবার ঘর থেকে দেখা যায় না।”
তারাপদ ঘাড় চুলকোতে-চুলকোতে বলল, “স্যার, আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, রঘুপতিবাবুকে দেখাবার জন্যই ওই আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থাটা হয়েছিল!”
“কোনো সন্দেহ নেই।”
“কিন্তু কেন?”
“সেটাই তো কথা।”
চন্দন হঠাৎ বলল, “এই দৃশ্য রঘুপতি দেখতেন বলেই কি শেষ পর্যন্ত সেই লোকটাকে খুন করা হল?”
কিকিরা বললেন, “সেই লোক মানে–তুমি গেরুয়াপরা সাধুবাবার কথা বলছ?”
“হ্যাঁ।”
“মুখে খুন বললেই তো খুন হবে না। প্রমাণ কী? পুলিশও খুন বলেনি। বলেছে, ওপর থেকে পা পিছলে পড়ে গিয়ে মাথায় চোখ লেগে মারা গেছে।”
“হতে পারে! ওপর থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় জখম হয়ে মারা যেতে পারে। কিন্তু সন্দেহটা থেকে যাচ্ছে।”
তারাপদ বলল, “জায়গাটা আপনি দেখেছেন নিজে?”
